‘দইয়ের হাঁড়িতে দই থাক, ঘিয়ের হাঁড়িতে ঘি’। ঢাকা মহানগরের সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা (ব্যাটারিচালিত রিকশা) চলবে কি না প্রশ্নের যেন এই সমাধান। অর্থাৎ ব্যাটারিচালিত রিকশা যেভাবে চলে আসছে চলুক, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও রিকশার (প্যাডেলচালিত) মালিক বা চালকদের মুখোমুখি করে দেওয়ার দরকার নেই। কারণ এসব নিয়ে যেকোনো পক্ষের আন্দোলন আবার সরকারকেই মোকাবিলা করতে হয়।
প্যাডেলচালিত রিকশার আইনি অনুমোদন থাকলেও ব্যাটারিচালিত রিকশার তা নেই। তবে মেট্রোরেলের শহরে দ্রুতগতির ব্যাটারিচালিত রিকশার চাহিদাও আছে, আবার আছে ঝুঁকিও। যদিও আইনিগতভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে পারবে কি না, সেই সমাধান এখনই আসছে না। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার পর এককথায় বলা যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশার আইনি সমাধান চলছে ধীরগতিতে!
ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধ বা চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। হাইকোর্টের ওই নির্দেশের ওপর এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। পাশাপাশি এই সময়ের মধ্যে এ-সংক্রান্ত রুল হাইকোর্টে নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত চেয়ে সরকারপক্ষের করা এক আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ২৫ নভেম্বর চেম্বার আদালত ওই আদেশ দেন। ঢাকা মহানগরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধ বা বিধিনিষেধ আরোপে নিষ্ক্রিয়তা চ্যালেঞ্জ করে বৃহত্তর ঢাকা সিটি করপোরেশন রিকশা মালিক জোটের সভাপতি জহিরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মো. মোমিন আলী রিটটি করেন। আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী তাহসিনা তাসনিম।
জানতে চাইলে আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘রুল শুনানির জন্য হাইকোর্টের একই বেঞ্চে আবেদন করেছি। আশা করছি, চূড়ান্ত শুনানির জন্য আদালত আগামী সপ্তাহে দিন ধার্য করবেন।’
গত ২৫ নভেম্বর এক মাসের স্থিতাবস্থা দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। এরপর দেড় মাস পেরিয়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে মো. মোমিন আলী বলেন, ‘আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা ছিল এক মাসের জন্য। ওই সময় পেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে আমরা ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের আবেদন নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে গিয়েছিলাম। পুলিশ প্রশাসন, ট্রাফিক পুলিশ, বিদ্যুৎ বিভাগ ও সিটি করপোরেশনসহ আমাদের মামলার ১২ বিবাদীর সবার কাছে গিয়েছি। কিন্তু আসলে কেউই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে আগে যে চাঁদাবাজি ছিল, এখনো তা আছে, তাই চাঁদাবাজরাও চায় না যে এটা বন্ধ হোক। তারা বরং ব্যাটারিচালিত রিকশার পক্ষে আন্দোলনে নামে। প্রশাসনও আন্দোলনের করণে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সিইওর কাছে গিয়েছিলাম। তিনি বলছেন, আমরা তো আছি আসলে অস্থায়ীভাবে (নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই)। এসব ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিতে গেলে মিছিল-মিটিং হয়। সেসব সামাল দেওয়া যায় না। ডিএমপির ট্রাফিকের প্রধানের কাছে গেলাম। তিনিও বলছেন, আদালত থেকে আইনি বিষয় আগে শেষ হোক। পরে দেখি কী করা যায়।’
ব্যাটারিচালিত রিকশা প্যাডেল রিকশার চেয়ে দ্রুতগতিতে চলে, ভাড়া তুলনামূলক কম। অনেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা এড়িয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। এটা পরিবেশবান্ধব- এসব ইতিবাচক দিকের কথাও অনেকে বলেন। এসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে মো. মোমিন আলী বলেন, ‘প্রতিক্রিয়া-মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকবেই।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ বশিরুল হক ভূঁঞা বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কি সিটি করপোরেশনের একার কাজ? যা করার সবাই মিলে করতে হবে।’
সিটি করপোরেশন ‘সবাই’কে আহ্বান জানিয়েছে কি না বা অংশীজনের কেউ সিটি করপোরেশনকে আহ্বান জানিয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এখন রুটিন দায়িত্ব পালন করছি। কয়েক দিন হয় মাত্র এই দায়িত্বে এসেছি। এটা আমার অতিরিক্ত দায়িত্ব। এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না ঠিক বলতে পারছি না।’
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. সরওয়ার বলেন, ‘এটি চলুক তা আমরাও চাই না। তবে আমরা খুব ধীরে পদক্ষেপ নিচ্ছি। বড় অ্যাকশন নিলে তারা আবার আন্দোলন করেন। আমরা যেখানে এই রিকশার ব্যাটারি উৎপাদন বা মজুত হয়, সেখানে অভিযান চালাব। সব পদক্ষেপই কিন্তু বুঝেশুনে নেব। তবে এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।’
ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাপারে ইতিবাচক কথাবার্তাও আছে মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘ঝুঁকি এবং ইতিবাচক দিক ভেবে এটি চলবে কি চলবে না সে সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারণী জায়গা থেকে আসবে। আমরা কেবল বিদ্যমান আইনে যা আছে তা কার্যকর করব। পরবর্তী সময়ে আইন পরিবর্তন হলে তখন সে অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আমাদের বিদ্যমান আইনেই চলতে হবে।’
সারা দেশের প্রধান সড়ক এবং ফ্লাইওভারগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। গত ২১ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান জনস্বার্থে এ নোটিশ পাঠান। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে এই নোটিশ পাঠানো হয়।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সারা দেশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের ফলে সড়কের স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু-হতাহতের মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে। এ বিষয়ে সরকার-সংশ্লিষ্টদের একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে নোটিশের কোনো জবাব বা কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। আমরা আর কিছুদিন অপেক্ষা করব। এরপরও সরকার থেকে কোনো সদুত্তর না পেলে প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হব।’