দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণার ২২ দিন পরও স্বাভাবিক হয়নি সংসদ সচিবালয়ের দাপ্তরিক কাজকর্ম। গত বুধবার সংসদের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবনটির এমন কোনো কক্ষ নেই যেখানে বিক্ষুব্ধ জনতার তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে তাদের বেশির ভাগই নিয়মিত অফিস করলেও সংসদ বিলুপ্ত-পরবর্তী রুটিন কার্যক্রম তারা চালিয়ে নিতে পারছেন না। কারণ অনেক কক্ষে নেই কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ভাঙচুরের পরদিন ৬ আগস্ট থেকেই আমি অফিসে যাচ্ছি। তবে ওই দিন এবং পরদিন ৭ আগস্ট ২ ঘণ্টার বেশি থাকতে পারিনি। পুরো ভবন ছিল অন্ধকার। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস- সব লাইন ছিল বিচ্ছিন্ন। তারপর ১০ আগস্টের পর থেকে কয়েকটি বিভাগের নির্ধারিত কিছু কর্মকর্তাকে শুধু অফিসে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো। ওই নিয়মে ১০ দিন চলার পর গত ২১ আগস্ট থেকে এখানকার বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত অফিস করছেন। তবে কোনো ধরনের দাপ্তরিক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ পর্যায়ে আমরা প্রতিদিন অফিসে গিয়ে কার কক্ষে কোন জিনিসটি নেই সেগুলো নির্ধারণ করছি। আশপাশে অন্য কোথাও আছে কি না তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। কয়েক দিনে অল্প কিছু মালামাল লণ্ডভণ্ড অবস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হলেও বেশির ভাগ কাগজপত্র ও সরঞ্জাম পাওয়া যাচ্ছে না।’
কর্মকর্তারা আরও জানান, ৯ তলাবিশিষ্ট ভবনটির বেশির ভাগ কক্ষের দরজা-জানালা, ফ্যান, চেয়ার-টেবিলসহ নানা আসবাবপত্র ভাঙা। পাঁচ শতাধিক কম্পিউটার-ল্যাপটপের হদিস নেই। আর অবশিষ্ট থাকা বাকি কম্পিউটারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ও আসবাব- কোনো কিছু্ই নেই নির্ধারিত স্থানে। অনেক ফ্লোরই বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে থাকা দাপ্তরিক নানা কাগজপত্র, অসংখ্য ফাইল আর কাগজে ভরা। সেগুলো সংগ্রহ করে সংসদ ভবনের শপথ কক্ষ ও কয়েকটি কক্ষে জড়ো করা হচ্ছে। শপথ কক্ষ থেকে শুধু সচল হওয়া কম্পিউটারগুলোকে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অফিসের প্রতিটি শাখাকে তাদের নিজ নিজ দপ্তরের আগে থাকা মালামাল ও আসবাবপত্রের তালিকা দিতে বলা হয়েছে। কিছুদিন ধরে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের লাইন সচল থাকলেও সব রুমের ফ্যান ও এসি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
জানা গেছে, সংসদ ভবনে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ জন। দ্বাদশ সংসদ বিলুপ্তির পর সম্প্রতি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সংসদ সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কে এম আব্দুস সালামকে সরকার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। তার অবর্তমানে সচিবালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন অতিরিক্ত সচিব নুরুজ্জামান। তিনিও এ মাসেই অবসরে যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সংসদের সব ধরনের ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অপেক্ষা করছেন সরকারি নির্দেশনার। সংসদ এলাকায় স্পিকারের বাসভবনসহ ১০টি ভিআইপি আবাসনসহ মোট ৫০টির বেশি সরকারি কোয়ার্টার রয়েছে। যারা ওই সব সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন তাদের বেশির ভাগই বাসা ছেড়েছেন। তাদের অনেকে উঠেছেন ভাড়া বাসায়, কেউ কেউ নিকটাত্মীয়ের বাসায় অবস্থান করছেন। কারণ ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুরে সেসব ভবনও বিধ্বস্ত। ওই সব আবাসন থেকেও টাকা-পয়সা, দামি স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র সবই লুটে নিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্সটি ঢাকার শেরেবাংলা নগরে ২১৫ একর জায়গার ওপর অবস্থিত। ১৯৮২ সালে নির্মিত ৯ তলাবিশিষ্ট এই ভবনের মূল স্থপতি প্রখ্যাত লুই আই কান। গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় সংসদ ভবন চত্বর ও ভবনের ভেতর ঢুকে পড়ে হাজারও মানুষ। এ সময় তারা স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, হুইপদের কক্ষসহ ভবনটির প্রায় সব কক্ষই তছনছ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, সেদিন ভবনের গেটে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে তাদের প্রবেশে বাধা দিলেও লোকসমাগম বেশি থাকায় তাদের আর আটকানো যায়নি। সংসদ ভবন চত্বরের দক্ষিণ প্লাজা, খেজুরবাগান মাঠ ও টানেলে ঢুকে পড়ে অসংখ্য মানুষ। ওই দিন বিকেল থেকে রাতভর দুর্বৃত্তরা সংসদ ভবনের প্রায় সব কক্ষেই জিনিসপত্র ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। তাদের অনেকে বিভিন্ন কক্ষের তালা ভেঙে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, টিভি, ফ্রিজসহ মূল্যবান কাগজপত্রও লুটে নেয়। বিকল করে দিয়ে যায় সংসদ ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির লাইন।
পরদিন ৬ আগস্ট দুপুরে সংসদ ভবনের দায়িত্ব নেয় সেনাবাহিনী। সেই দিন থেকে সেনা নেতৃত্বে সংসদ সচিবালয়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সংসদ ভবনের নিরাপত্তা বিধানে কাজ করছেন। তাদের সহযোগিতায় পরে এগিয়ে আসেন একদল শিক্ষার্থী। যারা বিধ্বস্ত সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজেও সহযোগিতা করেন। একই সঙ্গে লুট হয়ে যাওয়া কিছু মালামাল ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানান শিক্ষার্থীরা। তাদের আহ্বানে লুট করা কিছু জিনিস অনেকে ফেরতও দিয়ে যায়। সেগুলো ভবনের একটি কক্ষে রাখা আছে। সেই ঘটনার পর থেকে সংসদ সচিবালয়ের কর্মচারী-কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না নিরাপত্তারক্ষীরা।