ঢাকার সাভারে গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় কাজ করতেন বিপ্লব হোসেন (২৩)। থাকতেন সাভারের নামাবাজার কাঠপট্টি এলাকায় পরিবারের সঙ্গে। বাবা বাবু শেখ পেশায় একজন দিনমজুর। সংসারের অভাব বা দারিদ্র্য দূর করার জন্য বিদেশে (উজবেকিস্তান) যাওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। বহু কষ্টে চার লাখ টাকা জোগাড় করে দালাল ও এজেন্সির হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাতে তার বিদেশে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু কথামতো চাকরি বা কাজ মেলেনি। উজবেকিস্তানে উচ্চ বেতনে কোম্পানির চাকরির কথা বলে তাকে তুলে দেওয়া হয় ট্যুরিস্ট ভিসায় ভিয়েতনামের ফ্লাইটে। ভিয়েতনামে যাওয়ার পর গত ছয় মাস ধরে বিপ্লব কখনো পাহাড়ের চূড়ায় আত্মগোপনে, কখনো আবার পথেঘাটে ভবঘুরের মতো জীবন কাটাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, করুণ এই পরিস্থিতির শিকার কেবল বিপ্লব হোসেন একা নন, বর্তমানে তার সঙ্গে মোট চারজন একইভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তবে ছয় মাস আগে ভিয়েতনামে গিয়ে বাংলাদেশি আরও এমন ৪০ জন ভুক্তভোগী একসঙ্গে অনেকটা বন্দির মতো ছিলেন। পরে ছোট গ্রুপে তাদের আলাদা করে বিভিন্ন এলাকায় রাখা হয়। বিপ্লবসহ মোট চারজন ভুক্তভোগী বর্তমানে ভিয়েতনামের ‘হো চি মিন সিটি’ বা সায়গন নামক অঞ্চলে আত্মগোপন লুকিয়ে চলাফেরা করছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
তাদের স্বজনদের সহায়তায় গতকাল খবরের কাগজের পক্ষ থেকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয় ভুক্তভোগী বিপ্লব হোসেন, মো. মিন্টু খান, মো. রাব্বানী শেখ ও নাঈম হাওলাদারের সঙ্গে। তারা খবরের কাগজকে বলেন, “আলাদা ফ্লাইটে বাংলাদেশ থেকে পাচারের পর ভিয়েতনামে ৪০ জন বাংলাদেশিকে একসঙ্গেই অনেকটা বন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল। যাদের প্রায় সবাইকেই উজবেকিস্তানের চাকরির প্রলোভন দেওয়া হয়। এই চক্রের বাংলাদেশি সদস্য সজীব ভিয়েতনামে আমাদের বিমানবন্দরে ‘রিসিভ’ করে। পরে চক্রের দেশি-বিদেশি সদস্যরা সেখান থেকে আমাদের ছোট ছোট গ্রুপে আলাদা করে বিভিন্ন স্থানে রাখে। এরপর আমরা কয়েকজন পালিয়ে একটি পাহাড়ের চূড়ায় আত্মগোপন করে থাকি। পরে খাবারের জন্য বাইরে গিয়ে বিভিন্ন দোকান ও কারখানায় কাজ চাইলেও ভিসা জটিলতায় কেউ কাজ দিচ্ছিলেন না। কেউ কেউ কোনোমতে শুধু খাবারের বিনিময়ে কাজ করান। একপর্যায়ে দেশটির পুলিশের ভয়ে আমরা এলাকা পরিবর্তন করি। পরে আবার সেই চক্রের হাতে ধরা পড়লে আমাদের চারজনকে একটি কারখানায় অনেকটা বন্দি রাখা হয়। আমাদের কাজের বিনিময়ে শুধু তিন বেলা খাবার দেওয়া হয়। কারখানার সীমানার বাইরেও যেতে হওয়া না। সেখানে সরকারি ছুটি বা উৎসবের দিনেও বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। তারপরও বিভিন্ন কৌশলে লুকিয়ে বাইরে গিয়ে দেশে ফেরার সাহায্য-সহযোগিতা চেয়েছি, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছেন না।”
ভুক্তভোগী বিপ্লব হোসেন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে খবরের কাগজকে অভিযোগ করে বলেন, ‘পুরানা পল্টনের বায়তুল খায়ের ভবনের ষষ্ঠ তলার জয় ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের মালিক (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) জাফর ইকবাল এবং অষ্টম তলার মেসার্স মিথিলা এয়ার ইন্টারন্যাশনালের ওভারসিস ম্যানেজার দুলাল মিয়ার যোগসাজশে আমিসহ এ রকম আরও অনেকেই পাচারের শিকার হয়েছি। আমাকে গত বছরের ২৮ জুলাই এক ফ্লাইটে উজবেকিস্তানের কথা বলে ভিয়েতনামে পাঠায় ওই চক্র। ঢাকার বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে ডলারসংকট হওয়ায় দুলালের লোক এসে ৫০০ ডলার দিয়ে ইমিগ্রেশন পার করিয়েছিলেন। এরপর ভিয়েতনামে বিমানবন্দর থেকে গেটে বের হতেই আগে থেকে অপেক্ষমাণ ওই চক্রের সদস্য সজীব (বাড়ি নোয়াখালী বা ফেনী) সেই ডলারগুলো আমার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। এরপর আমরা ভিয়েতনামে কেন- সে প্রশ্ন করলে তারা নানান উদ্ভট ব্যাখা দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়। এরপর এমন এক জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে অন্তত এমন ৪০ জন ছিলাম। মূলত ওই চক্র বিভিন্ন কোম্পানিতে আমাদের দিয়ে কাজ করিয়ে সেই কাজের বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ তারা নিত। আমরা শুধু খাবার পেতাম। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ বা কথা বললে নির্যাতন করা হয়। আমাদের কারাগারে পাঠানো বা মেরে ফেলার হুমকি দেয় চক্রের সদস্যরা।’
ভুক্তভোগী বিপ্লবের ছোট ভাই সাভারে বসবাসকারী আতিকুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘মেডিকেল পরীক্ষার সময়ও ফরমে উজবেকিস্তানের কথা উল্লেখ ছিল। অন্যান্য সব প্রক্রিয়ায় একই কথা বলা হয়। অথচ সাধারণ ট্যুরিস্ট ভিসায় তিন মাসের মেয়াদে আমার ভাইকে ভিয়েতনামে পাঠিয়েছে ওই প্রতারক চক্র। এখন দেশে ফেরত নিয়ে আসতেও ভিয়েতনাম কর্তৃপক্ষকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা দিতে বলছে। সেই টাকা আমরা কোথায় পাব? ওদিকে আমার ভাই ভিয়েতনামে শুধু তিন বেলা খাবারের বিনিময়ে বিভিন্ন স্থানে কাজ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’
আতিকুর বলেন, ‘সাভারের আরপাড়া এলাকার মো. শহিদ হোসেন নামে একজনের (দালাল) মাধ্যমে পুরানা পল্টনের জয় ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের মালিক জাফর ইকবালের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়েছিল। বর্তমানে এজেন্সি বা দালাল শফিকের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তারা আমাদের ফোন ব্লক করে দিয়েছে। আর এজেন্সির মালিক জাফর উল্টো হুমকি দিয়েছেন।’
ভিয়েতনামে বিপ্লবের সঙ্গে অবস্থান করা নরসিংদীর মাধবদীর বাসিন্দা ভুক্তভোগী মো. মিন্টু খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভিয়েতনামের দালালরা আমাদের বিচ্ছিন্ন করার পর ‘হো চি মিন সিটি’ এলাকায় আমরা একসঙ্গে ৯ জন ছিলাম। এর মধ্যে পাঁচজনের পরিবার দালাল ও এজেন্সিকে চাপ দিলে তাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু আমরা এখানে এখনো বন্দির মতো, কখনো ভবঘুরের মতো মানবেতর জীবনযাপন করছি। আমিসহ অনেকে দুলালের মাধ্যমে বিদেশে এসে বিপদে পড়েছি। আমরা অসহায় বলে এখন আমাদের পাশেও কেউ নেই।’
ভিয়েতনামে থাকা অপর দুই ভুক্তভোগী বাগেরহাট সদরের নাঈম হাওলাদার ও একই জেলার ফকিরহাটের শুভদিয়া ইউনিয়নের রাব্বানী শেখ খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতারণার মাধ্যমে আমাদের তিন মাসের মেয়াদে ট্যুরিস্ট ভিসা দিয়ে ভিয়েতনামে পাঠানো হয়েছিল। সেই মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন বাইরে সেভাবে যেতেও পারি না। পালিয়ে বা বন্দির মতো সময় পার করতে হচ্ছে।’
এসব অভিযোগ সম্পর্কে পুরানা পল্টনের মিথিলা এয়ার ইন্টারন্যাশনালের ‘ওভারসিস ম্যানেজার’ মো. দুলাল মিয়ার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে কথা হয়েছে অভিযোগ ওঠা অপরজন জয় ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জাফর ইকবালের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কেবল বিপ্লব আমার প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন। অন্যদের বিষয়ে আমি সেভাবে জড়িত নই, অন্যরা আমার পাশের প্রতিষ্ঠান ইয়োলো ট্রাভেলসের আনোয়ারের মাধ্যমে বিদেশে গেছেন। আমি নিজেও বিপ্লবকে আনোয়ারের মাধ্যমেই পাঠিয়েছি। তা ছাড়া ট্যুরিস্ট ভিসাতেই তারা ভিয়েতনামে যেতে রাজি হওয়ায় সেখানে পাঠানো হয়। সেখানে তারা এখন কাজও করছেন।’
ভিয়েতনামে ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানোর জন্য চার লাখ টাকা নেওয়া হয় কোন যুক্তিতে এমন প্রশ্নে জাফর ইকবাল বলেন, ‘চার লাখ টাকা আমি নিইনি। আমি ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। বাকি টাকা শহিদ নামে এক এজেন্ট খেয়েছেন। শহিদের মাধ্যমে বিপ্লব আমার কাছে এসেছিলেন। ভিয়েতনামে আমরা ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠালেও দুই-আড়াই লাখ টাকা নিয়ে থাকি।’