জাতীয় আন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলন অনেক সময় সবকিছু বুঝেও যেভাবে হওয়া দরকার ছিল সেভাবে হয়নি। ’৬০-এর দশকে মার্শাল ল উৎখাত করার জন্য আন্দোলন হয়েছে। সেই আন্দোলনে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্র মারা যাওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমুল আন্দোলন শুরু হয়। আইয়ুব খান তখন ছাত্ররাজনীতি, হরতাল সব বন্ধ করে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তখন অনেক ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করেন। তখন সব আন্দোলনে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নকে একসঙ্গে দেখা গেছে।…
জাতীয়তাবাদ বা জাতিরাষ্ট্র নিয়ে এখনো যারা লেখেন বা কথা বলেন, তারা ভালোভাবে ব্যক্ত করতে পারেন না। অনেকেই জাতীয়তাবাদ শব্দটা শুনতেই পারেন না। পাকিস্তান একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ সফল করার যে চেষ্টা তা কখনো সফল হবে না। আমরা পূর্ব বাংলার বাঙালি, পশ্চিম পাকিস্তানে আলাদা আলাদা ভাষা আছে। কিন্তু সেই ভাষাগুলো অনেক দুর্বল ছিল। তখন থেকেই আমাদের বাংলা ভাষা অনেক উন্নত ছিল। এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চীন, জাপান থেকে শুরু করে ইরাক, ইরান, লিবিয়া ও আরব এলাকার মধ্যে বাংলাভাষা ছিল সবচেয়ে উন্নত। আমি বুঝতে পারি না, কী কারণে রবীন্দ্রনাথ হিন্দি ভাষাকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করতে সমর্থন দিলেন। জাতীয় জাগরণে ভাষা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাকে মাতৃভাষার দাবিতে আন্দোলন করে। এভাবে জাতীয় জাগরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বড় ভূমিকা রাখে।
ইংরেজরা যেভাবে জাতীয়তাবাদ দেখাতে চেয়েছে, সেখানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও জওহরলাল নেহরু নিজেদের ধারণার বাইরে গিয়ে সেই চেতনা ধারণ করেছিলেন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী সেই ধারার বিরোধিতা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত কিছু করতে পারেননি। তার পর ভারত ও বাংলা বিভক্ত হলো। পাঞ্জাব বিভক্ত হলো এবং ভারত থেকে পাকিস্তান সৃষ্টি হলো।
সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি ইংরেজরাই প্রথম নিয়ে এল। ভারতবর্ষে অনেক আগে থেকেই হিন্দু-মুসলিম বিরোধ ছিল। সেই বিরোধকে একটি রায়টের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং জাতীয়তাবাদের বিষয়টিকে নষ্ট করে দেওয়া ইংরেজরাই করে। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ- এই তিনজনই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে অনেক জ্ঞানী ছিলেন। তাদের রাজনৈতিক দূরদর্শন ছিল অনেক প্রখর। সে কারণেই ইংরেজরা অনেক আগেই ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। ইংরেজরা অনেকদিন শাসন করেছে। তাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে তাদের হাতেই, যারা তাদের অনুগত। এভাবে ধীরে ধীরে পাকিস্তান ও ভারত ভাগ হয়ে গেল। বাংলা ভাষা অনেক উন্নত ছিল। সে কারণেই জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে।
জাতীয় জাগরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনেক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যেও এ বিভক্তি ছিল যে, পাকিস্তান নাকি অখণ্ড ভারত। এ বিভক্তির মধ্যে মুসলিম শিক্ষকদের সংখ্যা খুব কম ছিল। ছাত্রদের মধ্যেও মুসলিমদের চেয়ে হিন্দু ছাত্রদের সংখ্যা বেশি ছিল। ওই অবস্থার মধ্যে যারা ছিলেন তারা বেশির ভাগই পাকিস্তান সমর্থন করেছেন। হিন্দু শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই আন্ডারগ্রাউন্ড দল যেমন অনুশীলন, যুগান্তর-এ যোগ দেন। বিখ্যাত শিক্ষক যারা ছিলেন তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক কংগ্রেসে নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। তারাও কমবেশি রাষ্ট্রীয় বিভক্তি স্বীকার করে নেন। মুসলিম শিক্ষক যারা ছিলেন তারা ছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে।
১৯৬০-এর দশকে পৃথিবীব্যাপী যারা পরাধীন জাতি ছিল তারা স্বাধীন হওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছে। প্রত্যেক জাতি সংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞান যে মানুষের উন্নত জীবন যাপনের অবলম্বন, তা এ দেশের ছাত্র-শিক্ষকরা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তারা আরও বুঝতে পারেন, শুধু নিজেদের রাষ্ট্র নিয়ে পড়ে থাকা আর সম্ভব নয়। এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সঙ্গে জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য অবলম্বন করে জাতিকে রাজনীতি করতে হবে। আগে বেশির ভাগ রাষ্ট্র ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগাল ও ইতালি অন্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের অধীনে পরাধীন করে রাখত এবং তাদের সম্পদ লুটে নিত। এভাবে ইংরেজ সরকার দেখল জাতীয়তাবাদ একটা বিশাল ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। ইংরেজরা তখন ভেবেছিল জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠলে তারা শান্তিমতো বিদায়ও নিতে পারবে না। তখন ইংরেজরা বুদ্ধি করে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস গঠন করল।
বঙ্গভঙ্গের পর যখন আন্দোলন শুরু হয় তখন মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৬ সালে। বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভেদ একেবারে স্পষ্ট হয়ে যায়। ন্যাশনালিজম কথাটির পরিবর্তে কমিউনালিজম শব্দের ব্যবহার ইংরেজরাই চালু করে। সেই কমিউনালিজম থেকে এখনো ভারত ও বাংলাদেশ পৃথক হতে পারেনি। ’৬০-এর দশকে জাগরণের বিষয়টা ছিল গণজাগরণ। বেগম রোকেয়া, এস ওয়াজেদ আলী ও কাজী নজরুল ইসলাম- এরা কেউ চাননি পাকিস্তান হোক। অখণ্ড ভারতের মধ্য থেকেই মুসলমানরা কীভাবে শিক্ষাদীক্ষা, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে উন্নতি করতে পারে, সেটাই ছিল মূল লক্ষ্য। হিন্দু ও মুসলমানদের সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য আছে। এ পার্থক্য ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে হবে। সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও জওহরলাল নেহরু ইংরেজদের সঙ্গে অনেকবার বৈঠকের মাধ্যমে প্রতিঠিত হয়েছে। বড় লাট মাউন্ট ব্যাটেনের সঙ্গে কখনো কখনো মহাত্মা গান্ধীর কথা হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ইউনিয়ন ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যাক্ট পাকিস্তানের মাধ্যমে তিনজনের স্বাক্ষরে পাকিস্তান সষ্টি হয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ‘তমুদ্দিন মজলিস’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম লীগের রাজনীতিকে তুমুলভাবে সমালোচনা করেছে ‘তমুদ্দিন মজলিস’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের তরুণ শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম তমুদ্দিন মজলিসের প্রধান ছিলেন।
আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সবসময় ভিন্ন ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদের চেতনা নিয়ে সবসময় সম্মুখভাগে এগিয়ে এসেছে। গণতন্ত্রের কথা সব সময় এগিয়ে নিয়ে এসেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। গণতান্ত্রিক রাজনীতি কেমন হবে এসব বিষয় নিয়ে কেউ লেখননি। এস ওয়াজেদ আলীর লেখা ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক শিক্ষা ও জ্ঞানের খুব অভাব ছিল রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে। এখনো আমাদের দেশে রাজনৈতিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। যদিও ঐক্যের চিন্তা করছে। রাজনীতি কী? গণতন্ত্র কী নয়? এ ধরনের মৌলিক প্রশ্ন কোনো রাজনৈতিক নেতার মধ্যে এখন নেই।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক এ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এতে দেশে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। মুসলমানদের মধ্য থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার মতো খুব কম লোকই ছিল। যারা একটু যোগ্য ছিলেন তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। সাম্প্রদায়িকতার কারণে যে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে তা মেনে নিয়েই পাকিস্তানকে কীভাবে গঠন করা যায়, সে লক্ষ্যে এগিয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাত্রলীগ ছিল।
ছাত্রলীগকে ভর করেই পরে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। আইযুব খান অনেক দূরদর্শী নেতা ছিলেন। তিনি দেশের রাজনীতি বন্ধ করে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি সবসময় পাকিস্তান রক্ষা ও পাকিস্তানভিত্তিক সংস্কৃতি রক্ষা করতে চেয়েছেন। আমাদের পূর্ব বাংলার জাতীয়তাবাদ এবং পশ্চিম বাংলার সংস্কৃতির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আমাদের জাতীয়তাবাদ রক্ষার্থে সব সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সোচ্চার ছিল। ছাত্ররা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন।
’৬০-এর দশকে আমাদের জাতীয় চেতনা প্রবল আকারে দেখা যায় শেখ মুজিবের মাধ্যমে। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ছয় দফা ঘোষণা করেন। ছয় দফার মাধ্যমেই শেখ মুজিব অনেক জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হন। তবে তিনি সবসময় হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীকে অনুসরণ করতেন। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী মারা যাওয়ার পর শেখ মুজিব মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। কিছুদিন পরই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। শেখ মুজিবের নানা গুণ ছিল। আবার নানা সীমাবদ্ধতাও ছিল। ভাসানী-মুজিবের রাজনীতি দেশকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর কারণে অনেকটা পিছিয়ে পড়ে।
জাতীয় আন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলন অনেক সময় সবকিছু বুঝেও যেভাবে হওয়া দরকার ছিল সেভাবে হয়নি। ’৬০-এর দশকে মার্শাল ল উৎখাত করার জন্য আন্দোলন হয়েছে। সেই আন্দোলনে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্র মারা যাওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমুল আন্দোলন শুরু হয়। আইয়ুব খান তখন ছাত্ররাজনীতি, হরতাল সব বন্ধ করে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তখন অনেক ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করেন। তখন সব আন্দোলনে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নকে একসঙ্গে দেখা গেছে।
লেখক: বাংলা একাডেমির সভাপতি ও রাষ্ট্রচিন্তক