আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে নিজের লোক বসাতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিভ্রান্ত করতেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক সচিব আমিনুল ইসলাম খান রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
আমিনুল জানিয়েছেন, পুলিশসহ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে কাউকে পদায়ন করার আগে সিনিয়র ব্যাচভিত্তিক কর্মকর্তাদের ৪ সংস্থার রিপোর্ট পাঠানো হতো শেখ হাসিনার কাছে।
ওই সব কর্মকর্তার বায়োডাটা দেখে এবং নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে আরও বিস্তারিত বিষয় খোঁজ নিতেন শেখ হাসিনা। কিন্তু নিজস্ব লোক পদায়নের জন্য শেখ হাসিনার কাছে জোর তদবির করতেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল। যাকে তিনি পছন্দ করতেন না তার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনাকে নানা রকম নেতিবাচক কথা বলতেন। নানা আজগুবি অপকর্মের কাহিনি শুনাতেন। এতে ওই কর্মকর্তার বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতো শেখ হাসিনার। এর ফলে অনেক যোগ্য পুলিশ কর্মকর্তা আইজিপি থেকে শুরু করে ডিএমপি কমিশনার এমনকি র্যাবের ডিজি হতে পারেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন ভূমিকার কথা অনেক কর্মকর্তা পরে জেনেও চাকরির স্বার্থে মুখ খোলার সাহস পাননি। যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও যারা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন পাননি তাদের অনেকের কর্মক্ষেত্রে মনোবল ভেঙে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন।
কেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল শেখ হাসিনাকে বিভ্রান্ত করতেন- এ প্রশ্নের জবাবে আমিনুল জানিয়েছেন, পুলিশে তার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার ও অবৈধ বদলি করে পকেট ভরতে তিনি শেখ হাসিনাকে বিভ্রান্ত করতেন।
আমিনুলের মামলার তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত নাম প্রকাশে এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত রোববার দুপুরে রাজধানীর গুলশান এলাকার একটি বাসা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব আমিনুল ইসলাম খানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে পল্টনে মকবুল নামের এক বিএনপিকর্মী হত্যার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ। পল্টন থানার এসআই নাজমুল হাসান আদালতে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। পরে আদালত তাকে ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আমিনুলকে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব পদ থেকে ২০২৩ সালের মার্চে অবসরে যান আমিনুল ইসলাম খান। পুলিশের কোনো কর্মকর্তার র্যাবে বদলির ক্ষেত্রে তার বড় ভূমিকা থাকত। পুলিশের যেসব কর্মকর্তা র্যাবে বদলি হতে চাইতেন তারা আমিনুলের কাছে দিনরাত ধরনা দিতেন।
মামলার তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশ ও র্যাবসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে মতামত দিতেন আমিনুল। এ জন্য বিভিন্ন কর্মকর্তা তার অফিসে ভিড় করতেন। তিনি শুধু আশ্বাস দেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারতেন না। যারা সচিবালয়ে আমিনুলের কক্ষে ভিড় করতেন তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাঁকা চোখে দেখতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন।
আমিনুল জানিয়েছেন, ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) অনুগত কর্মকর্তাদের পদায়ন করতেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই ক্ষেত্রে তিনি কোনো ছাড় দিতেন না। ঢাকার বাইরে মহানগর কমিশনার বা রেঞ্জ ডিআইজিতে কামাল কিছুটা ছাড় দিলেও ঢাকায় পুলিশের মধ্যে তার যাতে একক আধিপত্য থাকে সেই বিষয় মাথা রেখে জিরো টলারেন্স দেখাতেন। এ জন্য ডিএমপির অনেক কর্মকর্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমন্ডির বাসা ও তেজগাঁওয়ে তার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভিড় করতেন বলে আমিনুল জানিয়েছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে আমিনুল জানিয়েছেন, খোদ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাবেক ডিএমপি কমিশনার ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত ছিলেন। কিন্তু কেউ বেনজীরের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেতেন না। রিমান্ডে থাকা আমিনুল মামলার তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, পল্টন থানায় যে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে সেই সেই ঘটনার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। বরং তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছেন যে, চাকরি থেকে তিনি অবসরে যাওয়ার পর রাজনীতির সঙ্গে জড়াননি। একেবারেই অবসর জীবনযাপন করতেন। আমিনুল দাবি করেছেন যে, তার আত্মীয়-স্বজনরা অনেকেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে জড়িত ছিল। এই আন্দোলনে তার নৈতিক সমর্থন ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আমলা হওয়ার কারণে তিনি প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারেননি।