এলাকাটিতে একের পর এক মিলছে মরদেহ। অনেকটা নির্বিঘ্নে ঘটছে ছিনতাই। ঘটছে দুর্ধর্ষ ডাকাতি। চুরি, মারামারি তো আছেই। এই অপরাধ জোনটি হচ্ছে রূপগঞ্জ উপজেলার পূর্বাচল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় তৎপরতা না থাকার কারণে এখানে দিনের পর দিন ঘটছে এসব অপরাধ।
গত আট বছরে পূর্বাচলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় পূর্বাচল হয়ে উঠেছে মরদেহের ডাম্পিং পয়েন্ট। এতে পূর্বাচলবাসীর মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রাজউকের অধীন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এবং গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে পূর্বাচল গঠিত। বাংলাদেশের অন্যতম আধুনিক এই শহরে আছে দৃষ্টিনন্দন ৩০০ ফুট সড়ক। প্রাকৃতিক পরিবেশও চমৎকার। পূর্বাচল ঘিরে গড়ে উঠেছে লোভনীয় সব ফাস্টফুড, হাঁসের মাংস, চিতই পিঠা, খেলনা, মিষ্টি, শাকসবজির দোকানসহ হরেক রকমের কয়েক হাজার দোকান। মূল মহানগর ঢাকার ব্যস্ততা থেকে একটুখানি অবসর যাপনের আশায় ভ্রমণপিপাসুরা বেড়াতে আসেন এখানে। কিন্তু এর উল্টো পিঠেই অন্ধকার। এলাকাটি নির্জন ও সেফ জোন হওয়ায় বাইরে হত্যা করে নির্বিঘ্নে এখানে মরদেহ ফেলে যাচ্ছে অপরাধীরা। দিনের আলোয় পূর্বাচল উপশহর যত সুন্দর, রাতের বেলায় ঠিক ততটাই ভয়ংকর সুন্দর।
আট বছরে পূর্বাচলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৩টি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সর্বশেষ ২৪ নভেম্বর পূর্বাচলের পাশে আগলা এলাকা থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৮ নভেম্বর পূর্বাচলের ১৫ নম্বর সেক্টরের ৫৬ নম্বর ব্রিজ এলাকা থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১৩ নভেম্বর সকালে জসিম উদ্দিন নামে এক শিল্পপতির সাত টুকরা করা মরদেহ পূর্বাচলের ৫ নম্বর সেক্টরের একটি লেক থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন বিকেলে ১৭ নম্বর সেক্টর থেকে জসিম উদ্দিনের মরদেহের আরও তিনটি টুকরো উদ্ধার করা হয়। পরকীয়ার জের ধরে শিল্পপতি জসিম উদ্দিনকে হত্যা করা হয় ঢাকার কোনো এক স্থানে। তারপর সেভ জোন হিসেবে ফেলে রেখে যায় রূপগঞ্জের পূর্বাচলে। এ ঘটনায় রুমা আক্তার নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
একই বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর পূর্বাচলের ১০ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সেতুর নিচ থেকে কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় মানুষের একটি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল ১৩ নম্বর সেক্টরে ব্রিফকেসের ভেতর থেকে তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ১১ নম্বর সেতুর নিচ থেকে গুলিবিদ্ধ সোহাগ, শিমুল ও আজাদ নামে তিন যুবকের মরদেহ, একই বছরের ৭ নভেম্বর ১০ নম্বর সেক্টর থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০১৯ সালে ভোলানাথপুরের কাশফুলের ঝোপ থেকে এক তরুণীর ধর্ষিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ১৬ নভেম্বর নিখোঁজের চার দিন পর মাওলা (১৬) নামে অটোচালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি ৮ নম্বর সেক্টর থেকে মজুর উদ্দিনের মরদেহ, ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি ১০ নম্বর সেক্টর থেকে মিলন মিয়ার মরদেহ, একই বছরের ২৩ আগস্ট ৪ নম্বর সেক্টর থেকে সাত মাসের নবজাতকের মরদেহ, একই বছরের ৮ অক্টোবর ৭ নম্বর সেক্টর থেকে হৃদয় হাসানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
২০২১ সালের ১৬ অক্টোবর পূর্বাচলের ২৬ নম্বর সেক্টর থেকে সাইফুল ইসলাম (২৬) নামে এক ইজিবাইকচালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই বছর অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির মরদেহ ৪ নম্বর সেক্টর থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ২০২২ সালের ১৯ মে ২৫ নম্বর সেক্টর থেকে মজিবুর রহমানের মরদেহ, একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গত বছরের ৭ জুলাই ১৯ নম্বর সেক্টর থেকে অজ্ঞাতনামা যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই বছরের ২৪ আগস্ট ২০ নম্বর সেক্টর এলাকার একটি সবজি খেত থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
২০১৭ সালের ২ জুন পূর্বাচলে অত্যাধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ, রকেট লঞ্চারসহ মারাত্মক ধরনের বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছিল। তখনকার বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধে ব্যবহার উপযোগী ছিল অস্ত্রগুলো। নাশকতার উদ্দেশ্যে কোনো গোষ্ঠী এসব অস্ত্র সংগ্রহ করেছিল বলে পুলিশের ধারণা। কিন্তু আজ পর্যন্ত পুলিশ এসব অস্ত্রের উৎস উদ্ঘাটন করতে পারেনি।
উপজেলার দক্ষিণবাগ এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, রাতে আলোর অভাবে পূর্বাচলের রাস্তাগুলো খুবই অন্ধকার থাকে। কিছুই দেখা যায় না। এ কারণে বেশির ভাগ সময় ছিনতাই ও ডাকাতি হয়ে থাকে।
চলতি বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর সাজ্জাদ নামে এক যুবককে গাড়ি করে এয়ারপোর্ট থেকে উঠিয়ে পূর্বাচলে নিয়ে আসে অপরাধীরা। পরে তার কাছ থেকে সাত ভরি স্বর্ণালংকার ও টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায় একটি চক্র। পূর্বাচলে ছিনতাইয়ে সক্রিয় রয়েছে এ রকম প্রায় আটটি দল। এসব দলে মো. সাইফুল ইসলাম, মো. মাহাবুর রহমান, মো. ওবায়দুর রহমান, রমজান আলী, ডাকাত সর্দার বাবুসহ অন্তত ৪৫ জন সদস্য রয়েছে বলে জানা গেছে।
২০১৯ সালের ১০ মে পূর্বাচলের ৩০০ ফুট রোডের সমু মার্কেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে মো. সাইফুল ইসলাম, মো. মাহাবুর রহমান, ওবায়দুর রহমান এবং মো. বেলায়েত হোসেনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। ২০১৭ সালের ২ জুন রূপগঞ্জ ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ছালাহউদ্দিন ভূঁইয়ার দখলে থাকা পূর্বাচল উপশহরের ৫ নম্বর সেক্টরের খাল থেকে ৬১টি চায়না মেশিনগান, সেভেন পয়েন্ট সিক্স টু বোরের ৫টি পিস্তল, ২টি রকেট লঞ্চার, ৪২টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ৪৯টি মর্টারশেল, ২টি ওয়্যারলেস সেট, ১ হাজার ৫২৭ রাউন্ড গুলি, ৪৪টি ম্যাগাজিন ও ৪৯টি রকেট লঞ্চার প্রজেক্টর উদ্ধার করা হয়। এসব অস্ত্র উদ্ধারের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
রাশেদুল বলেন, পুলিশ ঠিকমতো পূর্বাচলের নির্জন এলাকায় টহল দিলে এসব অপরাধ অনেকটা কমে আসত।
ইনভেস্টিগেশন ইন্টেলিজেন্ট অফিসার মো. সালাউদ্দিন কাদের খবরের কাগজকে বলেন, ‘জনবল সংকট থাকলেও পূর্বাচলে ঘটে যাওয়া ডাকাতি, ছিনতাই ও খুনিদের গ্রেপ্তারে আমরা তৎপর। তবে জনবলের অভাবে তদন্ত কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পুলিশ সুপার (রূপগঞ্জ সার্কেল) মেহেদী ইসলাম বলেন, ‘পূর্বাচলের পুলিশ ক্যাম্পটি সম্প্রতি চালু হয়েছে। পুলিশের জনবল সংকট আছে। তবু পূর্বাচলে আমরা টহল বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছি।’
মরদেহের ডাম্পিং পয়েন্ট সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি পূর্বাচলে জসিম উদ্দিনের মরদেহ উদ্ধারের রহস্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ঘাটনসহ আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পেরেছি। আমরা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা শুধু কথায় নয়, কাজ করে দেখাতে চাই।’