আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গরূপে উদ্বোধনের প্রহর গুনছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প। কিন্তু এখনো অডিট আপত্তির পাহাড়। শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১০৮টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। নিষ্পন্ন হয়েছে ৩৩টি। এখনো অনিষ্পন্ন ৭৫টি অডিট আপত্তি। এই প্রকল্পে নিরাপত্তাব্যবস্থা খুবই দুর্বল, চুরি হচ্ছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ আইএমইডির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার শাহাদাত আলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঠিক ডিসেম্বরের ৩ তারিখ পদ্মা রেলসেতু প্রকল্প উদ্বোধন হচ্ছে- এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টাকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। তার অনুমতি নেওয়ার পরই পূর্ণাঙ্গরূপে উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হবে। কোন রুটে চলবে, আয় কেমন হবে- এসব বিবেচনা করেই তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।’ আইএমইডির প্রতিবেদনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘কাজ দেখভাল করার জন্য প্রকল্প পরিচালক আছেন, কনসালট্যান্ট আছেন। আইএমইডি তাদের সঙ্গে কথা বলেই রিপোর্ট করে। কাজেই কোনো ভুলত্রুটির ব্যাপারে তারা বেশি ভালো বলতে পারবেন।’ এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
আইএমইডির সচিব মো. আবুল কাশেম মহিউদ্দিন বলেন, ‘সতর্কতার সঙ্গে টাকা খরচ না করলে যেকোনো প্রকল্পে ত্রুটি থাকতে পারে। এই প্রকল্পে তেমন কিছু ধরা পড়েনি। কিন্তু অনেক অডিট আপত্তি রয়েছে। প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয়েছে। সে ব্যাপারে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জবাব দেবেন, যেন নিয়মের ব্যত্যয় না ঘটে। প্রকল্প ভালোভাবে তৈরি করা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তার গাউডলাইন নির্ধারণ করা হবে। এ ব্যাপারে কাজ চলছে।’
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাড়ে ছয় বছরে বাস্তবায়ন করার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৬ সালের ৩ মার্চ এই প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। প্রকল্প শেষের সময় নির্ধারণ করা হয় ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তখন খরচ ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের ঋণ ধরা হয়েছিল ২৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। বাকি অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে খরচ করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ২০১৮ সালের ২২ মে সংশোধন করে খরচ বাড়িয়ে ধরা হয় ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। এ সময় খরচ বাড়ানো হয় ১২ শতাংশ। সময়ও বাড়ানো হয় দুই বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। কাজ শেষ না হওয়ায় গত ২১ মার্চ আবারও এক বছর সময় বাড়ানো হয়, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও যশোর জেলার ১৪টি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘ সময় স্থায়ী পিডির দায়িত্বে কেউ ছিলেন না। প্রথমে রেলওয়ে ক্যাডারের এস কে চক্রবর্তী ২০১৫-এর ২৪ ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১৭ সালের মে পর্যন্ত সুকুমার ভৌমিক পিডির হাল ধরেন। এরপর অতিরিক্ত সচিব গোলাম ফকরুদ্দিন চৌধুরী ২০১৭-এর ৯ জুন থেকে ২০২১ সালের ১০ জুন পর্যন্ত পিডির দায়িত্ব পালন করেন। এর পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মো. আফজাল হোসেন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত প্রকল্পের প্রধান কাজ হচ্ছে ১৭৩ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ। লুপ, সাইডিংসহ মোট ২৩৬ কিলোমিটার রেল ট্র্যাকের কাজ করতে হবে। ২৩ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট, ৬০টি মেজর ব্রিজ, ২৭২টি মাইনর ব্রিজ (কালভার্ট ও আন্ডারপাস) নির্মাণ করা হবে। র্যাম্প রয়েছে প্রায় দুই কিলোমিটার। এসব কাজের জন্য পরিকল্পনায় রয়েছে ২ হাজার ৪২৬ একর ভূমি গ্রহণ। এর মধ্যে কিছু ভূমি পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া যাত্রীদের ওঠানামার জন্য ১৪টি নতুন রেলস্টেশন নির্মাণ ও ছয়টি বিদ্যমান রেলস্টেশন সংস্কার-সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এসব স্টেশনে যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য ১০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহের কথা বলা আছে প্রকল্পে।
ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে- অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৯৪ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৯৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা-মাওয়া অংশে ৯৮ শতাংশ, মাওয়া-ভাঙ্গা অংশে ৯৯ দশমিক ৬০ এবং ভাঙ্গা-যশোহর অংশে ৯৮ শতাংশ। প্রকল্পটি ভালোভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য প্রতি তিন মাস পরপর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সে অনুযায়ী ৩২টি হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে মাত্র ৯টি। আবার প্রতি চার মাস পরপর প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) সভা হওয়ার কথা। সে অনুযায়ী ২৪টি পিএসসি হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে মাত্র ১০টি। বর্তমানে প্রকল্পের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ঢাকার টিটিপাড়ায় আন্ডারপাস নির্মাণ, ভাঙ্গা জংশনে ওভারহেড স্টেশন, অফিস ভবন, সিটিসি ভবন নির্মাণকাজ। এগুলো নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু দিয়ে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী হয়ে যশোর-খুলনা রেলপথে যাতায়াতে সময় কমবে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা এবং ঢাকা থেকে যশোর-বেনাপোল রেলপথে সময় কমবে প্রায় ৪ ঘণ্টা। গত বছরের ১০ অক্টোবর পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকা থেকে প্রথম বাণিজ্যিক আন্তনগর ট্রেন চালানো হয় ফরিদপুরের ভাঙ্গা রেলস্টেশন পর্যন্ত। সে সময় পুরো প্রকল্পের ১৭২ কিলোমিটারের মধ্যে উদ্বোধন করা হয় মাত্র ৮২ কিলোমিটার।