এক দশক আগে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি মহিষের জীবনরহস্য (জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচনের ঘোষণা দেয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাল তীর লাইভস্টক ডেভেলপমেন্ট (বিডি) লিমিটেড। দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর রয়েছে নানা অর্জন। তবে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের সুনাম বৃদ্ধিতে অবদান রাখার নজির খুব বেশি নয়। নগণ্য সংখ্যক এসব অবদানের একটি হচ্ছে মহিষের জীবনরহস্য উন্মোচন।
চীনের বেইজিং জিনোম ইনস্টিটিউটের (বিজেআই) সহায়তায় এই সফলতা পান বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। আজ শুক্রবার এই অর্জনের দশক পেরোনোর দিনকে সামনে রেখে জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার দৈনিক খবরের কাগজকে মাল্টিমোড গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান লাল তীর লাইভস্টক ডেভেলপমেন্ট (বিডি) লিমিটেডের কর্ণধার আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, মহিষের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে আমাদের প্রতিষ্ঠান ঠিকই। তবে এর যে সম্ভাবনা, তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে, উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজন বহুমুখী প্রচেষ্টা।
মহিষের জীবনরহস্য উন্মোচনের পর এক দশক পার হয়েছে। এর মধ্যে এই জ্ঞান কতখানি কাজে লাগানো গেল প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটাকে আমরা বলি জীবন লিপি বা জীবনরহস্য উন্মোচন। এরপর দশ বছর অতিবাহিত হলেও কোভিডের একটা বড় ধাক্কা গেছে। তাছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল পুরোটা সময়। অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে দুটো বিষয়েরই প্রভাব পড়েছে। সব মিলে আমরা এগোতে পারিনি। কাজের অগ্রগতি হয়নি। এটি গবেষণার বিষয়। গবেষণা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই গবেষণা-পরীক্ষণ চলতেই থাকবে। মাঠে আমাদের পরীক্ষণ চলছে, আবার ল্যাবেও গবেষণা কার্যক্রম চলছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা মহিষ নিয়ে সুনির্দিষ্ট তিনটি কাজ করছি। এক, মহিষের মাংসের আঁশ (ফাইবার) চিকন করা, কারণ আমাদের এখানকার মানুষ যেহেতু গরুর মাংস বেশি পছন্দ করে। গরুর মাংসের আঁশ তুলনামূলক চিকন। তাই আমাদের দেশে মানুষ এটা বেশি পছন্দ করে। যদিও বিদেশে এটা (মাংসের আঁশ মোটা বা চিকন) কোনো ইস্যু না। যাই হোক, মহিষের মাংসের আঁশও গরুর মাংসের কাছাকাছি নেওয়ার চেষ্টা করছি। এটা করতে পারলে গরু এবং মহিষের মাংসের মধ্যে খুব একটা তফাৎ থাকবে না। ফলে মাংসের মূল চাহিদার জায়গায় গরুর পাশাপাশি মহিষকেও নিয়ে আসা যাবে। দুই, মাংসের উৎপাদন বাড়ানো। অর্থাৎ মহিষের ওজন যেন তাড়াতাড়ি বাড়ে। তিন, দুধের উৎপাদন বাড়ানো। একই যুক্তি। একটা মহিষে যত বেশি দুধ উৎপাদন হবে, কৃষক তত বেশি মহিষ উৎপাদনে আগ্রহী হবেন।’
দেশে গরুর মাংসে মানুষের আগ্রহ বরাবরই আছে। কিন্তু মহিষের মাংসেও মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। কারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ছে। অনেকের কাছে গরুর মাংস পছন্দের হলেও স্বাস্থ্যগত কারণে খেতে পারছেন না বা কমিয়ে খেতে হয়। কারণ গরুর মাংসে অনেক চর্বি থাকে। হার্টের সমস্যা বা ডায়াবেটিসসহ কিছু রোগ তো আছেই, যেগুলো হলে ডাক্তার গরুর মাংস খেতে নিষেধ করেন বা কমিয়ে খেতে বলেন, কারণ এতে চর্বি বেশি।
মহিষের মাংসের মহৎ গুণ হচ্ছে এতে চর্বি নেই। ওই চর্বিটা চলে যায় দুধে। যে কারণে মহিষের দুধে চর্বি বেশি। যেটা দুধের মূল উপাদান। এর ফলে মহিষের দুধের মান বেশি, দামও বেশি। সবমিলে মহিষের মাংসের এবং দুধের চাহিদা বেড়েই চলছে। সে কারণে দামও বাড়ছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘বিশ্বময় বাজার ধরতে হলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। ভোক্তাদের তথ্য দিয়ে বোঝাতে হবে যে, মহিষের মাংস এবং দুধ তুলনামূলক অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। আবার কৃষককেও তথ্য দিয়ে বোঝাতে হবে যে, এটা বেশি লাভজনক। এই বোঝানোর কাজটা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সবাইকে করতে হবে।’
তথ্য সংযুক্ত করে তিনি বলেন, ‘মহিষের দুধে ফ্যাট বা চর্বির পরিমাণ সাড়ে ৭ থেকে ৯ ভাগ। এ জন্য দুধ সুস্বাদু, একই কারণে বাজার মূল্যও বেশি। যদিও আরও বেশি হওয়া উচিত। মানুষের সচেতনতা বাড়লে দুধের দাম আরও বাড়বে। ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে।’
দুধের প্রধান উপাদান হচ্ছে চর্বি। গরুর দুধে সাধারণত চর্বির অনুপাত থাকে ৪ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ। যেখানে মহিষের দুধে চর্বির অনুপাত থাকে ৮ থেকে ৯ শতাংশ।’
মহিষ আঁশ জাতীয় খাদ্য সহজেই খেয়ে নেয়। গরুর চেয়ে মহিষের রোগবালাই কম, যে কারণে আয়ুষ্কাল বেশি। গরুর সঙ্গে মহিষ পালন করলে খাবারের অপচয় কম হয়। কারণ গরুর উচ্ছিষ্ট খাবারও মহিষ খেয়ে নেয়। নদী, পুকুর বা ডোবা পানি ছাড়াও সব পরিবেশে মহিষ পালন করা যায়। বিষয়গুলো চাষিদের বোঝাতে হবে। গরুর চেয়ে মহিষের হজমশক্তি ২৭ শতাংশ বেশি। মানে যা খায় হজম হয়ে যায়।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘জন্মের সময় আমাদের খামারে (লাল তীর) একটা মহিষ বাছুরের ওজন হয় ৫১-৫২ কেজি। সেখানে দেশি মহিষের বাছুরের ওজন হয় গড়ে মাত্র ২৭-২৮ কেজি। তার মানে শুরুতেই ৫০ শতাংশের মতো বা ২৫ কেজি বেশি। ১২ মাসে আমাদের খামারের মহিষের ওজন ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি হয়। একই সময়ে দেশি মহিষের ওজন হয় মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ কেজি। গরুর ৮–৯টা রোগ হয়, মহিষের রোগ হয় ২-৩টা। আর দুধের কথা যদি বলি আমাদের গাভি মহিষ দৈনিক দুধ দেয় ৮ থেকে ১৪ লিটার, অথচ দেশি গাভি মহিষ দুধ দেয় মাত্র এক থেকে দুই লিটার।’
মহিষের দুধের বাজার প্রশ্নে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে খাবারের মানও বাড়ছে। মানুষের বাটার খাওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু বাটার আসবে কোত্থেকে? বাটারের একমাত্র উৎসতো হচ্ছে দুধের চর্বি। গরুর দুধে চর্বি হয় ৪ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ। দুধ পানের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হচ্ছে, দুধে সাড়ে ৩ শতাংশ চর্বি থাকতে হবে। তাহলে গরুর দুধের মান ঠিক রেখে পানের পর সেখান থেকে বাটারের জন্য চর্বি সংগ্রহ করা আর কতটুকু সম্ভব। কিন্তু মহিষের দুধে তো ৮ থেকে ৯ শতাংশ চর্বি। তার মানে বাটার তৈরির জন্য মহিষের দুধ থেকে অনেক চর্বি সরানো যাবে।’
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দুধ উৎপাদনকারী দেশ ভারত। তাদের ৭৩ শতাংশ দুধই সংগ্রহ হয় মহিষ থেকে। এসব মহিষের বেশির ভাগই পালন হয় গৃহস্থের ঘরে। যেখানে নারীরাই শ্রম দেন বেশি। ঘরে ঘরে দুই-চারটা করে মহিষ পালন করেন তারা।’
মহিষের জীবনরহস্য উন্মোচন-জ্ঞান কাজে লাগাতে সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগ-আগ্রহ প্রশ্নে লাল তীরের এই শীর্ষ ব্যক্তিত্ব বলেন, ‘সরকারি কোনো পদক্ষেপ তো দেখছি না। দেশের সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেই কিন্তু আমাদের এমওইউ আছে। কারও মধ্যেই কিন্তু তেমন আগ্রহ দেখছি না!’