নগরীর লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মিত হচ্ছে চট্টগ্রামের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। কিন্তু লালখান বাজারেই এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি ওঠার কোনো র্যাম্প নেই। এ মোড়ে শুধু নামার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ কারণে শুরু হয়েছে উল্টোপথে যানবাহন চলাচলের প্রবণতা। যারা শৃঙ্খলা মেনে এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠতে চান, তাদের ঘুরতে হবে দুই কিলোমিটার। এতে জিইসি মোড়েও তীব্র যানজট সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করে নগরবিদ ও সচেতন মহল বলছে, এ প্রকল্পের গোড়ায় গলদ রয়েছে।
লালখান বাজার মোড়ের গাড়িচালকরা জানান, বর্তমানে এলিভিটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার জন্য তাদের প্রায় চার কিলোমিটার ঘুরে ষোলশহর দুই নম্বর গেটে গিয়ে আকতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার হয়ে আসতে হয়। যে কারণে লালখান বাজার মোড়ে প্রায়ই উল্টো পথে প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং মোটরসাইকেল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠতে দেখা যায়। কারণ চার কিলোমিটার এলাকা কেউ ঘুরতে চায় না। এতে প্রতিনিয়ত বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। ইতোমধ্যে ছোটখাটো বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। সিডিএ বলছে, বাওয়া স্কুলের সামনে দিয়ে জিইসি মোড়ের দিকে যে র্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটির কাজ সম্পন্ন হলে ওই সময় এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার জন্য এই র্যাম্প ব্যবহার করা যাবে।
কিন্তু এটি দিয়ে উঠতে গেলেও দুই কিলোমিটার ঘুরতে হবে। কে ঘুরবে এতদূর?
পাঁচ র্যাম্প নির্মাণ না করার সিদ্ধান্ত
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) জানায়, এ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ১৪টি র্যাম্প নির্মাণের প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে ৫টির কাজ আপাতত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। মূলত র্যাম্প নির্মাণের কারণে যানজট সৃষ্টি হতে পারে। এ আশঙ্কা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপাতত নির্মাণ না করার সিদ্ধান্ত হওয়া র্যাম্পগুলো হলো টাইগারপাস অংশে পলোগ্রাউন্ডের দিক থেকে ওঠার র্যাম্প, আগ্রাবাদের জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের সামনে নামার র্যাম্প, কেইপিজেডে নামার একটি র্যাম্প এবং আগ্রাবাদের এক্সেস রোডের ওঠানামার দুটি র্যাম্প।
স্কুলের সামনে র্যাম্প তৈরিতে ক্ষোভ
বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের (বাওয়া স্কুল) সামনে এলিভেটেডে এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণে আপত্তি জানিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নগরীর ওয়াসাসংলগ্ন বাওয়া স্কুলের সম্মুখে র্যাম্প স্থাপন না করতে গত ২৬ মে অধ্যক্ষ মুহা. আরিফ উল হাছান চৌধুরী চউকের কাছে এক চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ করেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ওয়াসা মোড়সংলগ্ন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় চলার সময় প্রতিদিন প্রায় আট হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থী এখান দিয়ে চলাচল করে। এ অবস্থায় বাওয়া স্কুলের সামনে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প স্থাপন করলে শিক্ষার্থীদের বিশাল অংশের যাতায়াত বেশ অসুবিধায় পড়বে এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হবে।
সচেতন মহল ও নগরবিদের বক্তব্য
সম্মিলিত নাগরিক ও ব্যবসায়ী ফোরামের আহ্বায়ক ওমর ফারুক বলেন, ‘লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শুরু হয় লালখান বাজার থেকে। এ বাজার থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার ব্যবস্থা না রাখাকে মারাত্মক নকশাগত ভুল ও নির্মাণ ত্রুটি। লালখান বাজারে এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার র্যাম্প নির্মাণ না করে জিইসিতে করলে অসহনীয় যানজট সৃষ্টি হবে।’
বিশিষ্ট নগরবিদ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের নেতা প্রকৌশলী সুভাস বড়ুয়া বলেন, ‘চট্টগ্রামবাসী যেসব উন্নয়নকাজ প্রত্যাশা করেছে, সেটা না করে সরকারের কিছু ব্যক্তির অভিপ্রায় পূরণের কিছু অপরিকল্পিত উন্নয়ন চট্টগ্রামবাসীকে জোর করে গেলানো হচ্ছে। আমরা যা চাইনি সেটা আমাদের জোর করে দেওয়া হয়েছে।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মাসুদ আহম্মাদ বলেন, ‘একটি বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি করার সময় ট্রাফিক বিভাগসহ বিভিন্ন স্টেকহোলডারের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। সব সময় ভুল ডিজাইনের মাশুল জনগণকেই দিতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েই এ ধরনের বড় প্রকল্প হাতে নিতে হয়। লালখান বাজার থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শুরু হলো, অথচ সেখান থেকে গাড়ি ওঠতে পারবে না। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে যদি জিইসি দিয়ে ওঠতে হয়, তাহলে জটিলতা আরও বাড়বে।’
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘লালখান বাজার মোড়ে এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ির ওঠার র্যাম্প নেই। এ কারণে সেখানে র্যাম্প করার মতো পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। তবে বাওয়া স্কুলের সামনে দিয়ে জিইসির দিকে যে র্যাম্পটি নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটি দিয়েই ওঠতে হবে। জিইসি র্যাম্পের কারণে যানজট সৃষ্টি হবে না।’