বন্যা আর খোলা বাজারে ধানের দর সরকারি ক্রয় মূল্যের চেয়ে বেশি হওয়ার পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণে এবার খাদ্য অধিদপ্তরের রোবো ধান-চাল সংগ্রহ কর্মসূচি সফল হয়নি। গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি।
খাদ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্রে জানা গেছে, এবার সরকারিভাবে সেদ্ধ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১২ লাখ ৪০ হাজার ১২২ টন। আতপ চাল ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৬ টন। চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৫ লাখ টন। কিন্তু গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ মিলারদের কাছ সেদ্ধ চাল পাওয়া গেছে ১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৭৪ টন। আতপ চাল মিলেছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭০৬ টন। ধান সংগ্রহ হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩১ টন। গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ হাজার টন। কিন্তু পাওয়া গেছে ৩৭ টন। ধান, চাল ও গম সংগ্রহ কম হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ১১২ টন।
খাদ্য অধিদপ্তর জানায়, ৩৪ টাকা কেজি দরে গম, ৩২ টাকা কেজি দরে ধান, ৪৫ টাকা কেজি দরে সেদ্ধ চাল ও ৪৪ টাকা কেজি দরে আতপ চাল সংগ্রহ শুরু হয় ৫ মে থেকে। অভিযান শেষ হয় ৩১ আগস্ট।
খাদ্য অধিদপ্তরের এম আই এস অ্যান্ড এম বিভাগের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ধান সংগ্রহ হয়েছে ৫৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ, সেদ্ধ চাল ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ, আতপ চাল ৯০ দশমিক ১৩ শতাংশ আর সবচেয়ে কম সংগ্রহ হয়েছে গম ০ দশমিক ৭ শতাংশ।
মজুত সন্তোষজনক জানিয়ে খাদ্য অধিদপ্তর জানায়, সেদ্ধ চাল মজুত রয়েছে ১৩ লাখ ৫৩ হাজার ৩৭৭ টন আর আতপের মজুত আছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৮৩৯ টন। গম রয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৭ টন।
খাদ্য অধিদপ্তরের হিসাবে বলা হয়েছে, ১৯ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ১২ দিনে ১ কেজি গমও সংগ্রহ হয়নি। তবে এ সময়ের মধ্যে ধান সংগ্রহ হয়েছে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, সেদ্ধ চাল ৯ দশমিক ৪০ আর আতপ চাল সংগ্রহ হয়েছে ১৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিলস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কে এম লায়েক আলী বলেন, ‘সংগ্রহ অভিযানে সরকার মোট ধান-চালকে গুরুত্ব দিলেও হাওর এলাকার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের রংপুর ও পাবনাসহ কয়েকটি জেলায় শুধু মোটা ধান চাষ হয় যে কারণে ইচ্ছা থাকলেও অনেকের পক্ষে গুদামে ধান দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ চিকন ধানের দর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি।’
তিনি জানান, বোরো মৌসুমে প্রথম দফায় তার প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩৫ টন। দ্বিতীয় দফায় তাকে চাল দিতে বলা হয় ১৫ টন। প্রথম দিকে মোটা ধানের দর কিছুটা কম থাকায় প্রতি কেজি চালে লাভ হয়েছে ৫০ পয়সা আর দ্বিতীয় দফায় বরাদ্দ দেওয়া চাল সরবরাহ করতে গিয়ে প্রতি কেজিতে তাকে লোকসান গুনতে হয়েছে ১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা পর্যন্ত। কারণ তখন বাজারে ধানের দর বেড়ে যায়।
বগুড়ার অন্যতম খাদ্য উদ্বৃত্ত এলাকা নন্দীগ্রাম। রনবাঘাসহ আরও কয়েকটি বড় ধানের বাজার আছে এ উপজেলায়। কিন্তু সেসব হাটে মোট ধানের সরবরাহ হয় না তেমন। কিন্তু তারপরও এ এলাকার চালকল মালিকদের মোটা ধান দিতে হয়েছে সরকারি গুদামে। নিষেধ না থাকায় অনেক চালকল মালিকই চুক্তি মানতে গিয়ে বেশি দামে চিকন ধান কিনে সরকারি গুদামে চাল দেন লোকসান গুনে।
নন্দীগ্রামে বড় চালকলগুলোর একটি মায়া মুনির অটো রাইস মিল। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. মিজানুর রহমান মিজান। তিনি এবার ৬০০ টন চাল দেওয়ার জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি করেন। মোটা চাল দিতে গিয়ে তাকে মোটা ধান সংগ্রহ করতে হয়েছে রংপুর থেকে। সরকারি গুদামে ২০০ টন চাল দিয়েছেন। তার কোনো লাভ হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী বাকি ৪০০ টন চাল দিতে গিয়ে তাকে প্রতি কেজিতে লোকসান গুনতে হয়েছে কমপক্ষে ২ টাকা করে।
নন্দীগ্রাম উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফারুক আলমগীর জানান, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অনেক গুদামেই ধান ও চাল সংগ্রহ হয়েছে শত ভাগ। যেমন তার গুদামের সাধারণ ধারণ ক্ষমতা ২ হাজার ৫০০ টন। বোরো ধান চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই হয়েছে।
বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলাগুলোতে এখন জাত ও মানভেদে ৪০ কেজি ধান কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। কোথাও কোথাও সামান্য কম বা বেশি। তবে বেশির ভাগ এলাকাতেই প্রান্তিক চাষিদের ঘরে কোনো ধান নেই।