ঢাকা ৩ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয় সিরাজগঞ্জে ট্রাকচাপায় ট্রাফিক পুলিশ নিহত কালুখালীতে অগ্নিদগ্ধ মরদেহ: মূল পরিকল্পনাকারীসহ গ্রেপ্তার ৩ ওমরাহ যাত্রীদের অর্থ আত্মসাৎ: দুই পীরজাদার বিরুদ্ধে মামলা নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতার পদত্যাগ ধামরাইয়ের কালামপুর সাব-পোস্ট অফিস: নাক-মুখ চেপে নিতে হয় সেবা বিশ্বমঞ্চে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক, ক্লোসাকে ছুঁয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা! স্বপ্ন ছোঁয়ার শেষ মিশনে রোনালদো নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায় বাকৃবিতে নজর কাড়ছে পেলে-ম্যারাডোনার গ্রাফিতি জাল ভিসায় ইউরোপে মানব পাচারের অভিযোগ জিআই স্বীকৃতি পেল মানিকগঞ্জেরঐতিহ্যবাহী হাজারি গুড় টি-টোয়েন্টি সিরিজে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি অর্থনীতি ধ্বংসের বোমা: ফরিদা আখতার প্রায় ৫ বছর মেয়াদোত্তীর্ণ ইবি ছাত্রদল কমিটি পবিত্র আশুরা ২৬ জুন জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি দুই বছরেও চালু হয়নি খুবির বধ্যভূমি জাদুঘর, তালাবদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষী ১৭ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল মেসির জোড়া গোলে এগিয়ে আর্জেন্টিনা শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি ১৭ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল উজবেকিস্তান-কলম্বিয়া: স্বপ্ন বনাম প্রত্যাবর্তন কর্মসংস্থানের রূপরেখা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন জ্যোতিদের প্রতিপক্ষ আজ অস্ট্রেলিয়া এবার কত দূর যাবে পর্তুগাল? ঘানা-পানামা: বাঁচা-মরার শুরু ১৭ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার একাদশে আছেন যারা হালান্ডের জোড়া গোল, বিশ্বকাপে উড়ন্ত সূচনা নরওয়ের
Nagad desktop

কম সামর্থ্যেও ধুম কেনাকাটা

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৫০ পিএম
কম সামর্থ্যেও ধুম কেনাকাটা
রাজধানীর নিউ মার্কেটে ঈদ কেনাকাটায় ব্যস্ত ক্রেতারা। ছবি : খবরের কাগজ

সপ্তাহের শেষেই ঈদ। ঈদের নতুন পোশাকের টানে ছুটছেন সবাই। বড় বড় বিপণি কেন্দ্র ছাড়াও এখন ঘরের কাছেই অলিগলিতে গায়ে গায়ে পোশাকের দোকানের ছড়াছড়ি। এমনকি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুমও আছে এখানে-সেখানে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ধারায় আগের তুলনায় বেড়ে গেছে পোশাকের দামও। অনেকের সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না এসব পোশাক কেনার। 

কম সামর্থ্যেও সবাই কিনছেন পোশাক, অলংকার, প্রসাধনী, জুতা-স্যান্ডেলসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিলাসবহুল শপিংমলে দর-কষাকষি ছাড়াই চলে কেনাকাটা। মধ্যবিত্ত বা স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা ফুটপাত। সব জায়গাতেই দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে। যার প্রভাবে আশপাশের সড়কে ব্যাপক যানজট দেখা দেয়। 

খবরের কাগজের পক্ষ থেকে ঢাকার এলাকাভিত্তিক ঈদ-বাজারের পরিস্থিতি সরেজমিনে তুলে এনেছেন শাহনাজ পারভীন এলিস, আনিসুর রহমান, রিনা আক্তার তুলি, সাজ্জাদুল কবির, মেহেদী হাসান খাজা, মো. শফিকুল ইসলাম, গ্লোরিয়া অমৃতা ও মুজাহিদ বিল্লাহ। 

সময় বেলা ১টা। রাজধানীর আসাদগেটের আড়ং শপিং সেন্টার থেকে ঈদের কেনাকাটা শেষ করে বের হচ্ছিলেন কেরানীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা তারেক-রিক্তা দম্পতি। তাদের দুজনের হাতে ১০-১২টি শপিং ব্যাগ। জিজ্ঞেস করতেই রিক্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের জন্য এক ছাদের নিচে পছন্দের পোশাক কিনতে এসেছিলেন। বেশির ভাগ কেনাকাটা আগেই শেষ। এবার আত্মীয়স্বজনের গিফট করতে আরও কিছু পোশাক কিনলেন। গরমের কারণে এবার সুতি ও লিনেন কাপড়ের জামাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি।’

শপিং সেন্টারের ভেতর ঢুকতেই দেখা গেল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। এর মধ্যে স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে শপিংয়ে আসা শারমিন বলেন, ‘কিছু পোশাকে নতুনত্ব থাকলেও বেশির ভাগই গতানুগতিক, তবে দাম খুব চড়া। মেয়ের জন্য আড়ংয়ের বুটিকের টপস আর নিজের জন্য শাড়ি ও থ্রি-পিস কিনেছি। তবে আত্মীয়দের জন্য উপহারসামগ্রী কিনতে যাব কৃষি মার্কেট অথবা নিউ মার্কেটে।’ 

আড়ং থেকে বেরিয়ে ধানমন্ডির সানরাইজ প্লাজায় গিয়ে দেখা যায় দেশি-বিদেশি শাড়ি, থ্রি-পিস, বাহারি ঈদের পোশাকের সমারোহ। তবে ক্রেতার উপস্থিতি খুব বেশি নয়। সাহারা ফ্যাশন নামের দোকানের বিক্রেতা আবদুল হালিম বলেন, ‘ভারতীয় ও পাকিস্তানি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের থ্রি-পিস, টু-পিস ও ওয়ান পিসের প্রকারভেদে দাম ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। থ্রি-পিসের মধ্যে এবার ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করছেন গঙ্গা, ইস্তা, সাহিবা, রাখি, ওম টেক্স, সীমার, বিপুল বর্সা ও দিল্লি বুটিকস।’ তবে এ মার্কেটের বেশির ভাগ দোকানি জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে এবার ক্রেতা আশানুরূপ আসছেন না। বিক্রিও গতবারের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। 

ক্রেতার উপস্থিতি কম দেখা যায় ধানমন্ডির রাপা প্লাজার বিভিন্ন শোরুমে। রায়েরবাজার এলাকা থেকে শপিংয়ে আসা আফরোজা বেগম জানান, কিছুদিন আগে কলকাতায় বেড়াতে গিয়ে বেশ কিছু থ্রি-পিস কিনে এনেছি। কিন্তু এ সময়ে টেইলাররা সেলাইয়ের দাম হাঁকছেন অনেক বেশি। ১ হাজার টাকার নিচে কোনো সালোয়ার-কামিজ বানানো যাচ্ছে না। একই মার্কেটের সপ্তবর্ন বুটিক হাউসের স্বত্বাধিকারী ফারজানা আক্তার বললেন, শোরুমের পাশাপাশি তিনি অনলাইনে ফেসবুক পেজেও তার বুটিক পোশাক সেল করেন। তবে গত ঈদের তুলনায় এবার বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ কম। কর্মচারীদের বেতন-বোনাস কীভাবে দেবেন, তা নিয়ে চিন্তিত আছেন। 

ঈদ না হলে এত দামে কিনতাম না

দুপুর সাড়ে ১২টায় কেনাকাটার জন্য মার্কেটে এসেছি, এখন বাজে আড়াইটা, কেনাকাটা যা করা দরকার তার অর্ধেকও হয়নি, এবার পোশাক, জুতা, ব্যাগ ও জুয়েলারি যা কিছুই কিনতে যাই, দাম এত বেশি যে তা সাধ্যে কুলাচ্ছে না, দামের কারণে কোনো কিছুতেই হাত দেওয়া যায় না, তাই বেশি প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া তেমন কিছুই কিনছি না, ঈদের জন্যই কেনা, নইলে এত দামে এখন কিনতাম না। অসন্তোষ প্রকাশ করে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ারে ঈদ পোশাক কিনতে আসা ইভা রহমান এভাবে জানাচ্ছিলেন তার ঈদ মার্কেটের অভিজ্ঞতার কথা। দাম বেশি হওয়ায় শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেই বাসায় ফিরবেন বলেও জানান এই ক্রেতা। 

সরেজমিনে বুধবার (৩ এপ্রিল) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ার, কৃষি মার্কেট ও সেইলর, লা-রিভ, সারা, ইনফিনিটি, অ্যাপেক্স, বাটাসহ বিভিন্ন বিপণিবিতান ও দোকান ঘুরে দেখা যায়, এসব শপিংমল ও দোকানে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। ২৩ রমজানের পর থেকে রাজধানীর মার্কেটগুলোতে ক্রেতাসমাগম বাড়লেও বিক্রি তেমন বাড়েনি। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে ঈদ পোশাকের বাজারেও। গত বছরের তুলনায় পোশাকের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চড়া দামে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা।

একই চিত্র দেখা গেছে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে। আগুনে মার্কেট পুড়ে যাওয়ার পর একটা অংশে বেচাবিক্রি চলছে। এই মার্কেটে শিশুসন্তানের জন্য পোশাক কিনতে আসা আবদুল খালেক বলেন, ‘মার্কেটে ভিড় তেমন নেই। এসব মার্কেটে আমরা আসি একটু কম দামে পোশাক কেনার জন্য। তবে এখানেও দেখছি দাম বেশি।’

কৃষি মার্কেটের পোশাক ব্যবসায়ী রমজান বলেন, ‘সব জিনিসের দাম বাড়তি। বেশি দামে কিনে তো আর লসে বিক্রি করতে পারব না। এবার যে অবস্থা দেখছি তাতে ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।’ 

ফার্মগেট এলাকায় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়

ঈদ উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার মার্কেটগুলোতে দেখা যায় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। দেশের নামিদামি ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে সব ধরনের বিপণিবিতান রয়েছে এই এলাকায়। তাই যেকোনো উৎসবে বা আয়োজনে কেনাকাটার জন্য মানুষের আকর্ষণ এই এলাকা। গতকাল সরেজমিনে ফার্মগেট এলাকার ইন্দিরা রোডে ফার্মভিউ মার্কেট, সেজান পয়েন্ট, চৌরঙ্গী সুপার মার্কেট ও ফুটপাতের বিভিন্ন দোকানে গিয়ে দেখা যায়, নানা বয়সী মানুষের পদচারণে মুখরিত দোকানগুলো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে কেনাবেচা। ক্রেতার ভিড় সামলে সবাইকে পছন্দমতো পণ্য দেখিয়ে ফুরসত মিলছে না দোকানের কর্মচারীদের। ক্রেতা আকর্ষণে দোকানগুলো সাজানো হয়েছে নানা রঙের বাতিতে। ভারতসহ নানা দেশ থেকে আনা নিত্যনতুন বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের পসরা সাজিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন দোকানিরা। বিভিন্ন দোকানে দেওয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় ছাড়। পোশাকের দোকানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে জুতা, গয়না ও প্রসাধনী কেনার ধুম।

চৌরঙ্গী সুপার মার্কেটের নাহার গার্মেন্টসের বিক্রেতা আল-আমিন খবরের কাগজকে জানান, গত কয়েক দিনে ঈদের বিক্রি বেশ ভালো। রোজার প্রথম দিকে ক্রেতাদের কম আনাগোনা দেখে যে হতাশা কাজ করছিল, এই কয়েক দিনের বিক্রিবাট্টায় অনেকটাই উৎফুল্ল লাগছে। গত কয়েক দিনে আশানুরূপ বিকিকিনি হচ্ছে দোকানে। 

ফার্মভিউ মার্কেটের শিশুদের পোশাক বিক্রেতা শফিকুল আলম বলেন, গত বছরের তুলনায় বিক্রি একটু কম হলেও যা হচ্ছে তা মন্দ নয়। গত কয়েক দিন সকাল থেকেই শিশুদের কাপড় কেনার জন্য তার দোকানে ক্রেতাদের আশানুরূপ উপস্থিতি ছিল। তিনি বলেন, শুক্রবারের পর মার্কেট আরও জমজমাট হবে। তখন আরও বেশি বিক্রি হবে মনে করেন তিনি।
 
ফুটপাতে কাপড় কিনতে আসা হাসনা বানু বলেন, ‘এবারে কাপড়ের দাম চড়া। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে সন্তান ও আত্মীয়দের জন্য কিছু কেনাকাটা তো করতেই হবে। তাই এখান থেকে কম দামে বেছে বেছে ভালো কাপড় নিয়ে নিচ্ছি।’

দাম দ্বিগুণের বেশি

ধনী-গরিবের মার্কেট হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার রাজধানী সুপার মার্কেট। এখানে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা যেমন আসেন, ঠিক তেমনি নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষ ঈদের কেনাকাটা করতে আসেন। শিশু ও নারীদের দোকানে কিছুটা ভিড় আছে। কসমেটিকস দোকানে নেই ভিড়। আবার কোনো কোনো দোকানের কর্মীরা অলস সময় পার করছেন। তবে শেষ কয়েক দিনে বেচাবিক্রি বাড়তে পারে। গত বছরের তুলনায় দাম দ্বিগুণের বেশি। তাই এবার বেচাবিক্রি প্রায় ৩০-৪০ শতাংশের মতো কম হতে পারে বলেও জানান ব্যবসায়ীরা।

ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার জামাকাপড়ের দাম অনেক বেশি। প্রতিটি পণ্যের দাম দ্বিগুণ বা তিন গুণ বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজান মাসের শুরুর আগেই প্রতিটি ড্রেসে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে পাইকারি দোকানদাররা। যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বিক্রির ওপর।

বিনেসা শাড়ি বিতানের দোকানদার মো. রাতুল বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে পোশাকের ওপর। এবার বিক্রি বেশি শিশু ও নারীদের পোশাক এবং জুতার। তিনি বলেন, রাজধানী সুপার মার্কেটে ধনী-গবির সব শ্রেণির মানুষ ঈদ মার্কেট করতে আসেন। কিন্তু এবার মানুষের ঢল নেই বললেই চলে। মানুষের আয় না বাড়লে ব্যয় করবে কীভাবে?

ফ্যাশন সিটির মো. শাকিল বলেন, ‘আগের বছরের তুলনায় এবার বিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ। জামার দাম শুনেই অনেক ক্রেতা চলে যাচ্ছেন। এবার নায়রা কাট, গাউন, গারারা-সারারা, ফোর প্রিস এগুলোর চাহিদা বেশি। আমরা সামান্য লাভেই পণ্য ছেড়ে দিচ্ছি। কারণ এবার দোকানের খরচ ওঠানোই কষ্টকর হবে।’

ব্যবসায়ীদের হতাশা

রাজধানীর ইসলামপুর, সদরঘাট, বঙ্গবাজার, রাজধানী সুপার মার্কেট, খদ্দর বাজার শপিংমল, আজিজ সুপার মার্কেট, নিউ মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের ভিড় রয়েছে মোটামুটি। বিক্রি এখন না থাকলেও আরও বাড়বে বলে আশা বিক্রেতাদের। 

বিক্রেতা ও ক্রেতাদের দাম নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করতে দেখা যায়। ক্রেতারা বলছেন দাম বেশি। বিক্রেতারা বলছেন, দাম আগের চেয়ে একটু বেশি হলেও গতবারের দামেই বিক্রি করায় লাভ হচ্ছে কম। 

মার্কেটগুলোতে নারীদের পোশাকের দোকানে মোটামুটি ভিড় দেখা যায়। কেউ থ্রি-পিস কিনছেন আবার কেউ কিনছেন থান কাপড়। সবচেয়ে বেশি চাহিদা বিদেশি তৈরি পোশাকের। পুরুষদের মার্কেটে দেখা যায় তরুণদের ভিড়। প্যান্ট-শার্টের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে পাঞ্জাবি। 

নিউ মার্কেটের প্যান্ট-শার্টের দোকান স্টাইল জোনের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান বলেন, ‘বিক্রি অল্প অল্প বাড়ছে। যতটা আশা করেছিলাম, ততটা এখনো হচ্ছে না। আশা করছি আগামী শুক্রবারের পর বেশি বাড়বে।’

ইসলামপুর মার্কেটের জাহান ফেব্রিকসের বিক্রেতা আনোয়ার বলেন, ‘পাইকারিতে বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে, তবে খুচরা বিক্রি কম। অনেকেই হয়তো এখনো স্যালারি পাননি, মাত্র ৩ তারিখ। আশা করছি ২৫ রোজার পর বাড়বে।’ 

রাজধানী মার্কেটের পাঞ্জাবি বিক্রেতা কলকাতা পাঞ্জাবির স্বত্বাধিকারী সুমন শেখ বলেন, ‘পাঞ্জাবির বেচাকেনা ভালোই আছে, তবে বেশি দামি পাঞ্জাবি অনেকেই কিনতে চান না। অনেকেই দাম নিয়ে বেশি ঝামেলা করেন।’ 

লাভ বেশি হচ্ছে না বলে জানান আজিজ সুপার মার্কেটের ঐতিহ্যের মালিক অনুপ কুমার। তিনি বলেন, ‘বিক্রি আছে মোটামুটি, গতবারের চেয়ে এবারের দাম ও খরচ বেশি। আমাদের যা সেল হচ্ছে সব নতুন।’ 

অন্যদিকে ক্রেতাদের দাবি ভিন্ন। দাম বাড়ায় আগের বারের জিনিসের মতো একই ধরনের জিনিস কিনতে হচ্ছে বেশি দাম দিয়ে। অনেকই ক্রেতাই দাম বেশি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 

ক্রেতা টানতে লাখ টাকার পুরস্কার

বিক্রি কমে যাওয়ায় ক্রেতা টানতে র‌্যাফল ড্রয়ের মাধ্যমে লাখ টাকার বেশি পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে উত্তরার নর্থ টাওয়ারের দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতি। যেকোনো দোকান থেকে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকার কেনাকাটা করলে মিলবে একটি কুপন। কেনাকাটার পরিমাণভেদে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ পাঁচ-ছয়টি কুপন পাবেন। যার র‌্যাফল ড্র অনুষ্ঠিত হবে ৩০ এপ্রিল। এতে ১০১টি পুরস্কার দেওয়া হবে। প্রথম পুরস্কার মোটর বাইক, দ্বিতীয় পুরস্কার সোনার হার, তৃতীয় পুরস্কার এয়ার কন্ডিশন, চতুর্থ পুরস্কার ফ্রিজ। এ ছাড়া টিভি, ওয়াশিং মেশিন, এয়ার টিকিটসহ বিভিন্ন পুরস্কার রয়েছে। যারা কেনাকাটা করছেন তাদের মধ্যে এই র‌্যাফল ড্র নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেল। নিচতলায় রাখা স্বচ্ছ কাচের বক্সে ঠিকানা লিখে কুপন জমা দিচ্ছেন।

উত্তরার নর্থ টাওয়ারের আইকন শোরুমে গত ঈদের আগের কয়েক দিন গড়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা, যা এ বছর অর্ধেকেরও কমে নেমে এসেছে। বিক্রয়কর্মী সোহেল জানালেন, ‘গাজীপুরসহ আশপাশের লোকজন কম আসায় বিক্রি কমে গেছে। একই সঙ্গে মানুষের হাতে টাকা-পয়সা তেমন নেই।’ একই ফ্লোরের দোকান বেবিডলের বিক্রয়কর্মী লুবানের কাছে ঈদ কেনাকাটা নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘না ভাই বেচাকেনা খুবই কম। সুবিধার না। ঈদ প্রায় এসে গেল, মার্কেট ফাঁকা। তুলনা করলে অনেক খারাপ অবস্থা। আগে অনেক ভালো ছিল। এখন স্থানীয় কাস্টমার কম। আগে টঙ্গী, ময়মনসিংহ থেকে প্রচুর ক্রেতা আসত।’ 

তবে গতবারের তুলনায় দাম তুলনামূলক বেশি রাখা হচ্ছে বলে জানালেন ক্রেতারা। ফলে বাজেট অনুযায়ী কেনাকাটা করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। টঙ্গীর সফিউদ্দীন কলেজের বাণিজ্য বিভাগের প্রথম বর্ষের মাজহারুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত বছর যেসব পাঞ্জাবি আমরা ১ হাজার থেকে দেড় হাজারের মধ্যে নিতে পেরেছি, সেগুলো এখন প্রায় ডাবল। সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু আমাদের তো ঈদে নতুন জামার দরকার হয়। সে জন্য মধ্যম মানের একটা পাঞ্জাবি কিনেছি। একই অবস্থা হয়েছে ক্বরিউল কোরআন ইসলামিয়া মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্র ইয়াসিন রহমান তামিমেরও। 

পরিবার নিয়ে মার্কেটে

রাজধানীর নিউ মার্কেট, চাঁদনী চক মার্কেট ও এর আশপাশের ফুটপাতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। এখানে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন। বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে নারীদের শাড়ি, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন পোশাক, জুতা ও প্রসাধনসামগ্রীর দোকানগুলোতে। মার্কেটের পাশাপাশি ফুটপাতের দোকানগুলোতেও ছিল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। আহসান নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে কেনাকাটা করতে এলে মার্কেটে প্রচুর ভিড় থাকে। লোকজনের ভিড়ে পা ফেলা যায় না। সে জন্য আগেভাগেই ঈদের কেনাকাটা করতে নিউ মার্কেটে এসেছি। তবে এখানে এসে দেখছি আরও অনেকেই কেনাকাটা করতে এসেছেন। মানুষের প্রচুর ভিড়। এখনো কিছু কিনিনি, ঘুরে ঘুরে দেখছি কী কেনা যায়।’

নিউ মার্কেটের একজন বিক্রেতা জানান, গরম বাড়ছে, তাই গরমে পরার উপযোগী পোশাকগুলোই তারা তাদের দোকানে সাজিয়েছেন। ক্রেতারাও গরমে আরামদায়ক হবে এমন পোশাক কিনছেন। 

তবে ক্রেতারা বলছেন, অন্য যেকোনো বারের তুলনায় এবার ঈদের পোশাকের দাম অনেক বেশি। চাহিদার বিপরীতে অল্প কেনাকাটা করেই বাড়ি ফিরছেন অনেকে।

নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ফুটপাতে

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের ফুটপাতের কেনাকাটার চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো। 

ক্রেতারা বলেন, তুলনামূলক অল্প দামে পছন্দের পোশাক, গয়না, জুতা, প্রসাধনীসহ পছন্দের পণ্য কিনতে ফুটপাতের দোকানগুলোতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা ভিড় করছেন।

রাজধানীর মালিবাগে দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখরিত হয়ে উঠেছে ফুটপাতের দোকানগুলো। ক্রেতাদের দাবি, মূলত, মার্কেটের তুলনায় কম দামে বাহারি ও প্রয়োজনীয় পণ্য মেলে ফুটপাতের এসব দোকানে। এ জন্য বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এসব জায়গায় ভিড় করছেন।

নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের একাধিক ক্রেতা খবরের কাগজকে জানান, ঢাকায় যেসব মার্কেট রয়েছে সেখানে গেলে তারা অনেক দাম চায়। সেই দামে সবার জন্য কেনাকাটা সম্ভব হয় না। এ জন্য ফুটপাতে থেকে পরিবারের জন্য কেনাকাটা সেরে ফেলছেন।

কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজারের সামনে কথা হয় ফুটপাতের জিনিসের ক্রেতা জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বড় মার্কেটগুলোতে কাপড়ের ব্যাপক দাম। আয়-রোজগারের মধ্যে কেনাকাটা করতে হলে আমাদের মতো নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের ফুটপাত হলো এখন এক মাত্র ভরসা।’

রাজধানীর গুলিস্তানের মাজার এলাকার ফুটপাত থেকে পরিবারের সবার জন্য ঈদের কেনাকাটা করেছেন দিনমজুরি আলী আজগর। তিনি বলেন, ‘আমার আর রোজগার কত, এর পরও পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা শেষ করছি। রবিবার বাড়িতে যাব।’ 

ফুটপাতের একাধিক ব্যবসায়ীও বলেছেন, এবার রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটের চেয়ে ফুটপাতে ক্রেতাদের একটু বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে। ভালোই কেনাবেচা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন এসব ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা।

জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১২ এএম
জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি
ছবি: সংগৃীহত

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ছে ব্রহ্মপুত্র নদ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ মেয়াদে এই নদে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। এর ফলে ভবিষ্যতে অববাহিকা এলাকায় খরার তীব্রতা যেমন বাড়বে, তেমনি হুমকির মুখে পড়বে নদীর পরিবেশগত প্রবাহ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডব্লিউএফএম) একদল গবেষক এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন। জার্নাল অব ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জে চলতি বছর তাদের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন জারিন তাসনিম ও এ কে এম সাইফুল ইসলাম। গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেন ইন্দ্রনীল সরকার, মো. সাইদুজ্জামান, খন্দকার এম অনিক রহমান, মোহাম্মদ আসাদ হোসেন এবং মো. সাদমান সাকিব। গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের অর্থায়নে ‘ইনহ্যান্সিং কোস্টাল রেজিলিয়েন্স থ্রু নেচার-বেজড সলিউশনস’ প্রকল্পের আওতায় এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। 

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দূরপাল্লার পূর্বাভাস
গবেষণায় সিএমআইপি-৬ ক্লাইমেট প্রজেকশন (গ্লোবাল ক্লাইমেট মডেল) এবং সয়েল অ্যান্ড ওয়াটার অ্যাসেসমেন্ট টুল–‘স্যাট’ নামক হাইড্রোলজিক্যাল মডেল ব্যবহার করে ব্রহ্মপুত্র নদের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, ২০৪০ থেকে ২০৬৯ সময়কালে নদে পানির প্রবাহ সামান্য বাড়তে পারে। তবে ২০৭০ সাল থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি সময়ে পানির প্রবাহ প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

স্টান্ডার্ডাইজড ডিসচার্জ ইনডেক্স বিশ্লেষণ বলছে, ভবিষ্যতে এই অববাহিকায় শুষ্ক ও আর্দ্র চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ বাড়বে। বিশেষ করে দূর ভবিষ্যতে খরার তীব্রতা ও পৌনঃপুনিকতা অনেক বেশি হবে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।

নদীর স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় জরুরি ‘ইকোলজিক্যাল ফ্লো’ নিয়েও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি মডেল এসএসপি৩-৭.০ অনুযায়ী, নিকট ভবিষ্যতেই নদীর প্রবাহ প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানির প্রবাহের এই নিম্নমুখী প্রবণতা জলজ প্রাণীর প্রজনন ও সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকরা জানান, ব্রহ্মপুত্র একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তসীমান্ত নদ, যা বাংলাদেশসহ চারটি দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। ভবিষ্যতের চরম অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় গবেষকদের পরামর্শ হলো অবিলম্বে সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি আন্তসীমান্ত সহযোগিতা বৃদ্ধি ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কংক্রিটের জঙ্গলে জলবায়ু ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনের মরণফাঁদে থাকা বাংলাদেশের শহরগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় কেবল কংক্রিটের স্থাপনা আর যথেষ্ট নয়। এর বদলে শহর গড়ার পরিকল্পনা ও অবকাঠামো নির্মাণে ‘প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান’ গ্রহণের বিকল্প নেই বলে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এবং গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) এক নতুন প্রতিবেদনে।

২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ‘কম্পেনডিয়াম অন নেচার-বেজড সলিউশনস ফর আরবান রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রথাগত উন্নয়নের চেয়ে প্রকৃতিকে সঙ্গী করে নেওয়া অবকাঠামোই ভবিষ্যতে শহরগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিকে যেমন তীব্র তাপপ্রবাহ বাড়ছে, অন্যদিকে পানিসংকটের মতো সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথাগত ‘ধূসর’ বা কৃত্রিম অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানকে একটি সাশ্রয়ী ও টেকসই বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে খরা
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ খরা এখন কেবল স্থানীয় সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণা কর্মসূচি-ক্লেয়ার প্রোগ্রামের অধীনে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণা ও অভিযোজনমূলক কার্যক্রম নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আজ ১৭ জুন ‘বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এশিয়া ও আফ্রিকার খরাপ্রবণ অঞ্চলের পরিবর্তনের এই চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক দশকে বিশ্ব এমন সব খরার মুখোমুখি হয়েছে, যা গত কয়েক দশকের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ভারত, নেপাল, উগান্ডা, তাঞ্জানিয়া ও কেনিয়াসহ আফ্রিকার ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলের দেশগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে প্রকট। এই খরা কেবল ফসলের ক্ষতিই করছে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানির সংকট, জনবসতির স্থানচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক সংঘাত খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলছে।

এই প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, খরা মোকাবিলায় কেবল প্রযুক্তি বা অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পানির ন্যায্য বণ্টন। খরাপ্রবণ দেশগুলোকে জলবায়ু বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ সংকুলান রাখার পরামর্শও দিয়েছে ক্লেয়ার

শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি
ছবি: সংগৃহীত

খেলার মাঠের হইহুল্লোড় কিংবা বইয়ের পাতার ঘ্রাণ–শৈশবের এই চিরচেনা অনুষঙ্গগুলো এখন অনেকটাই ইতিহাস। বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের শৈশব এখন বন্দি হয়ে পড়েছে স্মার্টফোনের নীল আলোর স্ক্রিনে। ফেসবুক, টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের ভার্চুয়াল জৌলুশে বুঁদ হয়ে থাকা এই প্রজন্ম কেবল শারীরিক সক্ষমতাই হারাচ্ছে না, বরং জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাং কালচারসহ নানা ভয়াবহ অপরাধ ও মানসিক অস্থিরতায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই লাগামহীন ব্যবহার কোমলমতি শিশুদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে ডেকে আনছে এক মারাত্মক বিপর্যয়। 

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে এখন নজিরবিহীন কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। ফ্রান্স, স্পেন, ব্রিটেন ও চীনের মতো দেশগুলোও নিয়েছে একই পথ। বিশ্বের প্রায় ৭৯টি দেশে স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। 

স্ক্রিনে বন্দি শৈশব ও মানসিক অবক্ষয়
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম শিশুদের মধ্যে ‘ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তৃপ্তিবোধের এমন এক আসক্তি তৈরি করছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাস্তব জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হওয়া এই শিশুরা ক্রমেই সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, স্থূলতা এবং দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এখন ঘরে ঘরে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল হয়রানির শিকার। অথচ প্রযুক্তির এই অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা রূপ নিচ্ছে সামাজিক ব্যাধিতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বলে জানান সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাদের সাইকোলজিক্যাল ও সাইকো-সোশ্যাল সমস্যা হচ্ছে। আমরা লক্ষ্য করছি যে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ফলে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে।’

নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে শিশুদের বিপথগামী হওয়ার বিভিন্ন উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে অল্প বয়সে বিয়ের মতো ঘটনা বাড়ছে, যা পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতা তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচয় হওয়ার সূত্র ধরেই এমন পরিণতির দিকে এগোচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা।

কিশোর গ্যাং: স্মার্টফোনের অন্ধকার অধ্যায়
প্রযুক্তির আশীর্বাদের আড়ালে ডালপালা মেলছে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি। অপরাধের নীল নকশা তৈরি, সদস্য সংগ্রহ, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া–সবকিছুর মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। র‌্যাবের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে প্রায় ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও টিকটক ব্যবহার করেই তারা অপরাধের যাবতীয় সমন্বয় করত। টিকটক বা ফেসবুকে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা অনেক মেধাবী কিশোরকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অপরাধের পথে।

বিশ্বজুড়ে কড়াকড়ি, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মুর্তুজা জুলকার নাঈন নোমান।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সাইবার নিরাপত্তা আইন, বিপিডিএ বা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আলোকে আমরা সাইবার বুলিং মোকাবিলায় গুরুত্ব দিচ্ছি। যদি সরকার ভবিষ্যতে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজনীয়তা মনে করে, তবে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা নতুন নীতিমালা তৈরির সুযোগ রয়েছে। আইসিটি বিভাগ এবং ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি (এনসিএ) তখন সে অনুযায়ী কাজ করবে।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশিদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের এখানে (আইসিটি বিভাগ) এখনো এ বিষয়ে কোনো কিছুই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। হয়তো এই বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা হবে।’

ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিং ও আইনি সুরক্ষা
অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে ব্ল্যাকমেইলিং ও যৌন হয়রানির ঘটনা এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি সরকার ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি ও রিভেঞ্জ পর্নো ছড়ানোর মতো অপরাধের শাস্তি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান করেছে।

তবে আইনি প্রতিকারের চেয়েও বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম মনে করেন, ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় রেস্ট্রিকশন আরোপ করা এখন সময়ের দাবি।

একক নয়, সমন্বিত উদ্যোগের পরামর্শ
ইউনিসেফ এবং সরকারের যৌথ উদ্যোগে ইতোমধ্যে অনলাইন সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্সের আওতায় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার শিশুকে সনদ প্রদান করা হয়েছে। তবে পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ইউনিটে গত ৬ বছরে ৬০ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ার ঘটনা প্রমাণ করে, সাইবার সহিংসতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে। শিশুদের অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক কাঠামো ও পারিবারিক বন্ধনের যথাযথ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

সম্প্রতি শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনার সময় এমন মতামত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিশুদের অপরাধ প্রবণতার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কোনো একটি কারণকে কেন্দ্র করে এর সমাধান সম্ভব নয়। এটি অনেক উপাদানের একটি অংশ মাত্র।’

অধ্যাপক মাহবুবা সুলতানা মনে করেন, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা অন্য দেশ থেকে ভিন্ন। এ দেশের সমাজব্যবস্থায় এখনো অনেক ক্ষেত্রেই যৌথ পরিবারব্যবস্থা বিদ্যমান এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বেশ সক্রিয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো পিয়ার গ্রুপ এবং আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এই সামাজিক কাঠামো ও সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে যেকোনো প্রযুক্তি বা মাধ্যমকে পজিটিভলি কাজে লাগানো সম্ভব। এসব কারণেই অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট অনেকটাই মিনিমাইজ করা সম্ভব হয়।’

তবে এ বিষয়ে আরও নিবিড় গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অন্য দেশের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট হুবহু মিলবে না। এ জন্য বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে সময় সাপেক্ষে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কনটেক্সট ভিন্ন হওয়ায় শিশুদের এই সংকট মোকাবিলায় কোনো একমুখী চিন্তার সুযোগ নেই বলেও মত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট 
শিশু ও কিশোরদের ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত ফেসবুক, টিকটকসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং এসব প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার রোধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করতে যাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নূরী। আগামী রবিবার লিগ্যাল ভয়েস ফাউন্ডেশনের পক্ষে তিনি এই রিট আবেদন করবেন। এতে বিবাদী করা হয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি)। 

কর্মসংস্থানের রূপরেখা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:০৭ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:১৬ এএম
কর্মসংস্থানের রূপরেখা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: খবরের কাগজ

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া শিল্প-বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বেশ কিছু খাতে রাজস্ব ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দেশে ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এমন হিসাবের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

তবে অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রণোদনা ও রাজস্ব ছাড় দিলেই কর্মসংস্থান বাড়বে, এমন না। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির টানাপোড়েনের নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ না থামলে দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। এ ছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দীর্ঘসূত্রতাও বিনিয়োগ না বাড়ার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে জ্বালানির দাম বেড়েছে। বাজেটে এসব সংকট দূর করতে দিকনির্দেশনা নেই। আর তাই বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপে কর্মসংস্থান বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই।      

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেওয়া পদক্ষেপের সঠিক বাস্তবায়ন হতে হবে। কর্মসংস্থান তিনভাবে বাড়তে পারে: সরকারি, বেসরকারি এবং বিদেশে। 

তিনি বলেন, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিতে চেয়েছে। এটা সরকারি খাতে কর্মসংস্থান। এভাবে কিছু কর্মসংস্থান সরকারের হাতে আছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। ভূরাজনীতির ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির টানাপোড়েন কত দিন চলবে, তা আমরা জানি না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। শুধু প্রণোদনা, রাজস্ব ছাড় ও নীতি সহায়তায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে না। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য দুর্নীতি, জ্বালানি সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ আরও অনেক কিছুর সমাধান দরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে এসব সংকটের সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে আর তা কতটা বাস্তবায়ন হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।     

প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ-তরুণীকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কর্মে যুক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে অর্থ বিভাগের এসআইসিআইপি কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে উচ্চ দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

মন্ত্রী আরও বলেন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ৩ লাখ ৭০ হাজার গ্রামীণ শ্রমিককে কাজের সুযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে ৪৫ হাজার নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। 

বাজেটে তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফ্রিল্যান্সিং এবং অনলাইন মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশগামী ও প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে নতুন করে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ ব্যবস্থা চালুর কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ, স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় কর কাঠামো যৌক্তিকীকরণ, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং স্টার্ট-আপ ও সিএসএমই প্রণোদনার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা যদি সত্যিকার অর্থে মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে শিল্পায়ন গতিশীল হবে, যা দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্যচাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির ফলে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪.৭২ শতাংশে নেমেছে, যা বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। 

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সহসভাপতি এবং ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে। নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। এ ছাড়া ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের উচ্চমূল্য আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব মিলিয়ে আগামীতে শিল্প-বিনিয়োগ বাড়বে আর সেখানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে—তার সম্ভাবনা কম। 

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশীয় কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই শিল্প এবং রুগ্ণ ও বন্ধ কলকারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। এ প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল। বাজেটে এই তহবিলের আওতায় বন্ধ কলকারখানা চালুকরণ ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে তিন হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।  

প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতাকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধিতে আমাদের সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এটি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।’

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, দেশে কর্মসংস্থান হোক আমরাও চাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে? সরকার এবারের বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিয়েছে–এটা আশার কথা। এর জন্য কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছেন–যা ভালো উদ্যোগ বলে মনে করছি। কিন্তু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে তো! কারণ দেশের অর্থনীতির সংকট কাটিয়ে শিল্প-বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিরসন না হলে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো কঠিন হবে। 

গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জের অংশ মিশছে ঢাকায়

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:৫৫ এএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:০০ এএম
গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জের অংশ মিশছে ঢাকায়
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর উপকণ্ঠে সবচেয়ে বড় ও পরিকল্পিত ‘পূর্বাচল’ নতুন শহরকে একক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য পূর্বাচলের গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের অংশবিশেষ ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। 

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রস্তুত সারসংক্ষেপ ইতোমধ্যে প্রাক-নিকার সচিব কমিটিতে অনুমোদন পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) সভায় অনুমোদন পেলেই প্রশাসনিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। তবে নিকার সভার তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার দুটি এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ১৪টি মৌজা (মোট ১৬টি মৌজা) ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে পূর্বাচল প্রকল্পের পুরো এলাকা কার্যত ঢাকা জেলার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বর্তমানে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ–এই তিন জেলার মধ্যে বিভক্ত। ফলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবা প্রদানে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় গত ২ মার্চ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পূর্বাচলকে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং ঢাকা ওয়াসার আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভা এবং ২৩ এপ্রিলের মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিষয়টি নীতিগত অনুমোদন পায়। পরে মে মাসে প্রাক-নিকার সচিব কমিটিও সারসংক্ষেপটি অনুমোদন করে।

তবে প্রস্তাবের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্বাচল প্রকল্পের আওতাধীন ২১টি মৌজাকে প্রাথমিকভাবে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব বিবেচনায় ছিল। পরে চূড়ান্ত প্রস্তাবে তা কমিয়ে ১৬টি মৌজায় আনা হয়েছে। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার পাড়াবার্থা ও বড়কাউ মৌজার আংশিক অংশ এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মাইঝগাঁও, হারারবাড়ী, ভোলানাথপুর, সুলপিনা ও পিতলগঞ্জ সম্পূর্ণভাবে এবং ইউসুফগঞ্জ, পশি, টেকনোয়াদ্দা, গুতিয়াব, বাঘবের, ব্রাহ্মণখালী, কামতা, হিরনাল ও রঘুরামপুরের আংশিক অংশ ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক তালিকায় থাকা কয়েকটি মৌজা বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মৌজার পরিবর্তে আংশিক এলাকা অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত ১০ এপ্রিল জারি হওয়া ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬’-এ রাজউকের কার্যপরিধি নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনের ১(২) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাজউকের আওতা ঢাকা মহানগরী ছাড়াও ঢাকা জেলার সাভার ও কেরানীগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার নির্ধারিত এলাকাজুড়ে বিস্তৃত থাকবে। নতুন আইনে রাজউকের ভৌগোলিক কার্যপরিধি বহাল থাকলেও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য পূর্বাচল প্রকল্পের অংশবিশেষকে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার পৃথক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্বাচল বর্তমানে ৬ হাজার ২৬১ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা দেশের বৃহত্তম পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প। এতে ৩০টি সেক্টরে ২৬ হাজার ২১৩টি আবাসিক প্লট, ৩ হাজার ৫৬৩টি বাণিজ্যিক, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্লট রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ৩১৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫২টি সেতুর মধ্যে ৪৯টির কাজ শেষ হয়েছে এবং ৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ লেক ও খাল খননের মাধ্যমে নৌ-নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের স্বীকৃতি হিসেবে প্রকল্পটি ২০১৯ সালে ‘এশিয়ান টাউনস্কেপ জুরি অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে।
তবে প্রশাসনিক বিভাজনের কারণে এখনো নাগরিক সেবা, ভূমি রেকর্ড, পুলিশি সেবা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় নানা জটিলতা রয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় সভায় রাজউকের চেয়ারম্যান বলেন, একক প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা গেলে পূর্বাচলকে একটি স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও আধুনিক নগরীতে রূপান্তর করা সহজ হবে।

অন্যদিকে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার সভায় জেলার সীমানা পরিবর্তনের পরিবর্তে শুধু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ডিএমপির গেজেট সংশোধনের বিকল্প প্রস্তাব দিলেও শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সম্মতি দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এখন প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় নিকার সভায় অনুমোদন পেলেই পূর্বাচলের প্রশাসনিক পরিচয়ে বড় পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ডিএমপি ও ঢাকা ওয়াসার আওতায় আনার প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে যাবে। ফলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা দূর হওয়ার পাশাপাশি পূর্বাচলকে রাজধানীর সম্প্রসারিত আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তোলার সরকারি পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে।

জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন বহুদূর!

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:৫৩ এএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম
জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন বহুদূর!
ছবি: খবরের কাগজ

দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও আছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল গত মে মাসে। রপ্তানি আয়ে নিম্নমুখী ধারা। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা কমছে না। বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির টানাপোড়েনের প্রভাব বাড়ছে দেশে। আর্থিক খাতে দুর্বলতা বিদ্যমান। ব্যবসা ও শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে গতি না এলে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। বৈশ্বিক সংকটে ও উত্তরাধিকার সূত্রে নির্বাচিত সরকার শিল্প-বিনিয়োগ-ব্যবসা-বাণিজ্যে কতটা গতি আনতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। অবশ্য বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশের কম। এমনকি বৈশ্বিক অচলাবস্থা এবং ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার চলমান সংঘাতের ফলে আগামী বছরও বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরগতিতে চলমান থাকবে বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতিতে সংকট চলছে। এমন প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আগামীতে শিল্প-বিনিয়োগ-কর আদায় বাড়াতে পারলে এই প্রাক্কলন অর্জন সম্ভব। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব বাড়বে, এমন আশা করা সাহসের হবে। কতটা বাস্তবায়নযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি বর্ণনা করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা–সিপিডি, ঢাকা চেম্বারসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিশ্বব্যাংক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসার উচ্চ খরচকে বিনিয়োগ মন্থরতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি হ্রাস পেয়েছে। শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না; উচ্চ সুদের হার ও ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে; জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

স্থবির রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ ও দুর্বল কর রাজস্ব সম্পর্কে প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বলা যায়, আইএমএফ জানিয়েছে, কর রাজস্ব থেকে জিডিপি অনুপাত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তীব্রভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় অনেক কমভারতে যা প্রায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির চাপ সম্পর্কে প্রতিবেদন থেকে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ডাবল ডিজিট থেকে কমলেও এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগের গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রতিবেদন থেকে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশসহ এশীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে, জ্বালানিসংকট বাড়িয়েছে এবং অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি করেছে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংক ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা, দুর্বল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে।

শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হতে পারে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের উচ্চমূল্য আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, প্রাক্কলন সব সময় প্রাক্কলন। আয়-ব‍্যয়ের যে বরাদ্দ ধরা হয়েছে তা যদি ৭০-৮০ শতাংশ অর্জিত হয়, তাহলে জিডিপির প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব হবে না। তবে তা কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

তিনি আরও বলেন, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু বাজেট ঘোষণা যথেষ্ট নয়; বরং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ; ঋণের সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা; কর কাঠামো সহজীকরণ; ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস; নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা; বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণবিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সেখান থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অবশ্যই উচ্চাভিলাষী। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসায়িক আস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি প্রয়োজন। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সরকারের ব্যাংকঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির ফলে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন না হলে উচ্চাভিলাষী এ টার্গেট বাস্তবায়ন হবে অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সহসভাপতি এবং ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিনিয়োগের ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে এ লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। কার্যকর অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং শিল্প খাতের প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। ৬ দশমিকশতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব, তবে এর জন্য বাজেটের ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পবান্ধব নীতি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।