গত এক মাসে বেশ কয়েকটি ওষুধের দাম বেড়েছে। এর বেশির ভাগই স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি কোম্পানির ওষুধ। এ ছাড়া গত ৬ মাসে বিভিন্ন কোম্পানি আরও অন্তত অর্ধশতাধিক ওষুধের দাম বাড়িয়েছে। অন্য পণ্যের মতো দর-কষাকষি না করে ওষুধ কেনাবেচা না হওয়ায় বেশির ভাগ ক্রেতাই দাম বৃদ্ধির বিষয়টি বুঝতে পারেন না। যে কারণে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে হইচই হলেও ওষুধের দাম নিয়ে তেমন কথা হয় না। কিন্তু নিত্যপণ্যের সঙ্গে বাড়তি দামে ওষুধ কিনতেও অনেকে হিমশিম খাচ্ছেন। ওষুধ ভেদে ১১০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়লেও ওষুধ প্রশাসন বলছে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ। ওষুধ শিল্প সমিতি বলছে- ডলারের দামের তুলনায় দাম কমেছে। লোকসানে ওষুধ বিক্রি করছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
গত ১২ ডিসেম্বর একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী এক পোস্টে লেখেন- ‘এক মাসের ব্যবধানে কয়েকটি কোম্পানির ওষুধের দাম বেড়েছে। কোনোটি দ্বিগুণ বা তার বেশি!’ এরপর রাজধানীর শাহবাগ, ঢাকা মেডিকেলের পাশে, শেরে বাংলানগর, মিটফোর্ড, জুরাইনসহ বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসি ঘুরে দাম বৃদ্ধির বিষয় জানা গেছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আসরাফ হোসেন বলেন, দাম সেভাবে বাড়ানো হয়নি। কোম্পানিভিত্তিক দামের সমন্বয় করা হয়েছে। ধরেন কোনো কোম্পানির একটি ওষুধের দাম ১০ টাকা ছিল, আরেক কোম্পানির সেই ওষুধ ছিল ৬ টাকা। সেটি সমন্বয় করা হয়েছে। তবে তা খুব বেশি না। তাতে সমন্বয় করতে গিয়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। যেটা ১০ টাকা ছিল সেটা ১২ টাকা করা হয়েছে। এরকম। কতগুলো ওষুধের দামের সমন্বয় করা হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে তিনি বলতে পারেননি।
রাজধানীর জুরাইন এলাকার এক ফার্মেসির মালিক বলেন, গত এক মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে স্কয়ার কোম্পানির ওষুধের দাম। তিনি বলেন, স্কয়ার কোম্পানির ব্যথানাশক ওষুধ এনাডল এস আর ১০০ মিলিগ্রামের (এমজি) প্যাকেট ৩৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৫১০ টাকা হয়েছে অর্থাৎ প্রতি পিস আগে ১২ টাকা বিক্রি করতাম। এখন ১৭ টাকায় বিক্রি করি।
আরেকটি ব্যথানাশক ওষুধ টোরেক্স । এই টোরেক্স ১০ মিলিগ্রামের প্যাকেট ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। আগে প্রতি পিস ১২ টাকায় বিক্রি করতাম। এখন ২০ টাকায় বিক্রি করা লাগে। হিসেব করে দেখা গেছে- এই ওষুধটির দাম বেড়েছে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
অ্যান্টিবায়োটিক জিম্যাক্স ৫০ মিলিগ্রাম সিরাপ ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২০ টাকা করা হয়েছে। জিম্যাক্স ৩০ মিলিগ্রাম সিরাপের দাম ১৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬০ টাকা করা হয়েছে।
পূর্ব জুরাইন এলাকার আরেক ফার্মেসি মালিক বলেন, স্কয়ার কোম্পানির ডায়াবেটিসের ওষুধ কমেট ৫০০ মিলিগ্রামের একপাতা ৪০ টাকায় বিক্রি করতাম। দাম বাড়ানোয় এখন ৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। অর্থাৎ দাম ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্যাসের ওষুধ ফ্যামোট্যাক ২০ মিলিগ্রামের একপাতা ৩০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা করা হয়েছে।
উচ্চরক্তচাপের ওষুধ রসুবা ৫ মিলিগ্রামের প্যাকেট ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে। আগে এক পাতা ১০০ টাকায় বিক্রি করতাম। এখন ১২০ টাকা বিক্রি করতে হয়। এটির দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ। রসুবা ১০ মিলিগ্রামের বক্স ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৬০ টাকা করেছে। ২০০ টাকার পাতা ২২০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে।
চর্ম রোগের ওষুধ ডার্মাসল এন অয়েনমেন্ট ৯০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে। কমবিসিট ক্রিম ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়েছে। অ্যালাট্রল সিরাপ ৩০ টাকা থেকে ৩৫ টাকা হয়েছে। এই ওষুধ বিক্রেতা বলেন, এ ছাড়া স্কয়ার আরও কয়েকটি ওষুধের দাম বাড়িয়েছে, যা এখন মনে আসছে না।
গত এক মাসে দাম বৃদ্ধির মধ্যে আরও রয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের মনোকাস্ট ১০ মিলিগ্রাম। এক পাতার দাম ১৫০ থেকে ১৭৫ টাকা হয়েছে। এটি অ্যালার্জির ওষুধ। এ ছাড়া বেড়েছে রেডিয়েন্ট কোম্পানির ক্র্যানবায়োটিক ৫০০ মিলিগ্রামের দাম। ২০০ টাকার পাতা ২২০ টাকা করা হয়েছে।
এর আগে গত ছয় মাসে যে অর্ধশতাধিক ওষুধের দাম বেড়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে স্কয়ার ফার্মা, বিকন ফার্মা, অ্যারিস্টো ফার্মা, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, এসিআই, সার্ভিয়ার ফার্মা, ইউনিমেড ইউনিহেলথ ও নুভিসতা ফার্মার বিভিন্ন ওষুধ। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে স্কয়ার কোম্পানির ওষুধের।
এসিআই কোম্পানির অ্যানাফ্লেক্স ম্যাক্স ট্যাবলেটের দাম বেড়েছে ১১০ শতাংশ। এ ছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির ৮টি ওষুধের ৫০ শতাংশের বেশি, ১১টির ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ, ২২টির ১০ থেকে ৩০ শতাংশ, ৯টির দাম বেড়েছে ৬ থেকে ১০ শতাংশ।
জানা গেছে, সরকার মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম নির্ধারণ করে থাকে। অন্য যত তার দাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানই নির্ধারণ করে থাকে।
ভায়োডিন মাউথওয়াশ ৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকা অর্থাৎ ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ, গ্লুভান প্লাস ৫০ মিলিগ্রামের প্যাকেট ৫০০ টাকা থেকে ৭২০ টাকা (৪৪ শতাংশ) ইউট্রোবিন ৫ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা (৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ) ড্যাফলন ৯০০+১০০ মিলিগ্রাম ৬৯০ থেকে ৮৪০ টাকা (২১ দশমিক ৭৩ শতাংশ), মোটিগাট ১০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট ৩৫০ থেকে ৪২৫ টাকা (২১ দশমিক ৪২ শতাংশ), এমপামেট ট্যাবলেট ৫ মিলিগ্রামের প্যাকেট ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা (২০ শতাংশ), লিনাগ্লিপ-এম ৫০০ মিলিগ্রাম ৩৬০ থেকে ৪২০ টাকা (১৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ), ফ্যামোট্যাক ৫০ মিলিগ্রাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকা (১০ শতাংশ), ডাইমাইক্রন এমআর ৩০ মিলিগ্রামের প্যাকেট ৩৮০ টাকা থেকে ৪২০ টাকা (১০ দশমিক ৫২ শতাংশ), লিগলিমেট ৫০০ মিলিগ্রাম ৩৬০ থেকে ৩৯০ টাকা (৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ), এমজার্ড এম ট্যাবলেট ৫/৫০০ মিলিগ্রামের প্যাকেট ৫০০ থেকে ৫৪০ টাকা অর্থাৎ ৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এ ছাড়া সেফ-৩ ডিএস ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাপসুলের দাম প্রতিটি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ন্যাট্রিলিক্স এসআর ১.৫ মিলিগ্রাম ২৭০ থেকে ৩৩০ টাকা, মারভ্যান ১০০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা, সুপ্রাভিট-জি ২১০ থেকে ৩০০ টাকা, জিরোটিল প্লাস ২৫০ মিলিগ্রাম ৪২০ থেকে ৬৩০ টাকা, এভেনাক ১০০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, ভাসটারেল এমআর ট্যাবলেট ৫৪০ থেকে ৭২০ টাকা, ওএমজি-৩ ক্যাপসুল ২৭০ থেকে ৩৩০ টাকা, ভিটামিন বি ট্যাবলেট বিকোবিয়ন ১০০ মিলিগ্রাম ৩০০ থেকে ৩৯০ টাকা, হাড়ের ক্ষয়রোধে ওভোক্যাল ডি ৩০০ থেকে ৩৬০ টাকা, ফেক্সো ১৮০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট ৩০০ থেকে ৩৬০ টাকা, ফ্লুভার ১০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, মাইকোরাল ২% ওরাল জেল ৭০ টাকা থেকে ৯০ টাকা, জেলোরা ২% ওরাল জেল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, নেবানল ২০ থেকে ২৫ টাকা, উইন্ডেল গ্লাস রেস্পিরেটর সল্যুশনের পাঁচ এমএলের বোতলের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা করা হয়েছে।
বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসি ঘুরে দেখা গেছে- অধিকাংশ ক্রেতা ওষুধ কেনার সময় নির্দিষ্ট করে কোনো ওষুধের দাম জিজ্ঞেস করেন না। তারা ফার্মেসিতে এসে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বলেন এই ওষুধগুলো দেন। চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ দিয়ে ফার্মেসি থেকে ক্রেতাকে বলা হয় আপনার এত টাকা হয়েছে। ক্রেতা সেই টাকা দিয়ে ওষুধ নিয়ে চলে যান। কোনো কোনো ফার্মেসিতে মোট দামের ওপর ৩ থেকে ৫ শতাংশ মূল্য ছাড় দেওয়া হয়। তবে খুব সামান্য সংখ্যক ক্রেতা আছেন- যারা দুই একটা ফার্মেসি ঘুরে দামের পার্থক্য তুলনা করে ওষুধ কেনেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় কথা হয় এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, বাবার জন্য ওষুধ কিনেছি। তিনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি এবং কোমর ব্যথার রোগী। এসব ওষুধ নিয়মিত কিনতে হয়। তিনি বলেন, এখন দ্রব্যের যে দাম সেই সঙ্গে ওষুধেরও দাম প্রায় বাড়ছে। এতে সবমিলিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দাম বৃদ্ধি পাওয়া ওষুধের মধ্যে রয়েছে ব্যথানাশক, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, ভিটামিন ও চর্মরোগের।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও এমডি আবদুল মুক্তাদির বলেন, ডলারের দাম অনেক বেড়েছে। আমাদের র-ম্যাটারিয়াল কিনে আনতে হয়। তাতে অনেক দাম পড়ে যাচ্ছে। আমরা কিনি ডলারে, বিক্রি করি টাকায়। সেই তুলনা হিসেব করলে, ওষুধের দাম অনেক কমেছে। লোকসানে ওষুধ বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের ওষুধের মার্কেট ৩ বিলিয়ন অর্থাৎ ৩ হাজার মিলিয়নের। লোক সংখ্যা ১৭ কোটি। জনপ্রতি বছরে ওষুধের পেছনে খরচ হয় ১৭ ডলার অর্থাৎ ২১৯৫ টাকা।
ওষুধ কোম্পানিগুলো লোকসানে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়বে। ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ কতদিন লোকসান দেওয়া সম্ভব?