গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজধানীর মোহাম্মদপুরের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেলেও এই মুহূর্তে সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন গ্রুপের একাধিক কিশোর গ্যাং।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্ভরযোগ্য সূত্র খবরের কাগজকে এসব তথ্য জানিয়ে বলেছে, চাঁদাবাজি ও জমি দখলের জন্য এই কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে। চাঁদাবাজির জন্য কে কোন মার্কেট, বস্তি ও ফুটপাত দখলে নেবে, সেসব নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্যে অস্থির হয়ে উঠেছে মোহাম্মপুরের বিভিন্ন এলাকা। এ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন এলাকাবাসী।
সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য
মোহম্মদপুর ও আদাবরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দেশি অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, চুরি-ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধ করছে। এই গ্যাং সদস্যদের কেউ কেউ জমি দখলের কাজেও ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।
গত বছরের ১৯ জুলাই সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে সেনাবাহিনী। সরকার পতনের পর রাজধানীর মোহাম্মদপুর তখন অপরাধের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিল বলে আলোচনায় আসে। এই এলাকার অপরাধ দমনের জন্য শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা উদ্যান, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকাসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় সেনাবাহিনী ক্যাম্প বসায়। পাশাপাশি জেনেভা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন জায়গায় চলে সেনা অভিযান। অভিযানের মুখে দুর্ধর্ষ বড় সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। উদ্ধার করা হয় দেশি অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র। সেনা অভিযানের ফলে জেনেভা ক্যাম্পসহ এই এলাকার অপরাধ কমে এলেও এখন আবার তা শুরু হয়েছে। চলছে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। এ জন্য সক্রিয় রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের বেশ কয়েকটি দুর্ধর্ষ গ্রুপ।
অস্ত্রের ছড়াছড়ি
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, সেনাক্যাম্প বসানোর পর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৭০০ বার অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৪০০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। জেনেভা ক্যাম্প ছাড়া মোহাম্মদপুরের অন্যান্য এলাকা থেকে গত ছয় মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র। গ্রেপ্তার হয়েছে হাজারেরও বেশি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, সরকার পতনের আন্দোলনকে দমন করার জন্য এই এলাকার সন্ত্রাসীদের হাতে শত শত অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেসব অস্ত্রের বেশির ভাগ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র দিয়েই এখন অপরাধীরা তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সেনাক্যাম্প বসার পর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং। তবে তাদের কোনো লিডার বা নেতার সন্ধান এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পায়নি। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বেপরোয়া। তারা নিজেদের মতো করে ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করছে। সাধারণ বাসিন্দারা অবশ্য বলছেন, এই কিশোর গ্যাংও ভয়ংকর আর তাদের মধ্যেও কেউ কেউ দুর্ধর্ষ অপরাধী হয়ে উঠছে।
গ্যাং সদস্যদের বিষয়ে জানা গেছে, এই কিশোররা মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে থাকে। তারা কে কোন এলাকা দখলে নেবে, কে কোথায় চাঁদা তুলবে, কে কোন এলাকায় মাদক বিক্রি করবে- এসব নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ায়। দ্বন্দ্ব থেকে তাদের মধ্যে মারামারি, মারণাস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে। তারা পটকা বা বিস্ফোরক জাতীয় দ্রব্য ফাটিয়েও নিজেদের ক্ষমতা জানান দেওয়ার চেষ্টা করে।
অপরাধ চিত্র
গত ২৫ বছর ধরে আদাবরে বসবাস করা সিনিয়র সাংবাদিক এনামুল হক বলেন, অনেক সময় মধ্যরাতের পর মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের শব্দে বিল্ডিংসহ আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে। এতে হঠাৎ করে অনেকেরই ঘুম ভেঙে যায়। মানুষ অনেক ভয় পাচ্ছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে।
গত রবিবার সরেজমিনে গিয়ে মোহাম্মদপুরের আদাবর, বছিলা বেড়িবাঁধ, শিয়া মসজিদ, ঢাকা উদ্যান, বিভিন্ন হাউজিং, জেনেভা ক্যাম্প ও টাউন হলের আশপাশের অলিগলিতে কিশোরদের জটলা দেখা গেছে। সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় তাদের ভিড় বেড়ে যায়। উষ্কখুষ্ক চুলের বিভিন্ন রংচটা ছেঁড়া-ফাটা জিন্সের প্যান্ট আর শার্ট পরা ১০ থেকে ১২ জন কিশোর মিলে এক-এক জায়গায় আড্ডা দেয়। এই আড্ডার আড়ালে তারা মাদক বিক্রি করে বলে জানা গেছে। দিনের ব্যস্ত রাস্তায় আর রাতের ফাঁকা সড়কগুলোতে হেলমেটবিহীন অবস্থায় বেপরোয়া গতিতে তাদের বাইক চালাতে দেখা যায়।
আদাবরের বাসিন্দা সরোওয়ার্দী হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে কিশোর গ্যাংরা যার যার মতো এলাকাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও কেউ কেউ তাদের ব্যবহারের চেষ্টা করছে। আগে এলাকার সংসদ সদস্য ও ওয়ার্ড কমিশনারদের কাছে এলাকার সমস্যা সম্পর্কে অভিযোগ দেওয়া যেত। কিন্তু এখন এসব শোনার কেউ নেই। কিশোর গ্যাংয়ের উদভ্রান্ত অপরাধী কিশোর ও তরুণরা বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করছে। এলাকার মানুষ তাই ভীষণ আতঙ্কে আছেন।
মোহাম্মদপুরে বসবাস করা একজন সবজি ব্যবসায়ী জানান, রাত হলেই এই অপরাধীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। মাদক বিক্রি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ তারা করে থাকে। মধ্যরাত থেকে ক্ষণে ক্ষণে শোনা যায় বিস্ফোরণের শব্দ। এতে রাতে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ঘুম ভেঙে যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের সমস্যা হয় বেশি। কারও পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না এ রকম বিস্ফোরণের কারণ কী? কারা এসব ঘটাচ্ছে?
মোহাম্মদপুর ফিউচার টাউন হাউজিংয়ের বাসিন্দা মো. তসলিমুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে হাউজিংয়ের বাসিন্দারা চরমভাবে আতঙ্কিত। আগে পুলিশ টহল দিত, কিন্তু এখন তাদের টহল দিতে দেখা যায় না। আগে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা রাতে ঘটত। এখন ঘটছে দিন-দুপুরে, প্রকাশ্যে। তিনি বলেন, অনেক বাড়ির মালিক মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে সুযোগসন্ধানী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বাসায় ঢুকে অনেকটা প্রকাশ্যে চুরি-ছিনতাই করে পালিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দিন আগে দিনের বেলা আমাদের এই হাউজিংয়ের ২ নম্বর রোডের একটা নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে এক দল কিশোর ভ্যানে করে রড নিয়ে গেছে। চন্দ্রিমা উদ্যান ও ফিউচার হাউজিংয়ের হাক্কার (বাঁশের সাঁকো) কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় জসিম উদ্দিন নামের একজনকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে তার ল্যাপটপসহ টাকা-পয়সা কেড়ে নিয়ে যায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা না থাকায় এলাকায় চাঁদাবাজিও বেড়েছে। ক্ষমতা পরিবর্তনের পর চাঁদাবাজির হাতবদল হয়েছে। নতুন চাঁদাবাজরা এখন বিভিন্ন দোকানে এসে প্রকাশ্যে চাঁদা নিচ্ছে। ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। এলাকাবাসী অপরাধীদের কাছে একেবারে জিম্মি হয়ে গেছেন।’
শুধু এই এলাকায় নয়, আরাম হাউজিং, প্রবাল হাউজিং, বছিলা বেড়িবাঁধের ব্যবসায়ীরা জানান, পুলিশের টহল না থাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব দিন দিন বেড়ে চলেছে। তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিদিন চাঁদা তুলছে। দিনের বেলায় প্রকাশ্যে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
আদাবর-মোহাম্মদপুরে তাণ্ডব
চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে আদাবর এলাকার একটি বাসা থেকে চুরি হওয়া ৩২ ভরি স্বর্ণালংকার উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই চুরির ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত বছরের ২৮ থেকে ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে এই চুরির ঘটনা ঘটে। চোরেরা ওই বাসার একটি লকার ভেঙে ৪৫ ভরি স্বর্ণালংকার ও রুপার অলংকার চুরি করে নিয়ে যায়। ৩ জানুয়ারি আদাবরের ৮ নম্বর রোডে সন্ধ্যার দিকে চারজন ছিনতাইকারীর দ্বারা মোবাইল ছিনতাইয়ের শিকার হন স্থানীয় একজন অধিবাসী। তাকে চাপাতি দিয়ে আঘাত করা হয়। আদাবরের ৬ নম্বর রোডেও কিশোরদের হানাহানি করতে দেখা গেছে।
এর আগে গত ১৮ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে আদাবরে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ ওয়ালটনের একজন কর্মকর্তা। আদাবর থানা এলাকার ৯/১০ নম্বর গলির মাথায় পাঁচজন ছিনতাইকারী ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার গতিরোধ করে। তারা ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং শারীরিকভাবে আঘাত করে তার ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এই দৃশ্য দেখে আশপাশ থেকে লোকজন এগিয়ে এলে ছিনতাইকারীরা ল্যাপটপের ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় মোবাইল ফোনটি।
ভুক্তভোগী রবিউল ইসলাম মিল্টন বলেন, ‘তারা ধারালো অস্ত্র নিয়ে আমাকে ভয় দেখিয়ে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। আল্লাহ রক্ষা করেছেন। আমি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’
মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিং এলাকায় গত ৮ ডিসেম্বর বিকেলে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন এক বাসিন্দা। তার কাছে থাকা প্রায় ৬৫ হাজার টাকার মালামাল ছিনতাইকারীরা নিয়ে যায়।
গত শুক্রবার ২০ থেকে ৩০ জন কিশোর দেশীয় অস্ত্র হাতে আদাবরের মেহেদীবাগ এলাকায় তাণ্ডব চালায়। এলোপাতাড়ি কোপানো হয় সাধারণ মানুষকে। পুরো এলাকায় তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে মোহাম্মদপুর-আদাবর এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্য। পুরো এলাকাই কিশোর গ্যাংসহ অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে অস্থির। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘চুরি-ছিনতাই সামান্য বেড়েছে। আমরা কাজ করছি। আশা করছি আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব।’
আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম জাহাঙ্গীর খবরের কাগজকে বলেন, ‘আদাবর এলাকায় জমি দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ে প্রতিদিনই মারামারি ঘটনার খবর পাচ্ছি। কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন গ্রুপ এই দখলবাজি ও মারামারিতে অংশ নেয়। রাজনৈতিকভাবেও দলীয় প্রভাব খাটাচ্ছে অনেকে। তবে সবকিছু আমরা শক্ত হাতে দমন করার চেষ্টা করছি।’ বিভিন্ন অপরাধে আদবর থানায় মাসে ১৫টির মতো মামলা হচ্ছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী ইফতেখার হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘শীতের কারণে রাস্তায় মানুষের চলাচল এখন কিছুটা কম। এই সুযোগে মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। শীতের মধ্যে সন্ত্রাসীরা কালো জ্যাকেট পরে পকেটে ছুরি, চাপাতি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অপরাধ করে বেড়ায়। রাতে আমাদের টহল পুলিশ কাজ করছে। খবর পাওয়া মাত্রই আমরা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
তিনি দাবি করেন, এই এলাকায় অপরাধ কমেছে। এলাকার মানুষ ছিনতাইকারীদের ধরে পুলিশকে খবর দিচ্ছেন। এ ছাড়া মামলাও কমে এসেছে। আগে মাসে মামলা হতো গড়ে ২০০, এখন ৭০ থেকে ৮০টির মতো মামলা হয়।