অবৈধ গ্যাস সংযোগ ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে সরকার। আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে এবার জরিমানার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পেট্রোবাংলাকে প্রয়োজনীয় বিধিমালা সংযোজন করে উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিধিমালা সংযোজনের বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি, যা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খুব শিগগির তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। গ্যাসের সামগ্রিক সিস্টেম লস কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চুরি। এই চুরি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর আবার তারা সংযোগ নিচ্ছে কি না, এক মাস পর আবার ফলোআপ করতে বলা হয়েছে। বিতরণ কোম্পানির কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জোনগুলো ভাগ করে দিয়েছি। এখন জানতে পারছি, কোন জোনে কতটুকু গ্যাস যাচ্ছে, বিল কত পাচ্ছি। ডিএমডিদের বলে দেওয়া হয়েছে, তাদের জোনের সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে। সিস্টেম লস কমাতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার (ভিজিল্যান্স) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে কঠোর আইন করা সময়ের দাবি। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর আবার সেই সংযোগ চালু হচ্ছে। একই এলাকায় একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে। এভাবে চললে গ্যাস চুরি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। আমরা শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারি। আমাদের আর কিছুই করার নেই। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ যাচ্ছি, তিনি জরিমানা কিংবা শাস্তি দিচ্ছেন। কখনো জরিমানার পাশাপাশি কারাদণ্ডও দিয়ে থাকেন ম্যাজিস্ট্রেট।’
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (মেট্রো ঢাকা বিপণন ডিভিশন-উত্তর) মো. ইমাম উদ্দিন শেখ খবরের কাগজকে বলেন, ‘কেউ যদি চুরি করে তার শাস্তি দিতে প্রচলিত আইন রয়েছে, বিচার বিভাগ রয়েছে, অনেক সংস্থা রয়েছে। পেট্রোবাংলা কিংবা তিতাসের শাস্তি দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। অপরাধী যদি আমার গ্রাহক হন, তাহলে তার জরিমানা করতে পারি। ক্ষেত্রবিশেষে জরিমানার পরিমাণ ভিন্ন রয়েছে। আবাসিকে কেউ অবৈধ ব্যবহার করলে তার জন্য এক বছরের সমপরিমাণ বিল আদায় করতে পারি। তবে ব্যবহারকারী যদি তিতাসের গ্রাহক না হন, তাহলে আমরা শুধু লাইন কেটে দিতে পারি। কিছু ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়। অবৈধ ব্যবহারকারীকে শাস্তি কিংবা জরিমানা করতে হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে লাগবে।’
দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি; আবার বেশি চুরিও হয় তিতাসেই। গ্যাসের ছয়টি বিতরণ কোম্পানির মধ্যে তিতাস একাই অর্ধেকের বেশি (৫৫ দশমিক ২৩ শতাংশ) গ্যাস বিতরণ করে আসছে। সারা বছর অভিযান চালিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না গ্যাস চুরি। গত ২১ মাস (অক্টোবর ২০২১ থেকে জুন ২০২৩) অবৈধ উচ্ছেদ অভিযানে ৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা খরচ করেছে তিতাস গ্যাস।
কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশীদ মোল্লাহ সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত ৩৩০টি মোবাইল কোর্টসহ ২৮ হাজার ৩৯৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৬৬৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার অবৈধ লাইন, অবৈধ সংযোগ ও বকেয়ার কারণে ৬ লাখ ২ হাজার ৮৮৪টি চুলার সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ মোট ৬ লাখ ৩ হাজার ৯৭৫টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অবৈধ ব্যবহারের কারণে ২৫০টি শিল্প, ৩২৯টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ৫৫টি ক্যাপটিভ এবং ১০টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে ৩২১ কোটি ৮১ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল এবং ৯১ কোটি ২৫ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল বাবদ আদায় হয়েছে মাত্র ৩৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
হারুনুর রশীদ মোল্লাহ আরও বলেন, ‘অভিযোগের কারণে তিতাসের লোকজনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমার সময়ে আটজনকে বরখাস্ত করেছি, ১৬ জনকে সাময়িক বরখাস্তসহ ২২৮ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ৯১ জনকে শাস্তিমূলক বদলি করেছি। ৫০ থেকে ৬০ জন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিচ্ছিন্নের পর পুনরায় সংযোগ কিছু সংযোগ হয়তো লাগতে পারে। তবে নিবিড়ভাবে সেগুলো মনিটরিং করা হচ্ছে।’
সম্প্রতি রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকায় অবৈধ সংযোগ ঠেকাতে পুরো এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে চরম বিতর্ক ওঠে বৈধ গ্রাহকদের লাইন বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে। অনেক সময় দেখা যায়, সকালে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, বিকেলে আবার বসিয়ে নিচ্ছে। এভাবে এক ধরনের চোর-পুলিশ খেলা চলছে তিতাস ও অবৈধ ব্যবহারকারীদের মধ্যে।
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘অবৈধ সংযোগের বিষয়ে আমরা অনেক অভিযান পরিচালনা করেছি এবং এসব অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমরা জনসংযোগ করছি, বলেছি চুরি ঠেকাতে আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন, লোকজনও সচেতন হচ্ছে। গ্রাহকদের বলেছি লাইন কেটে দেওয়ার পর আবার লাইন বসলে সেই অঞ্চলের লাইন বন্ধ করে দেওয়া হবে। এতে আমরা অনেক ভালো ফল পেয়েছি। তবে আরও কঠোর আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’
এমএ/