ঢাকা ৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির খসড়া ফাঁস বিশ্বকাপে প্রথম গোলে পর্তুগালের সঙ্গে সমতায় কঙ্গো ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে: জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল মেসির পর রোনালদোর কীর্তি পর্তুগালের একাদশে রোনালদো ইরান ও লেবাননে মানবিক সহায়তা দেবে চীন লায়লা বাউলের পাশে দাঁড়াল সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ফের উত্তপ্ত লেবানন, নতুন হামলা ইসরায়েলের চুক্তি না মানলে ইরানে ফের হামলার হুমকি ট্রাম্পের ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপন অনুষ্ঠান হবে জুনের শেষ সপ্তাহে ঝিনাইদহে মোটরসাইকেল চোরচক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে ভারত—হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি মায়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হবে, ভারত সীমান্তেও পরিকল্পনা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যারা বলে ‘সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না’ তাদের থেকে সতর্ক থাকুন: প্রধানমন্ত্রী রংপুরের ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় ৬৬৫ নারী নাসার আর্টেমিস থ্রি মিশনের নভোচারীদের নাম চূড়ান্ত নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে দুই শ্রমিক নিহত শেষ যাত্রা জানাজায়, মাঝপথেই থেমে গেল জীবন সাজেকে বিজিবির বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ বিতরণ পিটারসেন অটোমোটিভ মিউজিয়াম অটোমোবাইল ডেস্ক সময় টিভির এমডি জোবায়েরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ZEEHO Bangladesh ও Riding School BD-এর মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর যুক্তরাষ্ট্রে ৫ হাজার ৮০৭ প্রবাসীর হাতে যাচ্ছে এনআইডি হেরোইনসহ মা-বাবা ও ছেলে আটক, বাড়িতে আগুন সমুদ্রের নিচে চীনের নতুন ডেটা সেন্টার সোনারগাঁয়ে স্কুল ফাঁকি দিয়ে মেঘনায় গোসল, দুই স্কুল ছাত্রের মৃত্যু বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমল ৫ শতাংশের বেশি সোনারগাঁয়ে মেঘনায় গোসলে নেমে ২ শিক্ষার্থীর মৃত্যু নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ডে নির্মিত হচ্ছে ৫টি ‘রিভারাইন পেট্রল ভেসেল’ স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরে স্যামসাংয়ের নতুন ল্যাপটপ
Nagad desktop

স্থায়ী অফিস ছাড়াই চলছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৪, ১১:০৪ এএম
আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২৪, ১২:০৯ পিএম
স্থায়ী অফিস ছাড়াই চলছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি

সারা দেশের মতো সিলেটের রাজনীতির মাঠেও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তাদের কর্মসূচি চলে পাল্টাপাল্টি। রাজনৈতিক মত ও পথও ভিন্ন। তবে দল চালানোর পন্থা অভিন্ন। সেটি হচ্ছে সিলেটে আওয়ামী লীগ-বিএনপির দলীয় কার্যালয়ভিত্তিক সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই। দীর্ঘদিন ধরে এক ধারা বা মতাদর্শে এগোচ্ছে দুই দলই। এ জন্য দুই দলের কর্মীরা ঠাট্টা করে বলছেন, ‘এক তরিকা’!

এই ‘এক তরিকা’ হচ্ছে সিলেটে দুটি দলেরই কোনো স্থায়ী কার্যালয় নেই। কার্যালয়বিহীন কার্যক্রম চলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের বাসাবাড়ি থেকে। নেতা বা নেতৃত্ব পরিবর্তন হলে বাসাবাড়ির সেই সব অঘোষিত অস্থায়ী কার্যালয়ের স্থানও দ্রুত বদলে যায়। কার্যালয় নিয়ে এই ঘূর্ণিপাকে দল দুটির কর্মীরা অসন্তুষ্ট হলেও নেতারা ভাবলেশহীন। জানতে চাইলে তারা বলেন, হবে। তবে হবেটা কবে, তা-ও সুনির্দিষ্ট নয়। 

সিলেটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কার্যালয়ভিত্তিক কার্যক্রম না থাকার বিষয়টি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের এক অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে। এ নিয়ে সম্প্রতি একটি জরিপে বলা হয়, সিলেট বিভাগের সিলেট ছাড়া অন্য তিন জেলায় স্থায়ী কার্যালয় না হলেও সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে অস্থায়ী কার্যালয় পরিচালনা করতে দেখা গেছে। সিলেটে দলীয় কার্যালয় নিয়ে চলে দলাদলি। এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ সাধারণ কর্মীরা ঠাট্টার সুরে দুই দলের এই ধারাকে ‘এক তরিকা’ বলে মন্তব্য করেছেন। জরিপের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মাঠের কর্মীদের নেতারা তাদের নিজ নিজ বলয়ে রাখার প্রবণতায় স্থায়ী কার্যালয় হচ্ছে না। 

জানা গেছে, সিলেটে আওয়ামী লীগের রাজনীতির জেলাভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালিত হয় স্বাধীনতার আগে থেকে। স্বাধীনতার পর প্রথম জেলা সভাপতি দেওয়ান ফরিদ গাজী ১৯৭৩ সালে প্রতিমন্ত্রী হলে তার বাসভবন থেকে পরিচালিত হয় সাংগঠনিক কার্যক্রম। আশির দশকে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রহিম সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে কার্যালয়ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তালতলার গণি ম্যানশনে সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে কয়েক দিন চলেছিল কার্যালয়ভিত্তিক সাংগঠনিক কার্যক্রম। 

দেওয়ান ফরিদ গাজীর বাসা সিলেট নগরীর লামাবাজার এলাকায়। সিলেটে আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রায় অর্ধশতাধিক বছরের পথপরিক্রমায় নেতৃত্বসহ রাজনৈতিক নানা পটপরিবর্তনে অস্থায়ী কার্যালয় জিন্দাবাজার-পুরান লেন, আম্বরখানা, ছড়ারপার, বাগবাড়ী, ধোপাদীঘির পূর্ব পার, তেলিহাওর হয়ে নগরীর প্রান্তসীমার টিলাগড় পর্যন্ত গড়িয়েছে। বর্তমান জেলা সভাপতি ও প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরীর বাসা টিলাগড়ের শাপলাবাগ এলাকায়। নেতাদের বাসা ছাড়াও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ভিত্তিক কার্যক্রমে জেলা পরিষদের মিলনায়তনও ব্যবহার হয়। সিলেট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান।

অন্যদিকে সিলেটে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে অনেকটা আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। জাগো দল থেকে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রমের সূত্রপাত হলে সিলেটে নেতাদের বাসাবাড়ি অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হয়। কাস্টঘর এলাকায় জাগো দলের কার্যালয় বিএনপি কার্যালয়ে রূপান্তর করা হয়েছিল। এরপর অনেকটা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম অনুসরণ করে নেতাদের বাসায় বাসায় কার্যক্রম চলে। নব্বইয়ের দশকে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। 

স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বলেছেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হলে কার্যালয়ভিত্তিক কার্যক্রম যথারীতি আওয়ামী লীগের মতো করে পরিচালিত হয়। শেখঘাট, লামাবাজার, সোবহানীঘাট, আম্বরখানা, জিন্দাবাজার-পুরান লেন, কুমারপাড়া, ভার্থখলা, তাঁতীপাড়া ও শাহজালাল উপশহরে নেতাদের বাসায় অস্থায়ী কার্যালয়ে চলছে কার্যক্রম। 

তাঁতীপাড়ায় নগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও উপশহরে জেলা সভাপতি আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরীর বাসা। এই দুই নেতার বাইরে নগরীর কুমারপাড়ায় সাবেক সিটি মেয়র ও দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরীর কুমারপাড়ার বাসাটির সামনে একটি বৈঠকখানাও অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন বিভাগীয় অফিস/বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ সাইনবোর্ড রয়েছে। সিলেটে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল থেকে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় আরিফুল হকের অনুসারী রয়েছে দলটির সহযোগী সংগঠনে। এসব সংগঠন ঘরোয়া সভায় ব্যবহার করে সাইনবোর্ড সাঁটানো বৈঠকখানাটি।

১৯৯১ সালে জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে বিএনপিদলীয় প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মালিক সংসদ সদস্য হন। ওই সময় তার উদ্যোগে একবার স্থায়ী কার্যালয় করার চেষ্টা হয়েছিল। এরপর ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে বিএনপি দ্বিতীয়বার ক্ষমতাসীন হলে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর বাসার সামনে বৈঠকখানাকে কার্যালয় হিসেবে চালানো হয়। তখন আরিফুল হক ছিলেন মহানগর বিএনপির সভাপতি।

মহানগর বিএনপির বিগত আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করা মিফতাহ্ সিদ্দিকী বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় পেরিয়ে ১৯৯১ সালে দলটি যখন ক্ষমতাসীন হয়েছিল, স্থায়ী কার্যালয় করার বিষয়টি আলোচনা হয়েছিল। এরপর আর আলোচনার মধ্যেই আসেনি। নেতাদের বাসাবাড়িমুখী তৎপরতা ওই সময়ের পর থেকেই শুরু হয়। 

জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নূরে আলম সিরাজী কার্যালয়ভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করা প্রয়াত নেতা আবদুর রহিমের নেতৃত্বের সময়কে সুবর্ণকাল বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে তালতলার গণি ম্যানশন থেকে পরিচালিত দলীয় কার্যক্রম পরবর্তী সময়ে অনুসরণ করার চেষ্টা হয়েছিল চালিবন্দরে ইব্রাহিম স্মৃতি সংসদ থেকে। সেখানে জেলা ও মহানগরের কার্যালয় হিসেবে সাইনবোর্ড আছে। কিন্তু কার্যালয়ভিত্তিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি বলে এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে নিয়ে এক তরিকা বা একই মতাদর্শী কথার উদ্ভব হয়েছে। 

এদিকে সিলেটে স্থায়ী কার্যালয় করতে আওয়ামী লীগের আছে ‘কমপ্লেক্স’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব। আর বিএনপি ‘সময় অনুকূল’ হলে বিষয়টি বাস্তবায়ন ভাবনার মধ্যে রেখেছে। দুই দলের দুই উদ্যোগ কত দূর? জানতে যোগাযোগ করলে দায়িত্বশীল নেতারা সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি।

সিলেটে জাতীয়তাবাদী যুবদল থেকে বিএনপির নেতৃত্বে আছেন জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী। দলীয় কার্যালয় কি কখনো ছিল? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘স্থায়ী কার্যালয় কখনো ছিল না। তবে অস্থায়ী কার্যালয় আছে শাহজালাল উপশহরে।’ 

স্থায়ী কার্যালয় কেন নেই? এ প্রশ্নে কাইয়ূম চৌধুরী বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে স্থায়ী কার্যালয় নেই। বিভিন্ন সময় বিভিন্নজন দায়িত্বে এসেছেন। তারা কেউ উদ্যোগ নেননি। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সময় অনুকূলে না থাকাও একটি কারণ।’

বিএনপির স্থায়ী কার্যালয় করতে জেলা সভাপতির বলা ‘সময় অনুকূল’ বিষয়টি খোলাসা না করলেও তার কথায় বোঝা গেছে, দলটি ক্ষমতাসীন হলে পরে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে। তার আগে নয়। 

একাধিকবার নগর বিএনপির নেতৃত্বে থাকা সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন জানিয়েছেন, এখন তাঁতীপাড়ায় তার বাসার একটি অংশ অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থায়ী কার্যালয় না থাকা বা সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে অস্থায়ী কার্যালয় না করা প্রসঙ্গে নাসিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘অনেকেই ভাড়া দেয় না রাজনৈতিক দলকে। তা ছাড়া বিভিন্ন সময় যারা নেতৃত্বে আসেন বা এসেছেন, তারা কার্যালয় ম্যানেজ করতে পারেননি। যে যার যার মতো মেইন্টেইন করেছেন। কর্মীরা সব সময় বলছেন কার্যালয় দরকার। আমরাও ফিল করছি কার্যালয় দরকার। কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে।’ 

এদিকে নগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় নগরীর চালিবন্দর এলাকায় ইব্রাহিম স্মৃতি সংসদকে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের স্থায়ী কার্যালয় হিসেবে গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এখনো সেখানে সাইনবোর্ড আছে, কিন্তু কার্যক্রম নেই।

ইব্রাহিম আলী একজন অকৃতদার রাজনীতিবিদ ছিলেন। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক পদে থাকাকালে ২০০৪ সালের ৭ আগস্ট গুলশান সেন্টারে জঙ্গিদের গ্রেনেড হামলায় নিহত হন। তার স্মরণে ইব্রাহিম স্মৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। প্রয়াত বদরউদ্দিন আহমদ কামরান তখন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে কার্যালয়ভিত্তিক সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৩ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ইব্রাহিম স্মৃতি সংসদে উদযাপন করা হয়েছিল। 

২০২০ সালের ১৫ জুন করোনায় কামরানের মৃত্যুর পর কার্যালয়মুখী আর কেউ হননি। ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব বদল হলে ইব্রাহিম স্মৃতি সংসদ আর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হয়নি। সরকারের নতুন মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর বর্তমান সংসদ সদস্য ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছিলেন, কেবল সাইনবোর্ড দিয়ে কার্যালয় নয়, ‘আওয়ামী লীগ কমপ্লেক্স’ করে সেখানে স্থায়ী কার্যালয় করা হবে। কিন্তু মোমেনের মন্ত্রী থাকার পাঁচ বছরে কমপ্লেক্স নির্মাণের ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে আব্দুল মোমেন খবরের কাগজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘সিলেট হলো আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এখানে কত ধরনের অফিস আছে, আওয়ামী লীগের অফিস নেই কেন? তাই এ নিয়ে আমি স্থায়ী কার্যালয় করতে আওয়ামী লীগ কমপ্লেক্স স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন মত। যার ফলে এখনো হয়নি। কোথাও জায়গা নিতে গেলে এক দল বলে এখানে, আরেক দল বলে এখানে না। এসব কারণে হয়নি। কবে হবে আমি জানি না।’ 

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সিলেটে আওয়ামী লীগের স্থায়ী কার্যালয় বা কমপ্লেক্সের জন্য একটি কমিটি করা হয়েছিল। অনেকের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব আসে। এসব প্রস্তাব নিয়ে একমত হওয়া যায় না। সব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে স্থায়ী কার্যালয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ তবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কবে হবে, এ বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। 

রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় বড় দুই দলের কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কর্মীদের প্রতি নেতাদের জবাবদিহি খুব সহজেই প্রতিষ্ঠা পাবে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এক নেতার বাসায় গিয়ে দেখেছেন, তিন স্তরের নেতা-কর্মীর জন্য তিনটি কক্ষ বরাদ্দ। নিজ বাসাকে দলের জন্য বরাদ্দ করার পেছনে ত্যাগ হিসেবে দেখালেও এটি মোটেও তা নয়। এই ত্যাগ পরিত্যাগ হয় যখন নেতৃত্ব থাকে না। 

কার্যালয়ভিত্তিক কার্যক্রম নেই বলে সিলেটে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দলমুখী নয়, নেতামুখী বলে মনে করেন ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। এ অবস্থার পরিবর্তনে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘সময় অনুকূল নয় বলে বিএনপির সময়ক্ষেপণ হয়তো ক্ষমতাসীন হওয়ার অপেক্ষা। বিষয়টি তাদের জন্য মানা যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের বেলায় কোনো অজুহাত খাটে না। একটানা ক্ষমতাসীন থাকার মধ্যেও স্থায়ী কার্যালয় বা প্রস্তাবিত কমপ্লেক্স করতে না পারা স্থানীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা।’

নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায়

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায়
নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি কেটে জলাশয়ে পরিণত করেছেন ঠিকাদারের লোকজন। ছবি: খবরের কাগজ

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পদ্মা সেতুর রেললাইনের সংযোগ উড়াল সেতুর পিলারের নিচে থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দিয়েছেন ঠিকাদার। পিলারের নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লক তুলে ফেলা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে মাটি কাটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মাটি কাটায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত পদ্মা রেলসেতুর সংযোগ রেললাইনের উড়াল সেতুটি রেলওয়ের হলেও প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার্স কোর। প্রকল্পটির প্রধান নির্মাতা চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। তবে বাংলাদেশের সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে রিংটেক লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান আলীগঞ্জ ভায়াডাক্ট (উড়াল সেতু) নির্মাণে যুক্ত ছিল। দুটি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুসারে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনো তারা প্রকল্পের বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে যাচ্ছে। এমনকি বিক্রি থেকে বাদ যায়নি মাটিও।

গতকাল মঙ্গলবার আলীগঞ্জ উড়াল সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে মাটি কাটার কারণে রেললাইনের সংযোগ সেতুর পাঁচটি পিলারের নিচের দুই পাশে মাটি নেই। রেললাইনের ৮৫ নম্বর পিলার থেকে শুরু করে ৮৯ নম্বর পিলার পর্যন্ত পিলারের প্রায় ১৭৫ মিটার এলাকাজুড়ে গভীর করে মাটি কাটায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মাটির নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লকগুলো তুলে ওপরে ফেলে রাখা হয়েছে। এতে পদ্মা সেতুর সংযোগ রেললাইনের উড়াল সেতুর পিলারের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা তৈরি হওয়ায় প্রতিবাদ জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে স্থানীয় একটি ইটভাটার মালিক পরিচয়ে পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে ট্রাকভর্তি করে দাপা এলাকায় নিয়ে গেছে। এলাকাবাসী বাধা দিলে ইটভাটার মালিক কুতুবপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার এবং ফতুল্লা শ্রমিক লীগ নেতা আবু বক্কর তা মানেননি, বরং রেলসেতুর পিলারের পাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার পাশাপাশি মাটির নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লকও তুলে ফেলা হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে চলাচলের রাস্তাও। মেম্বার এলাকাবাসীকে জানিয়েছেন, ঠিকাদারের কাছ থেকে তার ভাটার জন্য তিনি মাটি কিনেছেন। পরে মাটি কাটার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনের লোকজন মাটি কাটা বন্ধ করে দেন। তবে মাটি ফেরত এনে খনন করা গর্ত ভরাট করা না হলে রেল চলাচলের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। 

ভিডিও দেখে মাটি কাটা বন্ধ করে দেওয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ওইখানে রেলওয়ের লোকজনসহ ঠিকাদারদের মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছি। রেললাইনের সংযোগ উড়াল সেতুর পিলার রক্ষার পরবর্তী কাজ করবে রেল কর্তৃপক্ষ।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাটি কাটার কোন বৈধ অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক রায়হান কবির। তিনি খবরের কাগজে বলেন, মাটি কাটার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে দেশি-বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে নথিপত্রসহ হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু তাদের মাটি কাটার বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসন তাই মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি গর্ত ভরাটে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।

মুঠোফোনে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, রেলওয়ে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মাটি কাটার অনুমতি দেয় না। যারা মাটি কেটেছে তাদের মাটি নেওয়ার চুক্তিও নেই। তাদেরকে মাটি অপসারণের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অনুমোদনহীন মাটি কাটার বিষয়ে ইতোমধ্যে রেলওয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই তদন্ত কমিটিই পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলে জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১২ এএম
জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি
ছবি: সংগৃীহত

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ছে ব্রহ্মপুত্র নদ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ মেয়াদে এই নদে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। এর ফলে ভবিষ্যতে অববাহিকা এলাকায় খরার তীব্রতা যেমন বাড়বে, তেমনি হুমকির মুখে পড়বে নদীর পরিবেশগত প্রবাহ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডব্লিউএফএম) একদল গবেষক এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন। জার্নাল অব ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জে চলতি বছর তাদের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন জারিন তাসনিম ও এ কে এম সাইফুল ইসলাম। গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেন ইন্দ্রনীল সরকার, মো. সাইদুজ্জামান, খন্দকার এম অনিক রহমান, মোহাম্মদ আসাদ হোসেন এবং মো. সাদমান সাকিব। গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের অর্থায়নে ‘ইনহ্যান্সিং কোস্টাল রেজিলিয়েন্স থ্রু নেচার-বেজড সলিউশনস’ প্রকল্পের আওতায় এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। 

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দূরপাল্লার পূর্বাভাস
গবেষণায় সিএমআইপি-৬ ক্লাইমেট প্রজেকশন (গ্লোবাল ক্লাইমেট মডেল) এবং সয়েল অ্যান্ড ওয়াটার অ্যাসেসমেন্ট টুল–‘স্যাট’ নামক হাইড্রোলজিক্যাল মডেল ব্যবহার করে ব্রহ্মপুত্র নদের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, ২০৪০ থেকে ২০৬৯ সময়কালে নদে পানির প্রবাহ সামান্য বাড়তে পারে। তবে ২০৭০ সাল থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি সময়ে পানির প্রবাহ প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

স্টান্ডার্ডাইজড ডিসচার্জ ইনডেক্স বিশ্লেষণ বলছে, ভবিষ্যতে এই অববাহিকায় শুষ্ক ও আর্দ্র চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ বাড়বে। বিশেষ করে দূর ভবিষ্যতে খরার তীব্রতা ও পৌনঃপুনিকতা অনেক বেশি হবে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।

নদীর স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় জরুরি ‘ইকোলজিক্যাল ফ্লো’ নিয়েও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি মডেল এসএসপি৩-৭.০ অনুযায়ী, নিকট ভবিষ্যতেই নদীর প্রবাহ প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানির প্রবাহের এই নিম্নমুখী প্রবণতা জলজ প্রাণীর প্রজনন ও সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকরা জানান, ব্রহ্মপুত্র একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তসীমান্ত নদ, যা বাংলাদেশসহ চারটি দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। ভবিষ্যতের চরম অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় গবেষকদের পরামর্শ হলো অবিলম্বে সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি আন্তসীমান্ত সহযোগিতা বৃদ্ধি ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কংক্রিটের জঙ্গলে জলবায়ু ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনের মরণফাঁদে থাকা বাংলাদেশের শহরগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় কেবল কংক্রিটের স্থাপনা আর যথেষ্ট নয়। এর বদলে শহর গড়ার পরিকল্পনা ও অবকাঠামো নির্মাণে ‘প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান’ গ্রহণের বিকল্প নেই বলে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এবং গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) এক নতুন প্রতিবেদনে।

২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ‘কম্পেনডিয়াম অন নেচার-বেজড সলিউশনস ফর আরবান রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রথাগত উন্নয়নের চেয়ে প্রকৃতিকে সঙ্গী করে নেওয়া অবকাঠামোই ভবিষ্যতে শহরগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিকে যেমন তীব্র তাপপ্রবাহ বাড়ছে, অন্যদিকে পানিসংকটের মতো সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথাগত ‘ধূসর’ বা কৃত্রিম অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানকে একটি সাশ্রয়ী ও টেকসই বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে খরা
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ খরা এখন কেবল স্থানীয় সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণা কর্মসূচি-ক্লেয়ার প্রোগ্রামের অধীনে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণা ও অভিযোজনমূলক কার্যক্রম নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আজ ১৭ জুন ‘বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এশিয়া ও আফ্রিকার খরাপ্রবণ অঞ্চলের পরিবর্তনের এই চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক দশকে বিশ্ব এমন সব খরার মুখোমুখি হয়েছে, যা গত কয়েক দশকের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ভারত, নেপাল, উগান্ডা, তাঞ্জানিয়া ও কেনিয়াসহ আফ্রিকার ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলের দেশগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে প্রকট। এই খরা কেবল ফসলের ক্ষতিই করছে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানির সংকট, জনবসতির স্থানচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক সংঘাত খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলছে।

এই প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, খরা মোকাবিলায় কেবল প্রযুক্তি বা অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পানির ন্যায্য বণ্টন। খরাপ্রবণ দেশগুলোকে জলবায়ু বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ সংকুলান রাখার পরামর্শও দিয়েছে ক্লেয়ার

শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি
ছবি: সংগৃহীত

খেলার মাঠের হইহুল্লোড় কিংবা বইয়ের পাতার ঘ্রাণ–শৈশবের এই চিরচেনা অনুষঙ্গগুলো এখন অনেকটাই ইতিহাস। বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের শৈশব এখন বন্দি হয়ে পড়েছে স্মার্টফোনের নীল আলোর স্ক্রিনে। ফেসবুক, টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের ভার্চুয়াল জৌলুশে বুঁদ হয়ে থাকা এই প্রজন্ম কেবল শারীরিক সক্ষমতাই হারাচ্ছে না, বরং জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাং কালচারসহ নানা ভয়াবহ অপরাধ ও মানসিক অস্থিরতায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই লাগামহীন ব্যবহার কোমলমতি শিশুদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে ডেকে আনছে এক মারাত্মক বিপর্যয়। 

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে এখন নজিরবিহীন কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। ফ্রান্স, স্পেন, ব্রিটেন ও চীনের মতো দেশগুলোও নিয়েছে একই পথ। বিশ্বের প্রায় ৭৯টি দেশে স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। 

স্ক্রিনে বন্দি শৈশব ও মানসিক অবক্ষয়
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম শিশুদের মধ্যে ‘ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তৃপ্তিবোধের এমন এক আসক্তি তৈরি করছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাস্তব জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হওয়া এই শিশুরা ক্রমেই সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, স্থূলতা এবং দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এখন ঘরে ঘরে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল হয়রানির শিকার। অথচ প্রযুক্তির এই অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা রূপ নিচ্ছে সামাজিক ব্যাধিতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বলে জানান সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাদের সাইকোলজিক্যাল ও সাইকো-সোশ্যাল সমস্যা হচ্ছে। আমরা লক্ষ্য করছি যে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ফলে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে।’

নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে শিশুদের বিপথগামী হওয়ার বিভিন্ন উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে অল্প বয়সে বিয়ের মতো ঘটনা বাড়ছে, যা পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতা তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচয় হওয়ার সূত্র ধরেই এমন পরিণতির দিকে এগোচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা।

কিশোর গ্যাং: স্মার্টফোনের অন্ধকার অধ্যায়
প্রযুক্তির আশীর্বাদের আড়ালে ডালপালা মেলছে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি। অপরাধের নীল নকশা তৈরি, সদস্য সংগ্রহ, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া–সবকিছুর মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। র‌্যাবের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে প্রায় ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও টিকটক ব্যবহার করেই তারা অপরাধের যাবতীয় সমন্বয় করত। টিকটক বা ফেসবুকে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা অনেক মেধাবী কিশোরকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অপরাধের পথে।

বিশ্বজুড়ে কড়াকড়ি, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মুর্তুজা জুলকার নাঈন নোমান।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সাইবার নিরাপত্তা আইন, বিপিডিএ বা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আলোকে আমরা সাইবার বুলিং মোকাবিলায় গুরুত্ব দিচ্ছি। যদি সরকার ভবিষ্যতে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজনীয়তা মনে করে, তবে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা নতুন নীতিমালা তৈরির সুযোগ রয়েছে। আইসিটি বিভাগ এবং ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি (এনসিএ) তখন সে অনুযায়ী কাজ করবে।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশিদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের এখানে (আইসিটি বিভাগ) এখনো এ বিষয়ে কোনো কিছুই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। হয়তো এই বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা হবে।’

ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিং ও আইনি সুরক্ষা
অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে ব্ল্যাকমেইলিং ও যৌন হয়রানির ঘটনা এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি সরকার ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি ও রিভেঞ্জ পর্নো ছড়ানোর মতো অপরাধের শাস্তি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান করেছে।

তবে আইনি প্রতিকারের চেয়েও বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম মনে করেন, ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় রেস্ট্রিকশন আরোপ করা এখন সময়ের দাবি।

একক নয়, সমন্বিত উদ্যোগের পরামর্শ
ইউনিসেফ এবং সরকারের যৌথ উদ্যোগে ইতোমধ্যে অনলাইন সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্সের আওতায় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার শিশুকে সনদ প্রদান করা হয়েছে। তবে পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ইউনিটে গত ৬ বছরে ৬০ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ার ঘটনা প্রমাণ করে, সাইবার সহিংসতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে। শিশুদের অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক কাঠামো ও পারিবারিক বন্ধনের যথাযথ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

সম্প্রতি শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনার সময় এমন মতামত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিশুদের অপরাধ প্রবণতার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কোনো একটি কারণকে কেন্দ্র করে এর সমাধান সম্ভব নয়। এটি অনেক উপাদানের একটি অংশ মাত্র।’

অধ্যাপক মাহবুবা সুলতানা মনে করেন, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা অন্য দেশ থেকে ভিন্ন। এ দেশের সমাজব্যবস্থায় এখনো অনেক ক্ষেত্রেই যৌথ পরিবারব্যবস্থা বিদ্যমান এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বেশ সক্রিয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো পিয়ার গ্রুপ এবং আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এই সামাজিক কাঠামো ও সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে যেকোনো প্রযুক্তি বা মাধ্যমকে পজিটিভলি কাজে লাগানো সম্ভব। এসব কারণেই অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট অনেকটাই মিনিমাইজ করা সম্ভব হয়।’

তবে এ বিষয়ে আরও নিবিড় গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অন্য দেশের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট হুবহু মিলবে না। এ জন্য বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে সময় সাপেক্ষে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কনটেক্সট ভিন্ন হওয়ায় শিশুদের এই সংকট মোকাবিলায় কোনো একমুখী চিন্তার সুযোগ নেই বলেও মত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট 
শিশু ও কিশোরদের ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত ফেসবুক, টিকটকসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং এসব প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার রোধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করতে যাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নূরী। আগামী রবিবার লিগ্যাল ভয়েস ফাউন্ডেশনের পক্ষে তিনি এই রিট আবেদন করবেন। এতে বিবাদী করা হয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি)। 

কর্মসংস্থানের রূপরেখা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:০৭ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:১৬ এএম
কর্মসংস্থানের রূপরেখা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: খবরের কাগজ

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া শিল্প-বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বেশ কিছু খাতে রাজস্ব ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দেশে ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এমন হিসাবের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

তবে অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রণোদনা ও রাজস্ব ছাড় দিলেই কর্মসংস্থান বাড়বে, এমন না। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির টানাপোড়েনের নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ না থামলে দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। এ ছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দীর্ঘসূত্রতাও বিনিয়োগ না বাড়ার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে জ্বালানির দাম বেড়েছে। বাজেটে এসব সংকট দূর করতে দিকনির্দেশনা নেই। আর তাই বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপে কর্মসংস্থান বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই।      

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেওয়া পদক্ষেপের সঠিক বাস্তবায়ন হতে হবে। কর্মসংস্থান তিনভাবে বাড়তে পারে: সরকারি, বেসরকারি এবং বিদেশে। 

তিনি বলেন, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিতে চেয়েছে। এটা সরকারি খাতে কর্মসংস্থান। এভাবে কিছু কর্মসংস্থান সরকারের হাতে আছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। ভূরাজনীতির ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির টানাপোড়েন কত দিন চলবে, তা আমরা জানি না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। শুধু প্রণোদনা, রাজস্ব ছাড় ও নীতি সহায়তায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে না। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য দুর্নীতি, জ্বালানি সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ আরও অনেক কিছুর সমাধান দরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে এসব সংকটের সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে আর তা কতটা বাস্তবায়ন হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।     

প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ-তরুণীকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কর্মে যুক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে অর্থ বিভাগের এসআইসিআইপি কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে উচ্চ দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

মন্ত্রী আরও বলেন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ৩ লাখ ৭০ হাজার গ্রামীণ শ্রমিককে কাজের সুযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে ৪৫ হাজার নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। 

বাজেটে তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফ্রিল্যান্সিং এবং অনলাইন মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশগামী ও প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে নতুন করে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ ব্যবস্থা চালুর কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ, স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় কর কাঠামো যৌক্তিকীকরণ, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং স্টার্ট-আপ ও সিএসএমই প্রণোদনার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা যদি সত্যিকার অর্থে মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে শিল্পায়ন গতিশীল হবে, যা দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্যচাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির ফলে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪.৭২ শতাংশে নেমেছে, যা বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। 

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সহসভাপতি এবং ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে। নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। এ ছাড়া ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের উচ্চমূল্য আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব মিলিয়ে আগামীতে শিল্প-বিনিয়োগ বাড়বে আর সেখানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে—তার সম্ভাবনা কম। 

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশীয় কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই শিল্প এবং রুগ্ণ ও বন্ধ কলকারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। এ প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল। বাজেটে এই তহবিলের আওতায় বন্ধ কলকারখানা চালুকরণ ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে তিন হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।  

প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতাকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধিতে আমাদের সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এটি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।’

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, দেশে কর্মসংস্থান হোক আমরাও চাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে? সরকার এবারের বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিয়েছে–এটা আশার কথা। এর জন্য কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছেন–যা ভালো উদ্যোগ বলে মনে করছি। কিন্তু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে তো! কারণ দেশের অর্থনীতির সংকট কাটিয়ে শিল্প-বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিরসন না হলে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো কঠিন হবে। 

জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন বহুদূর!

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:৫৩ এএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম
জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন বহুদূর!
ছবি: খবরের কাগজ

দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও আছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল গত মে মাসে। রপ্তানি আয়ে নিম্নমুখী ধারা। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা কমছে না। বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির টানাপোড়েনের প্রভাব বাড়ছে দেশে। আর্থিক খাতে দুর্বলতা বিদ্যমান। ব্যবসা ও শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে গতি না এলে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। বৈশ্বিক সংকটে ও উত্তরাধিকার সূত্রে নির্বাচিত সরকার শিল্প-বিনিয়োগ-ব্যবসা-বাণিজ্যে কতটা গতি আনতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। অবশ্য বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশের কম। এমনকি বৈশ্বিক অচলাবস্থা এবং ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার চলমান সংঘাতের ফলে আগামী বছরও বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরগতিতে চলমান থাকবে বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতিতে সংকট চলছে। এমন প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আগামীতে শিল্প-বিনিয়োগ-কর আদায় বাড়াতে পারলে এই প্রাক্কলন অর্জন সম্ভব। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব বাড়বে, এমন আশা করা সাহসের হবে। কতটা বাস্তবায়নযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি বর্ণনা করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা–সিপিডি, ঢাকা চেম্বারসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিশ্বব্যাংক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসার উচ্চ খরচকে বিনিয়োগ মন্থরতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি হ্রাস পেয়েছে। শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না; উচ্চ সুদের হার ও ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে; জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

স্থবির রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ ও দুর্বল কর রাজস্ব সম্পর্কে প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বলা যায়, আইএমএফ জানিয়েছে, কর রাজস্ব থেকে জিডিপি অনুপাত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তীব্রভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় অনেক কমভারতে যা প্রায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির চাপ সম্পর্কে প্রতিবেদন থেকে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ডাবল ডিজিট থেকে কমলেও এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগের গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রতিবেদন থেকে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশসহ এশীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে, জ্বালানিসংকট বাড়িয়েছে এবং অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি করেছে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংক ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা, দুর্বল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে।

শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হতে পারে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের উচ্চমূল্য আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, প্রাক্কলন সব সময় প্রাক্কলন। আয়-ব‍্যয়ের যে বরাদ্দ ধরা হয়েছে তা যদি ৭০-৮০ শতাংশ অর্জিত হয়, তাহলে জিডিপির প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব হবে না। তবে তা কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

তিনি আরও বলেন, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু বাজেট ঘোষণা যথেষ্ট নয়; বরং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ; ঋণের সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা; কর কাঠামো সহজীকরণ; ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস; নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা; বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণবিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সেখান থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অবশ্যই উচ্চাভিলাষী। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসায়িক আস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি প্রয়োজন। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সরকারের ব্যাংকঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির ফলে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন না হলে উচ্চাভিলাষী এ টার্গেট বাস্তবায়ন হবে অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সহসভাপতি এবং ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিনিয়োগের ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে এ লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। কার্যকর অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং শিল্প খাতের প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। ৬ দশমিকশতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব, তবে এর জন্য বাজেটের ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পবান্ধব নীতি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।