মায়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে আরাকান আর্মিসহ অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীর সংঘাত চরম পরিণতির দিকে যাচ্ছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জান্তা সরকারের হাত থেকে এসব গোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।একই সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকট প্রতিবেশী দেশগুলোতেও প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মায়ানমারের নতুন এই বাস্তবতা আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগের মধ্যে আছে ৫ প্রতিবেশী বাংলাদেশ, ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও লাওস। এই উদ্বেগ নিরসনে করণীয় নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলো।
বাংলাদেশ থেকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এই বৈঠকে অংশ নিতে বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) থাইল্যান্ডের উদ্দেশে রওয়ানা হচ্ছেন।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, মায়ানমারে জান্তা সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা নেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে আরাকান আর্মিসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী।কিন্তু মায়ানমার সরকারের সঙ্গে এসব প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় রয়েছে।
কিছু কিছু বিষয়ে মায়ানমারের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। যেমন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্য। এ ছাড়া বিনিয়োগ ও রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা রয়েছে।
কাজেই যৌথভাবে এই সংকট মোকাবিলায় থাইল্যান্ডের উদ্যোগে বৈঠকে বসছেন প্রতিবেশী দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তোহিদ হোসেন এই বৈঠকে যোগ দেবেন। চীনের পক্ষ থেকে সে দেশের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠকে থাকবেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয় শঙ্করের থাকার কথা থাকলেও তিনি থাকতে পারছেন না। তার পরিবর্তে একজন প্রতিনিধি পাঠাবে ভারত। থাইল্যান্ডের পক্ষে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং লাউসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।
মায়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় সম্পর্কিত বিশেষ দূত ড. খলিলুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, 'এই মুহূর্তে বড় বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ ও মায়ানমার সীমান্ত আরাকান আর্মিসহ কয়েকটি গোষ্ঠী দখলে নিয়েছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। কাজেই আমাদের সীমান্ত অরক্ষিত রাখা এবং নতুন করে যাতে আর কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে না আসে সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে মায়ানমারের রাজধানী এখনো জান্তা সরকারের দখলে রয়েছে। এ অবস্থায় কোন বিষয়টি আমাদের জন্য ভালো হবে সেটি আমাদের ভাবতে হবে।
তবে এখনো কিছুটা সময় আছে আমাদের হাতে। এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসেনি যে আমরা কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখব।'
সূত্র জানায়, প্রতিবেশী ৫ দেশের এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের বিষয়টি আলোচনা করা হবে।
মায়ানমারে ভারতেরও স্বার্থ রয়েছে। কেননা, সেখানে ভারতের বিভিন্ন প্রকল্পে যে অর্থায়ন রয়েছে সেগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা বৈঠকে তুলতে পারে।
ভারতের কালাদান রোড প্রকল্প এবং ভারত-মায়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় মহাসড়ক প্রকল্পে ভারতের অর্থায়ন রয়েছে অন্তত ৩ বিলিয়ন ডলারের।
এ ছাড়া ভারত ও মায়ানমারের মধ্যে বড় সীমান্তও রয়েছে যার নিরাপত্তার বিষয়টি তুলতে পারে। আর চীনের কাছে মায়ানমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীনের রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভের আওতায় বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া মায়ানমারে চীনের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আছে বিভিন্ন প্রকল্পে। এর মধ্যে রাখাইনে চকফো সমুদ্রবন্দর অন্যতম।
অন্যদিকে মায়ানমারে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন শিল্পপণ্য রপ্তানির বাজার রয়েছে। দেশ দুটির মধ্যে বড় সীমান্তও রয়েছে। জান্তা সরকারের সঙ্গে শানসহ আরও দুটি গোষ্ঠীর যে লড়াই চলছে, এই গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়নসহ অন্যান্য সহযোগিতা আসে থাইল্যান্ড হয়ে। লাওসেরও বাণিজ্য এবং ছোট সীমান্ত রয়েছে মায়ানমারের সঙ্গে।
ফলে মায়ানমারের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে যে প্রভাব পড়তে পারে তার আগাম প্রস্তুতি নিতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। তবে এ ধরনের বৈঠক গত কয়েক বছর ধরে হলেও বাংলাদেশকে এবারই প্রথম আমন্ত্রণ জানায় থাইল্যান্ড।