একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সাইবার অপরাধ। দিন দিন ডিজিটালমাধ্যমের ব্যবহার বাড়ার কারণে এই অপরাধের মাত্রা ব্যাপকতর হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত শাখা সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে (সিপিসি) প্রতিদিন প্রায় ২০০টি করে অভিযোগ আসছে।
সিপিসিতে প্রতারণা, হুমকি, হ্যাকিং, পর্নোগ্রাফি ও শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে টাকা আদায়- এমন নানা অভিযোগ আসছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়। প্রতারণা ও যৌন হয়রানির ঘটনাই সর্বাধিক। নারীরা সাইবার ক্রাইমের সবচেয়ে বেশি শিকার। অনলাইনে প্রায়ই নানা হয়রানির মুখে পড়ছেন তারা। সিপিসি সূত্রের তথ্য, এসব অভিযোগ তদন্তের পর বছরে আদালতে মামলা হয় ২০ শতাংশ। মামলা নিষ্পত্তির হার ১৩ শতাংশ।
সাইবার ক্রাইমে ভুক্তভোগীদের ৬০ শতাংশই নারী, যাদের বয়স ১৬ থেকে ২২ বছর। প্রেমিক, বন্ধু, সহপাঠী, প্রতিবেশীসহ নানা ধরনের মানুষ তাদের সাইবার হয়রানি করছে। ২০১৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়। গত ৪ বছর ৯ মাস ১৬ দিনে ৩ লাখ ৪৬ হাজার অভিযোগ এসেছে। ভুক্তভোগীরা সাইবার পুলিশ সেন্টারের ই-মেইল, ফেসবুক ও ইমোতে ফোন করে অভিযোগ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে সিআইডির অ্যাডিশনাল ডিআইজি (সিপিসি) মো. কামরুল আহসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন। দিনে গড়ে প্রায় ২০০ অভিযোগ আসে। অভিযোগ তদন্ত করে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিই।’
সিপিসি সূত্র জানায়, রুমা (ছদ্মনাম) নামে একজন নারী অভিযোগ করেছেন যে, সুমন নামে এক সহপাঠীর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তা একসময় শারীরিক পর্যায়ে গড়ায়। সুমন তাকে বিয়ে করবে বলে ফুঁসলিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। তিনি সহপাঠীর প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। সিপিসির কর্মকর্তারা এ অভিযোগ তদন্ত করছেন।
মুন্সীগঞ্জের আবির নামে এক ব্যক্তি সাইবার পুলিশ সেন্টারে অভিযোগ করেছেন যে, একটি এমএলএম কোম্পানি তার কাছে পণ্য বিক্রির নামে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। গত জানুয়ারিতে ওই কোম্পানিটি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং এলাকায় একটি অফিস খোলে। তারা জুনের প্রথম সপ্তাহে অফিসে তালা লাগিয়ে পালিয়ে যায়। বিষয়টি তদন্ত করছেন সাইবার পুলিশ সেন্টারের কর্মকর্তারা।
সূত্র জানায়, জান্নাতুল বাকেয়া নামে এক ভুক্তভোগী সিপিসিতে অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ, তিনি অনলাইনে প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবসা করেন। আফরিন নামে আরেকজন অনলাইন ব্যবসায়ীর কাছে বিদেশি কসমেটিকসের অর্ডার করেছিলেন। পণ্যের মূল্য বাবদ দিয়েছিলেন প্রায় ২ লাখ টাকা। পরে তিনি প্রতারিত হন। বাকেয়ার মতো অনেক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে আফরিন এমনভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সিআইডির সিপিসির কর্মকর্তারা প্রমাণ পেয়েছেন। বাকেয়া তার কাছে টাকা চাইতে গেলে তিনি নানাভাবে হুমকিধমকি দিচ্ছেন।
আব্দুল আজিজ নামে এক ব্যক্তির অভিযোগ, এক ম্যারেজ মিডিয়ার ফাঁদে পড়েন তিনি। এক ব্যক্তির মাধ্যমে গুলশানে একটি ম্যারেজ মিডিয়ার অফিসে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন যে এক সুন্দরী মহিলা বসে আছেন। তাকে কনের বড় বোন বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, তার বোন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরবেন। তাকেও (আজিজ) অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। পাত্র তাদের পছন্দ হয়েছে। এ জন্য পাত্রের কাছে তারা অস্ট্রেলিয়ায় সেটল করার জন্য ১ লাখ টাকা চায়। আজিজ সরল বিশ্বাসে ওই টাকা দেন। টাকা দেওয়ার পর ওই মহিলার নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ম্যারেজ মিডিয়াটিও বলছে যে ওই মহিলার দ্বারা তারা নিজেরাও প্রতারিত।
সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্স, এমএলএম ও অনলাইনে পণ্য বেচাকেনার প্রতারণার অভিযোগ বেশি আসে। অভিযোগ আসছে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার। শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ আসে সিপিসিতে। দেশে একাধিক এনজিও এবং ভুয়া মানবাধিকার সংগঠনের নামে প্রতারণার অভিযোগ আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বন্ধু সেজে বিদেশ থেকে উপহার পাঠানোর নামে অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও আসছে সিপিসিতে। এ চক্রটি বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কাজ করে থাকে। এ ছাড়া প্রভাবশালী ব্যক্তির এপিএস, সংসদ সদস্য, সচিব, র্যাব ও পুলিশের নাম ভাঙিয়ে টাকা লোপাটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সেই সব অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
সূত্র আরও জানায়, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বহুমুখী প্রতারণা। সিপিসিতে যেসব অভিযোগ আসছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশ ভুক্তভোগী প্রযুক্তিগত প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কিছু অভিযোগ আমলে নেওয়ার মতো নয়। সিপিসির কর্মকর্তারা জানান, সাইবার অপরাধের বিষয়ে দেশের মানুষকে সচেতন করার জন্য তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। তাদের একাধিক কর্মকর্তা এই অপরাধের নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা অর্জনের জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
সালমান