মায়ানমারে গৃহযুদ্ধের কারণে সীমান্তে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং আশ্রয় নেওয়া সেনা ও পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাবাসনে চীন-ভারতের পাশাপাশি আসিয়ান সদস্য দেশগুলোরও সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। দফায় দফায় এসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে ঢাকা।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিকভাবে অগ্রসর হতে হবে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরাও। এ জন্য মায়ানমার ও বাংলাদেশের কমন বন্ধুদেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে বলে মনে করছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার কূটনৈতিকভাবেই অগ্রসর হচ্ছে। আমিও মনে করি, কোনো ধরনের যুদ্ধে না জড়িয়ে কূটনৈতিক উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত বাংলাদেশের। প্রয়োজনে জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করতে হবে।’
ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক
তিন দিনের নয়াদিল্লি সফর শেষে আজ শুক্রবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দেশে ফেরার কথা রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের। দ্বিপক্ষীয় ইস্যুর পাশাপাশি মায়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে দফায় দফায় ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী নয়াদিল্লিতে নেমেই বৈঠক করেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে। অজিত দোভাল সম্প্রতি ঢাকা সফরে এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। অজিত দোভালের সফর নিয়ে ঢাকা বা নয়াদিল্লি কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তার সফরকালে মায়ানমার পরিস্থিতি প্রাধান্য পায়।
গত বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকেও মূল এজেন্ডা ছিল মায়ানমার পরিস্থিতি। বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের পূর্ণ অধিকারসহ তাদের নিজ দেশ মায়ানমারে প্রত্যাবাসন এবং মায়ানমার চলমান পরিস্থিতি নিয়েও একযোগে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কারণ যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, সেটা ভারতের জন্যও উদ্বেগের।’
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে কথা বলা ভালো হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বিলম্ব হলে তা ভারতের জন্যও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করবে। বিশেষ করে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে চীনের সঙ্গেও কথা বলতে হবে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘কোনো একটা দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়াটা ঠিক নয়। চীন ছাড়াও মায়ানমারের সঙ্গে আরও কয়েকটা দেশের বন্ধুত্ব আছে, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশেরও বন্ধুত্ব আছে। যেমন ভারত ও জাপান। আমার মনে হয়, জাপানের দিকটাও খেয়াল রাখা দরকার।’
বেইজিংয়ের সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা
বাংলাদেশে যে ১২ লাখের বেশি মায়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক আশ্রয় নিয়েছে তাদের প্রত্যাবাসনে অফিশিয়ালি মধ্যস্থতাকারী চীন। দেশটির মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠকও হয়েছে। মায়ানমারের পরিস্থিতি শান্ত থাকলে গত বছরের ডিসেম্বরে কিছু রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন হতো বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে মায়ানমারের গৃহযুদ্ধের আঁচ বাংলাদেশে লেগেছে এবং বাংলাদেশের ভেতর মর্টার শেল এসে পড়ছে নিয়মিত। এতে মানুষ আহত-নিহত হচ্ছে। এমন নিরাপত্তাঝুঁকির পরিপ্রেক্ষিতে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা।
মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ মারাত্মক আকার ধারণ করলে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন শাসক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকেই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চীনের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।
চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বর্ডার গার্ড পুলিশ ও সেনাদের ফেরত নেবে মায়ানমার। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে চাপ দিতে পারে এভাবে যে সৈন্যদের সঙ্গে তোমাদের নাগরিক রোহিঙ্গাদেরও ফেরত নাও। মায়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী চীন ও ভারতের মতো দেশ ছাড়া এসবের কিছুই হবে না। তাই এসব দেশের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে।’
আসিয়ানের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে
১০টি সদস্য দেশ ও দুটি পর্যবেক্ষক দেশ নিয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ-ইস্ট এশিয়ান নেশন্স বা আসিয়ান গঠিত। মায়ানমারও আসিয়ানভুক্ত। অন্য সদস্য দেশগুলো হলো ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম।
বাংলাদেশ আসিয়ান সদস্য দেশগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আসিয়ান ঢাকা কমিটির সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। ব্রুনাই দারুসসালাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ ঢাকার আসিয়ান মিশনগুলোর বিশিষ্ট মিশনপ্রধান এবং কূটনীতিকরা যোগ দেন।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রসচিব আসিয়ান সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য সম্ভাব্য কিছু খাত তুলে ধরেন এবং আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার জন্য তাদের সমর্থন চান। এ ছাড়া মায়ানমারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানা যায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর থেকেই মূলত প্রত্যাবাসনে আসিয়ানের সহযোগিতা চেয়ে আসছে বাংলাদেশ। শুধু তা-ই নয়, আসিয়ানের সদস্য বা পর্যবেক্ষক না হয়েও গত বছরের শেষ দিকে ৪৩তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ।