শীতের এই সময়ে অন্য রোগের সঙ্গে ভোগাচ্ছে ডায়রিয়াও। চলতি বছরের ১ থেকে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকার বাইরে ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪ হাজার ২৫৪ জন। দিনে গড়ে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৩৭৫ জন। একই সময়ে রাজধানীর আইসিডিডিআর,বিতে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪ হাজার ৩৬১ জন। দিনে গড়ে ৭২৬ জন। আইসিডিডিআরবিতে চিকিৎসা নেওয়াদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু।
নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে রাজধানীর বাইরে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৫৭৬ জন। দিনে গড়ে ১ হাজার ৭৮০। সেই তুলনায় জানুয়ারির প্রথম ছয় দিনে ভর্তির গড় অনেক বেশি।
এই পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে ১৫ হাজার ১৫০ জন, ময়মনসিংহে ৬ হাজার ৪৪৬ জন, চট্টগ্রামে ৩৫ হাজার ২৩৪ জন, রাজশাহী ১০ হাজার ৬৪৭ জন, রংপুরে ২১ হাজার ২৫৭ জন, খুলনায় ২১ হাজার ৭৩৫ জন, বরিশালে ৮ হাজার ৯৭৫ জন এবং সিলেটে ৬ হাজার ৩৫০ জন ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
আইসিডিডিআরবির ঢাকা হাসপাতালে ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৮ হাজার ৪০ জন। দিনে গড়ে ৭১৭। নভেম্বর মাসে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৭ হাজার ১০৪ জন। এর মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু ১১ হাজার ৯৯৫ জন। অর্থাৎ ৭০ দশমিক ১ শতাংশ। ডিসেম্বরে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৬ হাজার ৫৭৫ জন। এর মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী ২২ হাজার ২৩৩ জন। অর্থাৎ ৮৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। নভেম্বরে দিনে গড়ে ৫৭০ জন করে চিকিৎসা নিয়েছেন। ডিসেম্বরে দিনে গড়ে ৮৫৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। জানুয়ারির ৬ দিনে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪ হাজার ৩৬১ জন। দিনে গড়ে ৭২৬ জন করে।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টা পর্যন্ত আইসিডিডিআরবির ঢাকা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিবন্ধন করেন ১৮১ জন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নিবন্ধন কাউন্টার, নার্স ও চিকিৎসক কাউন্টারের সামনে শিশু নিয়ে ২১ জন অভিভাবককে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
বেলা পৌনে ১২টার দিকে কথা হয় এক অভিভাবকের সঙ্গে। শিউলি বেগম নামের ওই অভিভাবক জানান, তাদের বাড়ি শরীয়তপুরে। সকালে শরীয়তপুর থেকে এসেছেন ১৫ মাস বয়সী ছেলে শাহদাতকে নিয়ে। তিনি জানান, চার দিন আগে পাতলা পায়খানা শুরু হলে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে তাকে একটি স্যালাইন দেওয়া হয়। তিন দিনেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সেখানকার চিকিৎসকরা ঢাকা যাওয়ার পরামর্শ দেন। সে জন্য গতকাল সকালে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
ডায়রিয়া হওয়ার পর প্রতিদিন নির্ধারিত ফিডারে যতটুকু পানি ধরে ততটুকু পানিতে একটি করে স্যালাইন মিশিয়ে দিনে দুটি স্যালাইন খাইয়েছেন বলেও জানান এই মহিলা। শাহদাতের মা শিউলি বেগম আরও বলেন, আইসিডিডিআরবিতে ভর্তি করার পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রতিবার পায়খানার পর চা চামচের ৭ চামচ করে স্যালাইন খাওয়াতে। কিন্তু আগে তিন দিন দুটি করে স্যালাইন খাওয়ানো হয়েছে। আমরা জানি না কতটুকু খাওয়াতে হবে। সেখানকার ডাক্তাররাও বলে দেননি। ফিডার মুখে না দিলে কান্না করত। তাই স্যালাইন ফিডারে গুলিয়ে মুখে দিয়ে রাখতাম। দিনে একটি করে ডাবের পানিও খাওয়ানো হয়েছে।
ডায়রিয়ার কারণে শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। আইসিডিডিআরবিতে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের বিছানায় শিশু নিয়ে বসে আছেন মায়েরা। আর বাইরে অপেক্ষা করছেন স্বজনরা।
আইসিডিডিআরবির ঢাকা হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিজ্ঞানী ডা. লুবাবা শাহরিন বলেন, ‘এখন বেশি রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত, যা ৫ থেকে ৭ দিনে সেরে ওঠে। এই সময় পর্যন্ত মায়েদের ধৈর্য ধরতে হবে। পরিমাণ মতো স্যালাইন খাওয়াতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত স্যালাইন খাওয়ানো যাবে না। অনেক বেশি বাথরুম করলেও বেশি স্যালাইন খাওয়ানো যাবে না। বয়স অনুযায়ী যত কেজি ওজন তত চামচ করে খাওয়াতে হবে। চামচ দিয়ে খাওয়াতে হবে। অনেকেই ফিডারে করে দুধের মতো করে স্যালাইন খাওয়ান। এটা কোনোভাবেই করা যাবে না।’
ডায়রিয়া প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিশুদ্ধ পানি পান করাতে হবে। সে জন্য পানি ফুটানোর সময়, বলক ওঠার পর আরও ৫ মিনিট চুলায় রাখতে হবে। তারপর ঠাণ্ডা করে পান করাতে হবে। ফুটানোর ব্যবস্থা না থাকলে প্রতি ৩ লিটার পানিতে একটি বিশুদ্ধকরণ ক্লোরিন ট্যাবলেট দিয়ে পানি বিশুদ্ধ করে নিতে হবে। রাস্তার পাশের অস্বাস্থ্যকর ও খোলা খাবার খাওয়া যাবে না। খাবার আগে ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান পানি দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। পায়খানা করার পর অথবা শিশুর পায়খানা পরিষ্কার করার পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে হবে। ফিডারে শিশুকে কিছু খাওয়ানো যাবে না। তরল খাওয়ানোর জন্য বাটি ও চামচ ব্যবহার করতে হবে।’
বয়স অনুযায়ী স্যালাইন খাওয়ানো নিয়ম
এক প্যাকেট স্যালাইন আধা লিটার পানিতে মিশাতে হবে। ১০ বছরের বেশি বয়সীদের প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর এক গ্লাস অর্থাৎ ২৫০ মিলিলিটার খাওয়াতে হবে। শিশুদের প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর শিশুর যত কেজি ওজন তত চা চামচ পরিমাণ স্যালাইন খাওয়াতে হবে। শিশু বমি করলে ধীরে ধীরে খাওয়াতে হবে, যেমন ৩-৪ মিনিট পর পর এক চামচ করে দিতে হবে।
জিংক ট্যাবলেট
৬ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুকে প্রতিদিন ১টি করে জিংক ট্যাবলেট পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন খাওয়াতে হবে। জিংক ট্যাবলেট ডায়রিয়া রোগজনিত জটিলতা কমাবে এবং পরবর্তী সময় শিশুর ডায়রিয়া হওয়া প্রতিরোধ করবে।
ডায়রিয়া রোগীর খাবার
খাওয়ার স্যালাইনের পাশাপাশি ২ বছর বয়সের নিচের শিশু অবশ্যই মায়ের বুকের দুধ খাবে। ৬ মাসের বেশি বয়সী শিশু খাওয়ার স্যালাইনের পাশাপাশি বাসায় রান্না করা সব ধরনের খাবার খাবে। যেমন ভাত, ডাল, মাছ, মুরগি। রোগীকে খাওয়ার স্যালাইনের পাশাপাশি বেশি বেশি তরল খাবার যেমন ডাবের পানি, চিড়ার পানি, স্যুপ ইত্যাদি খাওয়াতে হবে। রোগীকে কোমল পানীয়, ফলের জুস, আঙুর, বেদানা খাওয়ানো যাবে না।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবে
জ্বর ১০১ বা তার বেশি হলে, রক্ত মিশ্রিত পায়খানা, খিঁচুনি, শরীর খুব দুর্বল হয়ে নেতিয়ে পড়লে, ঘাড় ছেড়ে দিলে, শ্বাস কষ্ট, বারবার বমি হলে, খেলাধুলা না করলে, কিছু খেতে না পারলে অথবা প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম হলে দ্রত হাসপাতাল/স্বাস্থ্যকেন্দ্র/ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।