ঢাকার মোহাম্মদপুর যেন অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ভয়ংকর রূপে দেখা দিয়েছে এলাকার কিশোর গ্যাংগুলো। নিয়মিত ছিনতাই করতে ওই এলাকায় টার্গেট করে গলিপথে রেকি করে গ্যাংগুলোর সন্ত্রাসীরা। ভীতি ছড়াতে প্রকাশ্যে কালো পোশাক পরে ও অস্ত্র হাতে নিয়ে গ্রুপভিত্তিক মহড়া দেয় তারা। এভাবে তারা দিনে-রাতে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র হাতে স্থানীয়দের জিম্মি করে বা কুপিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে। তারা বর্তমানে এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে যৌথ বাহিনীর অভিযানকেও প্রতিহত করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।
গত বুধবার গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় যৌথ বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে কিশোর গ্যাংয়ের দুই সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ছিনতাইয়ের প্রস্তুতির গোপন সংবাদে যৌথ বাহিনী সেখানে অভিযানে গেলে কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসীরা বাসাবাড়ির ছাদ বা ছাউনিতে অবস্থান নিয়ে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। আত্মরক্ষায় যৌথ বাহিনীও পাল্টা পদক্ষেপ নিলে সেখানে দুজন নিহত হয়। নিহতরা এলাকার চিহ্নিত কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী। মোহাম্মদপুরে বেশ কয়েকবার যৌথ বাহিনীর অভিযান চললেও সন্ত্রাসীদের ওপর গুলিবর্ষণ বা প্রাণহানির ঘটনা এই প্রথম।
সরেজমিন গেলে স্থানীয়রা খবরের কাগজকে জানান, সেনাবাহিনীর ক্যাম্প বসানোর পর প্রথম দুই মাসে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কিছুটা কমলেও গত দুই মাসে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাংয়ের আনাগোনা আবারও বেড়েছে। চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যান, বছিলা বেড়িবাঁধ, আদাবর, জেনেভা ক্যাম্প, নবোদয় হাউজিংসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য আবারও বেড়েছে কয়েক গুণ। সবচেয়ে বেশি সক্রিয় কিশোর গ্যাংগুলোর সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) চাঁদ উদ্যানের লাউবাজার এলাকার ৬ নম্বর রোডে গিয়ে দেখা যায়, এ রোডের একটি দোতলা টিনশেড বাড়িতে এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এ এলাকায় এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। যৌথ বাহিনীর টহল অব্যাহত থাকলেও মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফেরেনি।
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, দিনে-রাতে বিশেষ ধরনের কালো পোশাক পরে ২০ থেকে ২৫ জনের গ্রুপ মিলে বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রসহ মহড়া দেয়। তাদের উদ্দেশ্য আধিপত্য বিস্তার করে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি করা।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, যতদিন ‘ডেভিলরা’ (শয়তান) থাকবে, ততদিন যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান ‘ডেভিল হান্ট’ চলবে। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ অভিযান চলছে।
বৃহস্পতিবার অপারেশনে অংশ নেওয়া মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘চাঁদ উদ্যানের ঘটনা ছিল নিয়মিত অভিযানের অংশ। গোলাগুলির ঘটনায় জুম্মান ও মিরাজ নামে দুই সন্ত্রাসী মারা গেছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার পতনের পর মোহাম্মদপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেশ অবনতি হয়। তবে নিয়মিত অভিযানে সন্ত্রাসীদের অপরাধমূলক কার্যক্রম অনেক কমে এসেছে। মোহাম্মদপুর থানায় গত এক মাসে ১০৭টির মতো মামলা হয়েছে ও গ্রেপ্তার হয়েছে ৬০০। বেশির ভাগই চুরি, ছিনতাই, কোপাকুপির ঘটনা।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘মোহাম্মদপুরজুড়ে প্রায় ৫০টির মতো বস্তি রয়েছে। বস্তিগুলো মোহাম্মদপুরের বিষফোঁড়া। এসব বস্তির কারণে অপরাধ বাড়ছে। তবে আমরাও থেমে নেই। পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।’
মোহাম্মদপুরে আতঙ্ক
সরেজমিন মোহাম্মদপুরের ওই এলাকায় গিয়ে জানা যায়, গোলাগুলিতে দুই সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার পর চাঁদ উদ্যানসহ মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ এক রকম ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
এলাকাবাসী আরও জানান, যৌথ বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির আগে কিশোর গ্যাংসহ সন্ত্রাসীরা চাঁদ উদ্যানের লাউবাজার এলাকায় একটি গলির মধ্যে অবস্থান করে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কোনো একটি সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করার আগে সন্ত্রাসীরা এ ধরনের রেকি করে থাকে। বেশ কিছুদিন ধরে এ ধরনের ঘটনা চলতে থাকায় এলাকাবাসী সেনাক্যাম্পে খবর দেন। সংবাদ পেয়ে যৌথ বাহিনী সেখানে অপারেশনে যায়। তারা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এ সময় সন্ত্রাসীরা বাঁচার জন্য একটি টিনশেড দোতলা বাড়ির ছাদে অবস্থান নেয় ও যৌথ বাহিনীর ওপর বৃষ্টির মতো গুলি চালাতে থাকে। আত্মরক্ষার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাল্টা গুলি চালালে দুই সন্ত্রাসী নিহত হয়।
ঘটনাস্থলের মুদি দোকানদার কামাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘এলাকার অবস্থা ভালো না। সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংগুলোর তাণ্ডব বেড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে হঠাৎ ২০ জন কম বয়সী ছেলে আমাদের দোকানে আসে। তাদের একজন আমার গলায় চাপাতি ধরে ভয় দেখায়। এ সময় ক্যাশের টাকা ও মালামাল নিয়ে চলে যায়। আমরা খুব ভয়ের মধ্যে থাকি। এখন তাদের আসতে দেখলে দোকান বন্ধ করে দিই।’
এই এলাকার বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, ‘২০ থেকে ২৫ জন সন্ত্রাসী কালো পোশাক পরে দল বেঁধে আসে। তাদের হাতে সব সময় চাপাতি, ছুরি, রামদা থাকে। এ ছাড়া পিস্তলও নিয়ে আসে তারা। যখন আসে তখন অস্ত্রের ঝনঝনানির শব্দ পাওয়া যায়। অনেক সময় তারা ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এসব করে তারা এলাকায় মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি তৈরির চেষ্টা করে। ওই নারী আরও জানান, দল বেঁধে হেঁটে আসার সময় তারা মানুষের হাত থেকে জোর করে মোবাইল, টাকার ব্যাগ ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়।’
রহিমা আরও বলেন, ‘বাচ্চারা স্কুলে গেলে সঙ্গে নিয়ে যাই। যে দিনকাল পড়ছে, বিশেষ কাজ ছাড়া বাইরে যাই না। রাতের বেলায় মোটেই না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে নিরাপত্তা চাই। ভয় ছাড়া বাঁচতে চাই।’
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী টিনশেড বাড়িটির ম্যানেজার জুলহাস খবরের কাগজকে জানান, গুলিতে জুম্মান ও মিরাজ নিহত হওয়ায় তারা খুশি। তারা এই এলাকার মানুষের বিভিন্নভাবে অত্যাচার করত। এ ছাড়া ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, কোপাকুপি তাদের নিত্যদিনের ঘটনা ছিল।
তিনি বলেন, ‘রাতে গোলাগুলির শব্দ শুনে ঘর থেকে বের হই। বের হয়ে দেখি টিনশেড দোতলায় বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছে। ১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গোলাগুলির পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় যৌথ বাহিনী। গুলির শব্দ থামার পর ওপরে গিয়ে দেখি দুজন মারা গেছে।’ তিনি বলেন, ‘এভাবে চলতে পারে না। আমরা নিরাপত্তা চাই।’
সন্ত্রাসীরা ভবনের ছাদ থেকে গুলি চালায়: আইএসপিআর
ঢাকার মোহাম্মদপুরে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুজন নিহত হওয়ার বিষয়ে অভিযানের ব্যাখ্যা দিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বিজ্ঞপ্তিতে আইএসপিআর জানিয়েছে, ঢাকার মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার দিবাগত গভীর রাতে যৌথ বাহিনীর একটি টিম ঘটনাস্থলে অভিযান চালায়। এই অভিযানের সময় যৌথ বাহিনীর সদস্যরা একটি গলির দুই পাশে ঘেরাও করলে সন্ত্রাসীরা একটি একতলা ভবনের ছাদ থেকে আভিযানিক দলটির ওপর অতর্কিত গুলি চালায়। এ অবস্থায় আভিযানিক দলটি আত্মরক্ষার্থে তৎক্ষণাৎ পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং পাঁচ সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করতে সক্ষম হয়। পরে বাড়িটিতে তল্লাশি চালিয়ে ছাদের ওপর থেকে দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে।
আইএসপিআর জানিয়েছে, আটককৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি এবং একটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মোহাম্মদপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার্থে এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে আইএসপিআর।
চাঁদ উদ্যানে বসে মাদকের হাট
সরেজমিন আরও দেখা যায়, এই চাঁদ উদ্যানের ৪০ ফুট রাস্তার পাশেই রয়েছে বিশাল খাল। এই খালের চারপাশে রয়েছে সরু রাস্তা ও প্রচুর গাছপালা। চাঁদ উদ্যানের বাসিন্দা জাফর খবরের কাগজকে বলেন, এই জঙ্গলকে কেন্দ্র করে এ এলাকায় সন্ত্রাসীদের সব ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছে। সন্ধ্যার পর এই এলাকায় চলাফেরা করা যায় না। রাতের আঁধারে এই জঙ্গলে বসে মাদকের হাট। মাদক বেচাকেনা থেকে শুরু করে টাকার ভাগাভাগি সবই হয় এখানে। এ ছাড়া অপরাধীদের গোপন বৈঠকও হয়ে থাকে এই জঙ্গলে।
৫ আগস্টের পর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মোহাম্মদপুরে একাধিক স্থানে সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এরপর এই এলাকায় যৌথ বাহিনীর দফায় দফায় অভিযানে অনেক সন্ত্রাসী গা ঢাকা দিলেও এখন আবার কিশোর গ্যাংসহ সন্ত্রাসীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই ঘটছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কোপাকুপির ঘটনা।
এ বিষয়ে গত বুধবার রাতের অভিযানে অংশ নেওয়া যৌথ বাহিনীর একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, মোহাম্মদপুর অপরাধীদের সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে। এই এলাকায় একাধিক বস্তি, সরু গলি, একাধিক উদ্যান, বাগান থাকার কারণে সন্ত্রাসীরা আস্তানা গেড়ে বসেছে। যৌথ বাহিনীর নিয়মিত টহলের কারণে সরকার পতনের পর সন্ত্রাসীরা গা ঢাকা দিলেও সক্রিয় রয়েছে কিশোর গ্যাং। বিভিন্ন নামের একাধিক গ্যাং বাহিনীকে পুরোপুরি দমন করা যায়নি। তারাই এখন এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাংসহ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। এই এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি।’