রোকন হাসানের বয়স চল্লিশের কোঠায়। চেহারা উদ্ভ্রান্ত, তবে চোখ দুটো কেমন শীতল। গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি পরা, সঙ্গে ঢোলা পায়জামা। নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজে খুব মনোযোগ সহকারে বাদামের খোসা ছাড়াচ্ছেন। রোকনের হাতে ও পায়ে ভারী লোহার শিকল পরানো। প্রতিবার বাদামের খোসা দূরে ফেলার সময় ঝনঝন করে উঠছে ভারী শিকল। ধবধবে সাদা চামড়ায় অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন।
রবিবার (১৪ জুলাই) সকালে সরেজমিন ঢাকার শেরে বাংলানগরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে দেখা যায় এ চিত্র।
রোকন হাসানের স্ত্রী জিনিয়া আক্তার জানান, নিজেই নিজেকে আঘাত করে এসব ক্ষত চিহ্ন তৈরি করেছেন রোকন। তবে আপাতদৃষ্টিতে শান্তশিষ্ট স্বভাবের লোকটিকে দেখে একথা যেন বিশ্বাস হতে চায় না। জানা যায়, প্রথমদিকে নিজে নিজেই কথা বলতেন রোকন। কিছুদিন পর বেশ অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন। কিছুদিন হাত-পা ছুড়ে চিৎকার, জিনিসপত্র ভাঙায় সীমাবদ্ধ থাকলেও শেষে নিজেই নিজেকে আঘাত করা শুরু করেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেন, একজন অদৃশ্য লোক এসব নির্দেশ দেন তাকে। যাকে শুধু তিনিই দেখতে পান। পরিবারের সদস্যরা জিনের আছর ভেবে তাকে কবিরাজের কাছে নিয়ে যান। বিভিন্ন পানি পড়া আর তাবিজ ব্যবহার করলেও অবস্থার অবনতি হতে থাকে। শেষমেশ কবিরাজের পরামর্শেই মানসিক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় রোকনকে। হাসপাতালে আনলে জানা যায় সিজোফ্রেনিয়া রোগে ভুগছেন রোকন।
রোকনের মতো আরও অনেক নারী-পুরুষ এবং শিশুর দেখা মেলে হাসপাতাল চত্বরে। কেউ ভুগছেন সিজোফ্রেনিয়ায়, কেউ ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডারে, কেউ বাইপোলার ডিজঅর্ডারে, কেউ আবার অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডারে। এরকম বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রতিদিন শত শত রোগী আসছেন হাসপাতালে সেবা নিতে। মাত্র ১০ টাকার টিকিট কেটেই বহির্বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে পারেন রোগীরা। তবে অনেকেই এই হপাতালের ব্যাপারে জানেন না। আবার মানসিক সমস্যা সম্পর্কে স্পর্শকাতরতা আর সচেতনতার অভাবেও অনেকে চিকিৎসা নিতে আসেন না বলে জানান হাসপাতালের অফিস সহকারী মো. আকাশ।
দুপুরেও আট তলাবিশিষ্ট এই হাসপাতালের নিচের তলায় রোগীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বহির্বিভাগে সিরিয়াল দিয়ে রোগীরা ডাক্তার দেখাচ্ছেন। এই রোগীদের বেশির ভাগই প্রথমবার সেবা নিতে এসেছেন। তাই অনেকেই কীভাবে কী করবেন বুঝতে পারছেন না। তথ্য পাওয়ার আশায় উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক সেদিক তাকিয়ে খুঁজেছেন হাসপাতালের নার্সদের।
ষষ্ঠ তলায় দেখা যায় ভর্তি ওয়ার্ডের বাইরে স্টিলের কলাপসিবল গেটে বড় একটা তালা ঝুলানো। ভেতর থেকে সেই গেট ধরেই মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি ঝুল খেলছেন একটু পর পর। গেটের পেছনে রোগীরা হাঁটছেন, কেউ বসে আছেন। আর শয্যা না পেয়ে কেউ কেউ মেঝেতে পাটি বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক রয়েছেন ডিউটি নার্স।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. অভ্র দাস ভৌমিক খবরের কাগজকে জানান, আগে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম কাজ করত। তবে এখন সচেতন মানুষের হার অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালটিতে ভর্তি রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ৪০০টি বেডের অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু জনবলের অভাবে ২১৮ জনের বেশি রোগী ভর্তি রাখা যায় না। যদিও জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে আরও কিছু রোগী ভর্তি নেওয়া হয়। রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য বর্তমানে এখানে ১৩১ জন নার্স রয়েছেন। সরকারি চিকিৎসক ৫৬ জনসহ মোট চিকিৎসক রয়েছেন ১০৮ জন। আগামী মাসের মধ্যেই আশাকরি ৩০০ জন রোগী রাখার সক্ষমতা তৈরি হবে।
তিনি আরও জানান রোগীদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাসপাতালে মোট ১২টি বিভাগ রয়েছে। সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন বিষয়ে কাউন্সেলিং এবং সেমিনারের ব্যবস্থাও রয়েছে। কেউ চাইলেই মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার ও কাউন্সেলিংয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সুমি আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখানের চিকিৎসা খুবই ভালো। ডাক্তার আর নার্সদের ব্যবহারও খুব ভালো। কিন্তু ফার্মেসিতে সব ওষুধ পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে টাকা দিয়ে কিনতে হয়। আবার হাসপাতালের বহির্বিভাগ পরিচ্ছন্ন থাকলেও একজন ভর্তি রোগীর অভিভাবক অভিযোগ করেন, ভর্তি ওয়ার্ডে ওয়াশরুম অপরিচ্ছন্ন থাকে। তা ছাড়া নার্স এবং ডাক্তারও রোগী এবং স্বজনদের সঙ্গে অনেক সময় রুক্ষ ব্যবহার করেন।
এ বিষয়ে ডা. অভ্র দাস ভৌমিক বলেন, ‘হাসপাতালে সবসময় ওষুধ পাওয়া যায় না, এটি ঠিক নয়। এটা ওষুধের বাজেট পাওয়ার ওপর নির্ভর করে। বাজেট বেশি থাকলে বেশি ওষুধ কিনে রাখা হয়। তখন কোনো সংকট থাকে না। তবে বাজেট কম থাকলে কিছু ওষুধ অনেক সময় নতুন বাজেট পাওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। তখন সাময়িক সময়ের জন্য হাসপাতাল থেকে ওষুধ দিতে পারে না। আর ভর্তি ওয়ার্ড নির্দিষ্ট সময় পরপরই পরিষ্কার করা হয়। তবে এটা যেহেতু মানসিক রোগীদের হাসপাতাল, রোগীরা বাথরুম সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন না। এ ছাড়াও রোগীদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আর আমাদের যেহেতু জনবল সংকট রয়েছে, চাইলেও প্রতিবার বাথরুম ব্যবহারের পরপরই পরিষ্কার রাখা সম্ভব হয় না।’