শেয়ার নিয়ে আইনি জটিলতা এবং অর্থসংকটে ৯ মাস বন্ধ থাকার পর ফের শুরু হয়েছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। রাজধানীর মালিবাগ থেকে যাত্রাবাড়ী এলাকার কুতুবখালী অংশের কাজে এখন গতি এসেছে। পাশাপাশি ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজও এগিয়েছে, যা রাজধানীর উত্তরাকে খুব দ্রুত চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কে যুক্ত করবে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরে কাজ পুরোদমে শুরু হলে পান্থকুঞ্জ মোড়ের র্যাম্প ও বুয়েট অংশের র্যাম্প নিয়ে আগে কাজ হবে। হাতিরঝিল অংশের কাজ আগে শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরে একে একে মগবাজার, কমলাপুর হয়ে কুতুবখালী অংশের কাজ চলমান থাকবে।
শেয়ার নিয়ে আইনি জটিলতা এবং অর্থসংকটে ৯ মাস বন্ধ ছিল ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। এই এক্সপ্রেসওয়ের ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল থাইল্যান্ডভিত্তিক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইতালথাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। তবে ঋণখেলাপি হয়ে পড়ায় প্রকল্প থেকে সরতে বাধ্য হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। উচ্চ আদালত এবং সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে আইনি লড়াইয়ে ইতালথাই পরাজিত হওয়ায় তাদের শেয়ার চীনের শেনডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপের হাতে চলে যাচ্ছে। শেনডংয়ের শেয়ার ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৫ শতাংশে উন্নীত হচ্ছে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) এই প্রকল্পে বাংলাদেশ ছাড়াও শেনডং ও সিনো হাইড্রো করপোরেশনের অংশীদারত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) এক্সপ্রেসওয়ের নির্বাহী প্রতিষ্ঠান। শেয়ার হস্তান্তরের পর এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ নতুন উদ্যমে শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক এ এইচ এম সাখাওয়াত আখতার খবরের কাগজকে বলেন, ‘শেয়ার নিয়ে জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তাদের কাজ কখনো পুরোপুরি থেমে থাকেনি। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে আবার কাজ শুরু হবে। এখনো শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলছে। এটি এ মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে বলে আশা করি। আশা করছি, ২০২৫ সালের জুনে পুরো কাজ শেষ করতে পারব।’
সব মিলিয়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ ৭৪ শতাংশ শেষ হয়েছে। তাই বাকি সাত মাসে ২৮ শতাংশ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: ৭ বছরে অগ্রগতি মাত্র ৩৫ শতাংশ
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ চলছে। সাত বছর ধরে কাজ চলমান রয়েছে। ২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই এক্সপ্রেসওয়ের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, এই প্রকল্পে ঋণছাড়ে জটিলতার কারণে নির্মাণকাজে গতি আসেনি। এখন এই প্রকল্প সমাপ্তির সম্ভাব্য সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর।
এই প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন হয় ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর। সে সময় প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১৬ হাজার ৯০১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আর মেয়াদ ধরা হয় ১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ থেকে ৩০ জুন ২০২২ সাল পর্যন্ত। তবে ২০২২ সালের জুন মাসে সংশোধিত ডিপিপিতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকায়।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উপপ্রকল্প পরিচালক মাহমুদ ইবনে কাশেম খবরের কাগজকে জানান, প্রকল্পটি ২০১৭ সালে শুরু হয় বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে। এরপর পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) চুক্তির আওতায় চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি হয় ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর। আর ঋণ কার্যকর হয় ২০২২ সালের ১০ মে। পিপিপির আওতায় কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর। ২ শতাংশ হার সুদে প্রকল্পের ৮৫ শতাংশ ঋণ দেয় চীন (এক্সিম ব্যাংক), যা পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। বাকি ১৫ শতাংশ খরচ বহন করছে বাংলাদেশ সরকার।
প্রকল্পের অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের শুরুতে এই প্রকল্পের কমিশন নিয়ে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি করপোরেশন (সিএমসি) ও বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান এপিক সলিউশনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়; যা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। ২০১৫ সালে সিএমসিকে প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে এপিক সলিউশনের সঙ্গে ৬ শতাংশ কমিশনের চুক্তি হয়। তবে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও কাজ না পাওয়ায় সিএমসি কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে করে এ প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা দেখা দেয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই এক্সপ্রেসওয়ে বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সামনে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। এটা উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টর হয়ে আব্দুল্লাহপুর, ধউর, আশুলিয়া, জিরাবো, ইপিজেড হয়ে চন্দ্রা বাজারে গিয়ে শেষ হবে। এক্সপ্রেসওয়ের সাত জায়গায় ১৪টি ওঠা-নামার র্যাম্প থাকবে। এগুলোর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১১ কিলোমিটার। পাঁচটি টোলপ্লাজা থাকবে।
পিপিপি প্রকল্পের ঋণছাড়ের জটিলতা নিয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আমাদের দেশে পিপিপি প্রজেক্টগুলো অস্বাভাবিক। এখানে ঋণছাড়ে জটিলতা তৈরি হয়। বিষয়টি কিন্তু এমন নয় যে বিনিয়োগকারীরা আর্থিকভাবে দুর্বল। পিপিপি প্রজেক্ট সাইন করার সময়ই কিছু বিষয়ে ধোঁয়াশা থাকে যে বিনিয়োগটা ধীরগতিতে হয়। এতে ঠিকাদাররাও প্রকল্পকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পেয়ে যান। তারা বুঝে গেছেন, একের পর এক অনিয়ম করেও ছাড় পাওয়া যাচ্ছে। এখন দেশি বা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেও কিন্তু তাদের শাস্তি দেওয়ার সুযোগ আছে। সেটি প্রয়োগ করতে হবে।’
দুটি এক্সপ্রেসওয়ের নকশায় জটিলতা
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নকশা নিয়ে জটিলতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুল হক।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সফল হলে তবেই সফলতা মিলবে আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের। কোনো কারণে যদি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসও যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে আশুলিয়া প্রকল্পও কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী এলাকা থেকে শুরু করলে তাতে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শামসুল হক বলেন, ‘হানিফ ফ্লাইওভার ও ঢাকা এলিভেটেড দুটোই পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রজেক্ট। হানিফ ফ্লাইওভারের সভরেন গ্যারান্টিতে বলা হয়েছিল, ২৪ বছরের মধ্যে তার রেভিনিউ পরিবর্তন হয় এমন কোনো হস্তক্ষেপ সরকার করবে না। সেই গ্যারান্টির ১০ বছরও পার হয়নি। এখানে বেশ কিছু মিটিগেশন পটেনশিয়াল আছে। ইউলিটি সার্ভিস ট্রান্সফার করতেও পিপিপিতে ধরাবাঁধা কিছু নিয়ম আছে। সব বিষয় মাথায় রেখে এখন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোন পয়েন্টে নামবে সেটা ঠিক করতে হবে।’
বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কমলাপুরের দিকে যতই এগোবে, মেট্রোরেল প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার আশঙ্কা তৈরি হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে মালিবাগ পার হয়ে যখন কমলাপুরের দিকে চলে আসবে, তখন কনফ্লিক্টিং সিচুয়েশন তৈরি হবে। সেখানে মাল্টিপল প্রজেক্টের কাজ চলছে। এই অংশে রাস্তাও চওড়া না। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যখন কনফিগার করা হয়, তখন কিন্তু এই সিনারিগুলো ছিল না। আবার উত্তরার যে অংশে আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে শুরু হয়েছে, সেখানে আবার বিআরটি প্রকল্প ঝামেলা বাধিয়েছে। দুই প্রকল্পের র্যাম্পগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে যে নিচের সড়কের প্রশস্ততা কমেছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিন্তু যানজটও বাধায়। যেখানে র্যাম্পগুলো নেমে আসে সেখানে দেখা যায় যানজট তৈরি হয়। সুতরাং এসব পয়েন্টে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও নজর রাখতে হবে।’
তবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সমন্বয় হলে দূরপাল্লার গাড়িগুলোকে আর রাজধানীর ভেতরের মূল সড়ক ব্যবহার করতে হবে না। এতে যানজট অনেকটা কমে আসবে বলে মন্তব্য করেন শামসুল হক।