মিলমালিকদের চাপে সরকার গত ৯ ডিসেম্বর সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৮ টাকা বাড়িয়েছে। ওই দিন বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেছিলেন, ‘তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করি বাজারে আর তেলের ঘাটতি হবে না।’ কিন্তু তিন সপ্তাহ অতিবাহিত হয়েছে। তার পরও বাজার স্বাভাবিক হচ্ছে না। সংকট কাটছে না। বিভিন্ন কোম্পানির পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেল পাওয়া গেলেও এক ও দুই লিটারের তেল সহজে মেলে না।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামনে রমজান মাস আসছে। মিলাররা দাম বাড়ানোর জন্য কৌশল নিয়েছেন। এ জন্য বাজারে তেল ছাড়ছেন না। আমরা চাহিদামতো পাচ্ছি না। ক্রেতারা খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। আগের মতোই বেশি দামে চাল, মুরগি বিক্রি হচ্ছে। গতকাল বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে মিলমালিকরা বলছেন, সরকার প্রতি মাসে হিসাব করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো বা কমানোর ঘোষণা দেবে। আমরা তা কার্যকর করব। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও টিকে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি বিদেশে থাকায় কোনো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। কিন্তু টিকে গ্রুপের পরিচালক আতাহার তসলিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাঁচ লিটারের তুলনায় এক ও দুই লিটার বোতলের উৎপাদন খরচ বেশি। এ জন্য হয়তো সরবরাহ কম। তবে বাজারে সয়াবিন তেলের কোনো সংকট নেই। যে যা চাচ্ছে তাই দেওয়া হচ্ছে।
দাম বাড়ানোর জন্যই এক ও দুই লিটারের সরবরাহ কমানো হয়েছে- এমন অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘খুচরা বিক্রেতাদের এই অভিযোগ ঠিক না। সরকার প্রতি মাসে (ক্যালকুলেশন) হিসাব করে দাম বাড়ানো বা কমানোর ঘোষণা দিচ্ছে। আমরা তা কার্যকর করছি। আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর এটা নির্ভর করছে। আমরা ইচ্ছা করে দাম বাড়াতে বা কমাতে পারি না।’
ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই বিভিন্ন মিলমালিক ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমিয়ে দেন বাজারে। ফলে অধিকাংশ বাজার থেকে তা উধাও হয়ে যায়। এভাবে বাজার ‘অস্থির’ হলে গত ৯ ডিসেম্বর সরকার বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৮ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৬৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল ১৪৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ওই দিনই বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন সচিবালয়ে বলেছিলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে তেলের ঘাটতি রয়েছে, এ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, ভোক্তারাও অস্বস্তিতে রয়েছেন। সে জন্য আমরা তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে নতুন দাম নির্ধারণ করেছি। আশা করি বাজারে আর তেলের ঘাটতি হবে না।’
কিন্তু তিন সপ্তাহ চলে গেলেও স্বাভাবিক হয়নি সয়াবিন তেলের বাজার। ভোক্তারা এখনো সব বাজারে এক ও দুই লিটারের সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না। খুচরা বিক্রেতারাও বিক্রি করতে পারছেন না। এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মনির জেনারেল স্টোরের আনোয়ার হোসেন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘দাম বাড়ানোর পর প্রথমে কয়েক দিন সয়াবিন তেল পাওয়া গেলেও পরে আর পাই না। সব কোম্পানি থেকে দেয় না তেল। এখনো তেলের সংকট কাটেনি। দেখা যায় পাঁচ কার্টন চাইলে এক কার্টন দেয়। আবার সব কোম্পানি থেকে দেয় না। তাদের লোকজন আসে না। আবার পাঁচ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও এক ও দুই লিটার সহজে পাওয়া যায় না। সামনে রমজান মাস আসছে। তারা দাম বাড়ানোর জন্যই হয়তো এ কাজ করছে।’ এই বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী বিসমিল্লাহ জেনারেল স্টোরের তাফিন হাসানসহ অন্য মুদি ব্যবসায়ীরাও একই অভিযোগ করে বলেন, ‘তীর এক লিটারের পাওয়া গেলেও পুষ্টি, রূপচাঁদা, ফ্রেশ তেল পাওয়া যায় না। তবে পাঁচ লিটারের তেল পাওয়া যাচ্ছে। আমরা বিক্রিও করছি।’
এদিকে কারওয়ান বাজারেও দেখা গেছে একই চিত্র। এই বাজারের আল্লাহর দান স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলম খান বলেন, ‘দাম বাড়ানোর পর সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে মেঘনা গ্রুপের এক লিটারের তেল (ফ্রেশ) পাওয়া গেলেও সিটি গ্রুপের তীর, টিকে গ্রুপের তেল (পুষ্টি) পাই না। কোম্পানির লোক আসে না। তাই বিক্রি করতে পারি না।’ হাতিরপুল, নিউ মার্কেটসহ অন্য বাজারেও দেখা গেছে একই চিত্র। পাঁচ লিটারের তেল ৮৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু এক লিটারের ১৮৫ টাকার তেল আগের মতো সচরাচর পাওয়া যাচ্ছে না।
আসলে সংকট কোথায়? কেন বাজারের সব দোকানে সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এসব জানতে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনে যোগাযোগ করা হলে নির্বাহী কর্মকর্তা জয়নাল মোল্লা বলেন, ‘আগে এলসি কম খোলা হয়েছে। এ জন্য সরবরাহ কমে যায়। সরকার দাম বেঁধে দেওয়ার পর সব কোম্পানি পুরোদমে তেল উৎপাদন করছে। বর্তমানে তেলের কোনো সংকট নেই। সামনে রমজান। সরকারও কঠোরভাবে সবকিছ দেখছে। কাজেই দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা কম। মেঘনা গ্রপের মহাব্যবস্থাপক তসলিম শাহরিয়ারও বলেন, ‘আমরা ডিলারদের তেল দিচ্ছি। কোনো সংকট নেই। খুচরা বিক্রেতারা যা বলছেন তা সঠিক না।’
বর্তমানে দামের ব্যাপারে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে যোগাযোগ করা হলে উপ-প্রধান মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘কয়েক দিন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পাম্প অয়েলের দাম প্রতি টনে ২০ ডলার কমেছে। সয়াবিন তেলের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। দাম বাড়বে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এখনো মিলমালিকদের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর জন্য কোনো চিঠি দেয়নি। তা পেলে মিলমালিকদের সঙ্গে বসে পর্যালোচনা করা হবে।’
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই বলছে, বাংলাদেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২০ লাখ টন। প্রতি মাসে লাগে দেড় লাখ টন। তবে রমজান মাসে চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। তিন লাখ টন তেল লাগে। গত অক্টোবর-নভেম্বরে অপরিশোধিত ও পাম অয়েল আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৬০ হাজার টন। বছরের ব্যবধানে আমদানি কিছুটা কমেছে।
বাড়তি দামেই চাল-মুরগি বিক্রি
কয়েক দিন আগে মুরগির দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়ে গেছে। গতকালও কমেনি। আগের মতোই বিভিন্ন বাজারে ব্রয়লার মুরগি ২০০-২১০ টাকা কেজি, সোনালি ৩৩০-৩৫০ টাকা ও দেশি মুরগি ৫৫০ টাকা কেজি বিক্রি করতে দেখা গেছে। চালের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আগের মতোই বেশি দামে মিনিকেট ৭৫-৮০ টাকা কেজি, আটাশ চাল ৬০-৬২ টাকা ও মোটা চালের কেজি ৫২ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। আলুর দাম কমে ৬০ টাকা কেজি, মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৬০, আমদানি করাটা ৭০ ও পুরোনো পেঁয়াজ ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে।