দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার বিনিময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী জ্বালানি কোম্পানি লিন্ডেন এনার্জি।
সরকারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বখ্যাত এই কোম্পানির প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। বাংলাদেশ এই কোম্পানিকে ব্যবসা দিলে পম্পেও ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভূমিকা রাখবেন।
এ রকম প্রস্তাব দিয়ে ঢাকার কাছে পাঠানো বেশ কয়েকটি চিঠি এই প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর লিন্ডেন এনার্জির কর্মকর্তা স্টিফেন পেইনের স্বাক্ষর করা একটি চিঠিতে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেখানে এলএনজি সরবরাহের ব্যবসা এবং মুক্ত বাণিজ্যের বিনিময়ে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সে সময় চিঠিটি দেওয়া হয় ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলামের কাছে। এই চিঠি দেওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র্যাব ও এর সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের মধ্যে বৈঠকের পর ঢাকার ওপর ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞাকে বিস্ময়কর বলে উল্লেখ করে ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের প্রস্তাবিত এলএনজি/এফটিএ চুক্তি সম্পন্ন হলে তা উভয় দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্কে যেকোনো ক্ষয়ক্ষতি মেরামতে কাজ করবে।’
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সই করা একটি শর্তহীন আগ্রহপত্র দিয়েছিল লিন্ডেন এনার্জি। যুক্তরাষ্ট্রের এই রাজনীতিক দেশটির আগামী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। বাংলাদেশ সরকার এখন টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই এলএনজির চাহিদা ক্রমেই শিল্প ও পোশাক খাতে বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদকে চিঠি দেন। প্রতিমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘টেক্সাসভিত্তিক জ্বালানি কোম্পানি লিন্ডেন এনার্জি বাংলাদেশে ২০ বছর মেয়াদে এলএনজি সরবরাহের জন্য একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রস্তাবে একটি অফশোর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও অন্য একটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি চার এমটিপিএ (মিলিয়ন টন পার অ্যানাম) এলএনজি সরবরাহ করতে চায়।’
শহীদুল ইসলাম আরও লেখেন, ‘লিন্ডেন এনার্জি ওই চিঠিতে আরও প্রস্তাব করেছে যে এর বিনিময়ে তারা মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে চায়।’
চিঠিতে সুপারিশ করে নসরুল হামিদকে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশকে পর্যাপ্ত এলএনজি আমদানি করতে হবে এবং আমাদের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির জন্য শুল্ক ছাড় পাওয়ার ইস্যুটি বিবেচনা করে দূতাবাস প্রস্তাবটিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে এবং লিন্ডেন এনার্জির সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিক বৈঠক করা যেতে পারে।’
রাষ্ট্রদূত লেখেন, ‘আমাদের প্রাথমিক মূল্যায়ন হলো, ২০ বছরের জন্য এলএনজি একটি নির্দিষ্ট হারে নিশ্চিত সরবরাহ আমাদের দামের অস্থিরতা এড়াতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে যদিও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষিত, আমরা তাদের এই ধরনের ছাড় নিশ্চিত করার ক্ষমতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত নই। যদি আমাদের আইন বিশেষজ্ঞ ও কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে যে শুধু আগ্রহপত্রে স্বাক্ষর করার ফলে কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে না, তা হলে আমরা লিন্ডেন এনার্জিকে তার অনুসন্ধানমূলক কাজ শুরু করতে সাহায্য করার জন্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করার কথা ইতিবাচক বিবেচনা করতে পারি।’
২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের উপপ্রধান ফেরদৌসী শাহরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমেরিকা উইংয়ের মহাপরিচালককে একটি চিঠি দেন। ‘বাংলাদেশে রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি আমদানি ও অগ্রাধিকারমূক বাজার প্রবেশাধিকার’ শিরোনামের ওই চিঠিতে তিনি বলেন, ‘টেক্সাসভিত্তিক মার্কিন জ্বালানি কোম্পানি লিন্ডেন এনার্জি বাংলাদেশের গার্মেন্টসহ অন্য পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকারের বিনিময়ে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করতে চায়।’
এ ব্যাপারে ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমেরিকা উইংয়ের পরিচালক সৈয়দ শাহ সাদ আন্দালিব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিবকে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘যেহেতু নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাই আমরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সম্ভাব্য সবগুলো দপ্তরের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছি, যেন মার্কিন প্রশাসনে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। লিন্ডেন এনার্জি আমাদের জানিয়েছে, তাদের দেওয়া আগ্রহপত্র সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও স্বাক্ষর করবেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নির্বাাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী।’
জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উত্তর আমেরিকা উইংয়ের মহাপরিচালক খন্দকার মাসুদুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘হালনাগাদ তথ্য আমরা জানি না। আপনি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব নুরুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি খুব বেশিদিন দায়িত্ব নিইনি। এই বিষয়গুলো আমার নজরে এখনো আসেনি।’