বাংলাদেশে আধুনিক চিকিৎসাসেবায় বেসরকারি হাসপাতালগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি এই হাসপাতালগুলো উন্নত প্রযুক্তি, বিশেষায়িত সেবা এবং মানসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসাসেবায় আমাদের দেশে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে খবরের কাগজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম।
খবরের কাগজ: আধুনিক চিকিৎসাসেবায় আমাদের দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?
সাকিফ শামীম: বাংলাদেশে আধুনিক চিকিৎসাসেবায় বেসরকারি হাসপাতালগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি, এই হাসপাতালগুলো উন্নত প্রযুক্তি, বিশেষায়িত সেবা এবং মানসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। রোগীদের জন্য বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক মানোন্নয়নে অবদান রাখছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো নতুন নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং চিকিৎসাপদ্ধতি চালু করার ফলে দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে বিশ্বমানের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
খবরের কাগজ: আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব কী? কেন রোগীরা আপনার হাসপাতালকে বেছে নেবেন?
সাকিফ শামীম: ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতালকে বেছে নেওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র মাল্টিডিসিপ্লিনারি ক্যানসার হাসপাতাল। এখানে ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব বিভাগ ও পরিষেবা এক ছাদের নিচে পাওয়া যায়। আমাদের হাসপাতালে ছয়টি হাইব্রিড মডুলার অপারেশন থিয়েটার, একটি সম্পূর্ণ ও অত্যাধুনিক ল্যাব এবং একটি অত্যন্ত দক্ষ অ্যানেসথেসিয়া টিম রয়েছে। সর্বোপরি, আমরা উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি সর্বোচ্চ মানের অনকোলজিস্ট এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের একটি দল নিয়ে কাজ করি। আমাদের হাসপাতালের পরিবেশ জীবাণুমুক্ত এবং পরিচ্ছন্ন, যেকোনো সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক। বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জয়েন্ট কমিশন অব ইন্টারন্যাশনালের (JCI) এবং আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত হয়েছে। এটি দেশের জন্য একটি গর্বের বিষয়। এ ছাড়া চলতি বছর আমরা লিড গোল্ড সনদও পেয়েছি। বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র হাসপাতাল হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছি আমরা। এ বিষয়গুলো আমাদের অন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আলাদা করেছে।
খবরের কাগজ: চিকিৎসাসেবায় কোন কোন বিষয়ের ওপর আপনারা বেশি গুরুত্ব দেন?
সাকিফ শামীম: আমরা আমাদের প্রতিটি নতুন উদ্ভাবন বা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে রোগীর প্রয়োজনকে সবার আগে গুরুত্ব দিই। আমাদের লক্ষ্য শুধু মানুষকে আরও কিছু বছর বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং তাদের একটি উন্নত ও পরিপূর্ণ জীবন ফিরিয়ে দেওয়া। আমাদের কাছে চিকিৎসা কেবল রোগ নিরাময় নয়, এটি জীবনকে নতুন করে উপভোগ করার সুযোগ। আমরা চিকিৎসাসেবায় তিনটি মূল বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি: গুণগত মান (Quality), রোগীর নিরাপত্তা (Patient Safety) এবং মানবিক মূল্যবোধ (Human Values)। আমরা নিশ্চিত করি যে, প্রতিটি ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট এবং চিকিৎসাপদ্ধতি যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলে। রোগীর নিরাপত্তা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়, তাই আমরা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা প্রোটোকলের ওপর বিশেষ নজর রাখি। এরই ধারাবাহিকতায় অপারেশন থিয়েটার চালু হওয়ার ১ বছরের মধ্যে আমরা হাজারেরও বেশি সার্জারি সম্পন্ন করেছি মাত্র ১.২৫ সার্জিক্যাল সাইট ইনফেকশন রেটে, যা সিঙ্গাপুর, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা হাসপাতালগুলোর থেকেও কম। এ ছাড়া রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও মানবিক আচরণ আমাদের সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
খবরের কাগজ: বিশ্বমানের সেবা দিতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর কি সরকারের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হয়?
সাকিফ শামীম: অবশ্যই। বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রতি সরকারের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া দরকার। সরকার স্বাস্থ্য খাতের ট্যাক্স ও ভ্যাটসংক্রান্ত নিয়মগুলো সহজ করতে পারে। এ ছাড়া চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করলে উন্নত প্রযুক্তি সহজলভ্য হবে এবং চিকিৎসার খরচও কমবে। সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। নিয়মিত তদারকি ও নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে।
খবরের কাগজ: আধুনিক চিকিৎসাসেবা পেতে বিদ্যমান আইন ও মন্ত্রণালয়ের তদারকি কি পর্যাপ্ত বলে মনে করেন? স্বাস্থ্যসেবায় কী ধরনের ব্যবস্থা সবার জন্য সহায়ক হবে?
সাকিফ শামীম: বর্তমান আইন ও তদারকি ব্যবস্থা কিছু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত হলেও আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সবার জন্য সহায়ক একটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে; যেমন শক্তিশালী তদারকি, সমন্বিত নীতিমালা এবং স্বাস্থ্য বিমাব্যবস্থা। দেশের সব নাগরিকের জন্য একটি কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এটি চিকিৎসার খরচ কমাতে এবং সবার জন্য চিকিৎসা সহজলভ্য করতে সাহায্য করবে।
খবরের কাগজ: আপনার প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার সঠিক মান নির্ণয় এবং আধুনিক ল্যাবের সুবিধা কতটুকু রয়েছে? আপনার প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে, তা কি আন্তর্জাতিক মানের?
সাকিফ শামীম: আমাদের ল্যাবে পরীক্ষার সঠিক মান নির্ণয়ের জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। আমরা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করি। আমাদের ল্যাবটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং আমরা নিশ্চিত করি যেন, প্রতিটি রিপোর্ট নির্ভুল ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়। আমাদের লক্ষ্য হলো, রোগীরা যেন দেশের বাইরে ডায়াগনোসিস করানোর প্রয়োজন অনুভব না করেন।
খবরের কাগজ: বিশেষায়িত সেবায় আপনার হাসপাতালের ভূমিকা কী? রোগীর বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে আপনি বা আপনার প্রতিষ্ঠান কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?
সাকিফ শামীম: ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে বিশেষায়িত সেবায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমরা ক্যানসার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব পরিষেবা, যেমন কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ব্র্যাকিথেরাপি, হরমোনথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট, থ্রিডি ম্যামোগ্রাম, পিইটি (PET), সিটি স্ক্যান সার্জারি, মলিকিউলার ডায়াগনস্টিকসসহ আরও অনেক সেবা এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছি। রোগীর বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমানোর জন্য আমরা তিনটি প্রধান উদ্যোগ নিয়েছি: প্রথমত, সিঙ্গাপুর, ভারত বা থাইল্যান্ডের মতো উন্নত দেশে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন; দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ এবং তৃতীয়ত, তুলনামূলক কম খরচে মানসম্মত চিকিৎসা প্রদান। আমরা প্রমাণ করতে চাই যে, বাংলাদেশের মাটিতেই বিশ্বমানের চিকিৎসা সম্ভব।
খবরের কাগজ: রোগীর সর্বোত্তম সেবা ও স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কেমন?
সাকিফ শামীম: রোগীদের সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি পরিকল্পিত। আমরা প্রক্রিয়াগুলোকে ডিজিটালের মাধ্যমে সহজ করেছি। এতে সময়ও কম লাগে। এ ছাড়া আমরা প্যাকেজভিত্তিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি, যাতে রোগীদের খরচ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকে। আমরা আমাদের সেবার মান ও খরচের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করি এবং করে যাচ্ছি যাতে রোগীরা স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা পেতে পারেন।
খবরের কাগজ: মানবিক মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠায় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে আপনার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী?
সাকিফ শামীম: আমরা মানবিক মূল্যবোধকে আমাদের প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি হিসেবে দেখি। আমরা রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও শ্রদ্ধাশীল। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে আমরা নিয়মিত স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম, স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম এবং বিনামূল্যে পরামর্শ শিবিরের আয়োজন করে থাকি। আমরা রোগীদের রোগ প্রতিরোধের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করি এবং তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে কাজ করি। আমরা বিশ্বাস করি, চিকিৎসা শুধু রোগ নিরাময় নয়, বরং রোগ প্রতিরোধ এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখা। এই জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমাদের মার্কেটিং টিম প্রতিনিয়ত সফলভাবে বিভিন্ন ক্যাম্পেইনের আয়োজন করে আসছে।
খবরের কাগজ: বাংলাদেশে বিশ্বমানের ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও কেন রোগীদের বিদেশমুখী প্রবণতা দেখা যায়? এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত জানতে চাই।
সাকিফ শামীম: রোগীদের বিদেশমুখী হওয়ার মূল কারণগুলো হলো আস্থার অভাব, বিশেষজ্ঞের অভাব এবং প্রচারের অভাব। আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা এখনো সম্পূর্ণ তৈরি হয়নি। কিছু বিরল রোগের জন্য এখনো উচ্চ প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে ইতিবাচক প্রচারের অভাবও একটি বড় কারণ। বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমাতে হলে দেশের চিকিৎসাসেবার মান, দক্ষতা এবং সফলতার গল্পগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করা জরুরি।
খবরের কাগজ: বাংলাদেশের আধুনিক চিকিৎসাসেবা এবং হাসপাতালগুলো তাদের বিশ্বমানের চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে?
সাকিফ শামীম: প্রযুক্তিগত উন্নতি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা উন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ- এই চারটি পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো বিশ্বমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারে। নিয়মিত নিরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করাও জরুরি। সর্বোপরি, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে বিশ্বমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
খবরের কাগজ: আধুনিক চিকিৎসাসেবায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মান কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
সাকিফ শামীম: আধুনিক চিকিৎসাসেবায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা উচিত। তাদের শুধু উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে সন্তুষ্ট
থাকলে চলবে না; বরং রোগীর নিরাপত্তা, কর্মীদের দক্ষতা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং মানবিক আচরণেও গুরুত্ব দিতে হবে। চিকিৎসার ব্যয়ভার সবার জন্য বহনযোগ্য করতে মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যা প্রযুক্তি, দক্ষতা ও মানবতাকে একীভূত করে স্বাস্থ্যসেবার মান বিশ্বপর্যায়ে উন্নত করতে পারে।