রোজায় ছোলা, বেগুনসহ নিত্যপণ্যের চাহিদা দ্বিগুণ বাড়ে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ছোলার উৎপাদন খরচ থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের লাভ ধরে ভোক্তাপর্যায়ে এর দাম নির্ধারণ করেছে ৯৮ টাকা কেজি। কিন্তু রাজধানীর কোনো বাজারেই ছোলা ১১০ থেকে ১১৫ টাকার কমে মেলে না। অধিদপ্তর-নির্ধারিত যৌক্তিক দামে বিক্রি হয় না খেসারির ডাল, বেগুন, কাঁচা মরিচ, শসা, পেঁয়াজ, আলু বা অন্য কোনো সবজিই। এ ছাড়া মাছের মধ্যে পাঙাশ, তেলাপিয়া এবং ব্রয়লার মুরগি, সোনালি, দেশি মুরগি, গরুর মাংস থেকে শুরু করে কোনো পণ্যই সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের যৌক্তিক মূল্যে তালিকা মেনে চলে না।
বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে খুচরা পর্যায়ে বিক্রির জন্য কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রতিদিনই ৫৭টি পণ্যের যৌক্তিক মূল্য ঘোষণা করে। তবে বিক্রেতারা অবলীলায় এই নির্দেশনা অমান্য করে ইচ্ছামতো দামে পণ্য বিক্রি করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দাম বেঁধে না দিয়ে বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে। না হলে এই দাম নির্ধারণ ভোক্তাদের কোনো উপকারে লাগবে না।
সরকারের সাবেক সচিব ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সাবেক সভাপতি ড. গোলাম রহমান দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে খবরের কাগজকে বলেন, ‘যাই করা হোক না কেন, পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ না বাড়লে দাম কমবে না। এভাবে যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে লাভ হবে না।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় এই প্রতিষ্ঠান কৃষিপণ্যের দাম উল্লেখ করলেও বাজারে সুফল আসে না। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি আগে থেকেই এভাবে চলে আসছে। তারা এই কাজই করছে। যেহেতু সবকিছুর ব্যাপারে সংস্কারের কথা আসছে। তাই প্রতিষ্ঠানটির সংস্কার করা দরকার। বাজারে প্রভাব পড়ে, এমন করা দরকার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে।’
অর্থনীতিবিদ সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি স্বস্তির জন্য যৌক্তিক পর্যায়ে পণ্যের দাম ঘোষণা করছে। এটা তাদের গতানুগতিক কাজ। বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের ব্যাপারে কোনো সক্ষমতা নেই। সরবরাহের ব্যাপারেও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কাজেই এ কাজের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তাদের দেখা উচিত বাজারে কেন দাম বাড়ছে, কোনো আঁতাত করা হচ্ছে কি না বা বাজার কারা নিয়ন্ত্রণ করছে- এসব।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ও অতিরিক্ত সচিব মো. মাসুদ করিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা ছোলাসহ ৫৭টি পণ্যের উৎপাদন খরচ কত হয় তার সঙ্গে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের লাভ ধরেই ভোক্তাদের স্বার্থে খুচরা পর্যায়ে যৌক্তিক মূল্য উল্লেখ করি। আমাদের উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পণ্যের উৎপাদন খরচের সঙ্গে পাইকারি বাজারের মূল্য ধরা হয়। এর সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের লাভ ধরে যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নিউ মার্কেট, টাউন হল বাজার, মিরপুর-১ ও হাতিরপুল বাজারের মূল্য প্রকাশ করা হয়।’ এক প্রশ্নের উত্তরে এই মহাপরিচালক বলেন, ‘আমরা যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করি বলেই কেউ বেশি দামে কোনো পণ্য বিক্রি করলে জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তর তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের খুচরা পর্যায়ে যৌক্তিক মূল্য এবং ঢাকা মহানগরের বাজারের প্রকৃত খুচরা বাজারদরের তুলনামূলক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ছোলার যৌক্তিক মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ৯৮ টাকা ৩০ পয়সা। কিন্তু বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকায়। খেসারির ডালের দাম ৯২ টাকা ৬১ পয়সা উল্লেখ করা হলেও বাজারে দাম ১২০ টাকা। রমজানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলেও ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, চিনি, আলুর যৌক্তিক মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু এসব পণ্যের মধ্যে খোলা সয়াবিন তেল ১৮০ টাকা লিটার, বোতলজাত ১৭৫ টাকা, সরিষার তেল ২০৭ টাকা, আমদানি করা চিনি ১২৫ টাকা কেজি, দেশি পেঁয়াজ ৫০ টাকা, আলু ২৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যখন যে পণ্যের মৌসুম, তখনই বীজ, সার, শ্রমিকের খরচের সঙ্গে বিক্রেতাদের লাভ ধরে যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করা হয়। এখনো আলু ও পেঁয়াজের মৌসুম শুরু হয়নি। বাজারে যা পাওয়া যাচ্ছে এটা আগাম ফসল। তবে কয়েক দিনের মধ্যে উল্লেখ করা হবে।’
প্রতিবেদনে কাঁচা মরিচের যৌক্তিক মূল্য ৬০ টাকা কেজি বলা হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা। আমদানি করা ১৮০ টাকার আদা ২২০ টাকা, ৪৭ টাকার বেগুন ৬০ টাকা, ২৩ টাকার কাঁচা পেঁপে ৪৫ টাকা, ৪০ টাকার টমেটো ৪০ টাকা, ৩৯ টাকার ফুলকপি ৩০ টাকা, ৩৭ টাকার বাঁধাকপি ৩০ টাকা, ৪৮ টাকার শিম ৬০ টাকা, ১৩০ টাকার (উন্নত) মসুর ডাল ১৪০ টাকা কেজিতে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া পাঙাশ মাছের দর ১৮১ টাকা ঘোষণা করা হলেও বাজারে ২২০ টাকা, ৬৬৮ টাকার গরুর মাংস ৭৫০ টাকা, ১৮০ টাকার ব্রয়লার মুরগি ২১০ টাকা, ২৭০ টাকার সোনালি মুরগি ৩১০ টাকা কেজি, ৩৬ টাকা কলার হালি (চারটি) ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে যৌক্তিক মূল্যের চেয়ে একমাত্র ডিমই কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। ১৪২ টাকা যৌক্তিক মূল্য ঘোষণা করা হলেও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে ১৩০ টাকা ডজনে। সবজি, মাছ, মাংসের মতো চালও মেলে না যৌক্তিক মূল্যে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক কেজি মোটা চালের মূল্য ৪৭ টাকা ঘোষণা করলেও বাজারে ৫৬ টাকা, ৬৮ টাকার জিরাশাইল ৮৫ টাকা, ৪৬ টাকার মাঝারি চাল ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।