ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার একের পর এক উদ্যোগ নিলেও ভেস্তে যাচ্ছে সব। বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্প নিয়ে বিস্তর বৈঠক আর নিরীক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত সেই প্রকল্প যাত্রীদের ভরসা হয়ে উঠতে পারেনি। বাসমালিক সমিতি ও শ্রমিকদের হামলার ঘটনায় ঢাকা নগর পরিবহন সড়কে থাকবে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে যাত্রী মহলে।
এখন ঢাকার সড়কে খেয়াল-খুশিমতো বাস পরিচালনা করছেন বাসমালিকরা। বাসচালকরাও যত্রতত্র বাস থামাচ্ছেন, যাত্রীরা ওঠানামা করছেন ইচ্ছেমতো পয়েন্টে। এতে রাজধানীর সড়কে শুধু বিশৃঙ্খলা নয়, একই সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা।
নতুন পর্বেও ‘ব্যর্থ’ ঢাকা নগর পরিবহন
রাজধানীতে একই রুটের সব বাসকে একটি কোম্পানির আওতায় এনে পরিচালনার উদ্যোগটি বারবার ভেস্তে গেছে। বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পে চলাচল করা ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামের বাসগুলো পরিচালনায় পরিবহন মালিকদের চরম অসহযোগিতা তো আছেই। পাশাপাশি এসব বাস ভাঙচুর ও কাউন্টার তুলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি চাষাঢ়ায় ঢাকা নগর পরিবহনের কাউন্টার তুলে দিতে হুমকি দিয়েছেন স্থানীয় পরিবহন শ্রমিকরা। চাষাঢ়ায় বাস কাউন্টার স্থাপন করতে গেলে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীরা চাঁদা দাবি করেছে বলেও অভিযোগ এসেছে। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের বাসমালিক সমিতির ইন্ধন রয়েছে বলে মনে করেন ডিটিসিএর কর্মকর্তারা। বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, এই নিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় অভিযোগ করা হয়েছে।
রাজধানীর বেশ কয়েকটি রুটে ছয় বছর ধরে ঢাকা নগর পরিবহন নিয়ে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। বারবার ব্যর্থ হয়েও এই প্রকল্প থেকে সরে আসতে চায় না ডিটিসিএ। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক সভায় ডিটিসিএ কর্মকর্তারা আবারও ঢাকা নগর পরিবহনের গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হন। ওই সভার সিদ্ধান্তে রাজধানীর সড়কে আবারও ঢাকা নগর পরিবহনের ব্যানারে ৩৫টি বাস নামানোর সিদ্ধান্ত হয়। ঢাকার গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া পর্যন্ত নতুন এই রুটের সব বাস শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি বাস)। গাবতলী থেকে শুরু করে মিরপুর রোড-শাহবাগ-যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার হয়ে চাষাঢ়া পর্যন্ত চলাচল করছে এই বাসগুলো।
নতুন এ রুট চালু করতে ডিটিসিএ বেসরকারি বাসমালিকদের কাছ থেকে বাস চেয়েছিল। বেশ কয়েকজন মালিক বাস পরিচালনা করতে চাইলেও প্রতিযোগিতার দৌড়ে টিকে যায় বোরাক পরিবহন ও এয়ার টেকনোলজিস। এখন এ দুই পরিবহনের ২০টি বাস চলাচল করছে। আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে আরও ১৫টি বাস সড়কে নামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।
সম্প্রতি ঢাকা নগর পরিবহনের বাসে চাষাঢ়া থেকে গুলিস্তান আসেন এ প্রতিবেদক। নারায়ণগঞ্জের যাত্রীরা বলেন, ঢাকা নগর পরিবহনের বাস তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক ও স্বস্তির। তবে একটি বাস ছেড়ে গেলে অন্য বাসটি ছাড়তে অনেক সময় নেয়। এতে মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট নয়। তবে এই বাস সেবাটি নিয়ে অস্বস্তিও আছে। গাবতলী থেকে চলার কথা থাকলেও ঢাকা নগর পরিবহনের অধিকাংশ বাস চলাচল করছে বায়তুল মোকাররকম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেট থেকে। এ নিয়ে গাবতলী বা মিরপুর রোডের অনেক যাত্রী অভিযোগ করেছেন।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলাচল করা বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির এসি বাসের ভাড়া ৭০ টাকা। কিন্তু ঢাকা নগর পরিবহনের প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৮০ টাকা। যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বির স্বাক্ষরিত এক প্রতিবাদলিপি ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে।
বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের পরিচালক ধ্রুব আলম বলেন, ‘এখন ১৫-১৬টির মতো বাস চলাচল করছে। তবে অধিকাংশ বাস গাবতলীর পরিবর্তে গুলিস্তান থেকে চাষাঢ়া যাচ্ছে। কারণ গুলিস্তান থেকে চাষাঢ়া রুটের যাত্রী বেশি পাওয়া যায়। রুট বিবেচনায় ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে। ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের আপত্তি থাকলে সেটি আমরা আলোচনা করব।’
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা নগর পরিবহনে যেন কেউ বাস যুক্ত না করেন, সে জন্য মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অনেক বেসরকারি বাসমালিককে। তাদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা কখনো এমন নির্দেশ দিইনি। বরং ঢাকা নগর পরিবহনের মাধ্যমে কীভাবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যায়, এ নিয়ে আমরা অনেক পরামর্শ দিচ্ছি। বেসরকারি বাসমালিকরা কীভাবে লাভবান হবেন এই প্রকল্পে, এ জন্য নতুন পদ্ধতি খুঁজতে বলেছি।’
‘গোলাপি রঙের বাস মূলত ধোঁকা’
ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা আনতে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি রাজধানীর বিভিন্ন রুট থেকে আবদুল্লাহপুর বা টঙ্গীগামী বেশ কয়েকটি কোম্পানির বাস গোলাপি রং করা হয়। ঘটা করে উদ্বোধন করে বাসমালিক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এই গোলাপি রঙের বাসগুলো কাউন্টারভিত্তিক চলাচল করবে। রাস্তায় যত্রতত্র দাঁড়াবে না। এতে সড়কে বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বা রেষারেষি বন্ধ হয়ে যাবে।
কিন্তু মাত্র দুই দিন যেতেই বেঁকে বসেন অনেক বাসমালিক। তারা কাউন্টারভিত্তিক বাস চালাতে নারাজি জানান। বাসচালকরা বলেন, ‘তারা যেখানে খুশি সেখানেই বাস থামাবেন, যাত্রী তুলবেন। এক দিন তারা ধর্মঘট করেন। এতে সড়কে যাত্রীরা বিপাকে পড়েন। গোলাপিরঙা বাসগুলোকেও এখন যত্রতত্র যাত্রী তুলতে দেখা যায়।’ মোহাম্মদপুরে অভিজাত পরিবহনের এক যাত্রী বলেন, ‘এই বাসগুলোর সিটের অবস্থা এত জঘন্য। ঠিকমতো পা রেখে বসা যায় না। খালি গোলাপি রং করে নতুন বাসের নাম করে সাধারণ যাত্রীদের ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, ‘গোলাপিরঙা বাসগুলো নিয়ে আমাদের এই উদ্যোগ ভেস্তে গেছে এমনটি বলব না। আমরা বাসমালিকদের নিয়ে বসব। কাউন্টারভিত্তিক বাস পরিচালনা না করলে সড়কে কোনোভাবেই শৃঙ্খলা ফিরবে না। এখন বাসমালিকরা কীভাবে লাভবান হবেন, বাসচালকরা কীভাবে আরও বেশি টাকা আয় করতে পারবেন, সে বিষয়টিও আমাদের আরও বেশি করে ভাবা দরকার।’
আরটিসি সভায় তুমুল হট্টগোল
বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্প নয়, আরটিসি কমিটির অনুমোদন নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি দেশব্যাপী গণপরিবহন পরিচালনা করতে চায়। এ কথা আগেই জানিয়েছিলেন পরিবহন মালিক সমিতির নেতা সাইফুল আলম। গত ২১ জানুয়ারি ডিএমপি কার্যালয়ে ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সভায় সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন তিনি। শুধু তিনি নন, আরটিসি সভায় তুমুল হট্টগোল বাধিয়ে দেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা।
আরটিসি কমিটি গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে উত্তরা, ফার্মগেট ও নাবিস্কো হয়ে গুলিস্তান-বাহাদুর শাহ পার্ক বা গুলিস্তান-সাইনবোর্ড পর্যন্ত একটি মডেল রুটের অনুমোদন দিতে তোড়জোড় শুরু করেছে। এই মডেল রুটে সনদ নতুন করে রুট পারমিট প্রদান, সিলিং বৃদ্ধিসহ বাসমালিকদের নানা দাবি বিশ্লেষণ করতে একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির প্রতিবেদন পেলে এই মডেল রুটের বাসগুলোকে শৃঙ্খলা আনতে নতুন ছক কষবে আরটিসি কমিটি।
তবে তাতে আপত্তি আছে ডিটিসিএর। কেননা, ডিটিসিএকে পাশ কাটিয়ে এই নতুন রুট পারমিট প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ রয়েছে। আরটিসি সভায় ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মোতাছিম বিল্লাহ বলেন, রাস্তার ধারণক্ষমতা বিবেচনা করে বাসের সংখ্যা নির্ধারণ (সিলিং) ও রুট পারমিট অনুমোদন করতে হবে। ডিটিসিএর রুট নেটওয়ার্ক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই কাজটি করতে হবে।
তখন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতা সাইফুল আলম এতে প্রবল আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পে যে ৪২টা রুট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেটা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিকে অবহিত করা হয়নি। আমরা কী এর স্টেকহোল্ডার নই।’
এ প্রসঙ্গে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানি ডিটিসিএ ও ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি হতে রুট অনুমোদন নিয়ে সড়কে গণপরিবহন চালাচ্ছে। দেখা যায়, আগের প্রতিযোগিতা রয়ে গেছে। ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির কোনো রুটের সঙ্গে ডিটিসিএর বাস রুট র্যাশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা পদ্ধতির কোনো রুট মিলে যাওয়ার কারণে ঝামেলার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন পদ্ধতিটি ঠিকমতো কাজ করছে না। গণপরিবহন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বাস রুট র্যাশনালাইজেশন একটি স্ট্যান্ডার্ড পদ্ধতি। কাজেই এ পদ্ধতির মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাস সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি কীভাবে কাজ করবে তা আগে নির্ধারণ করতে হবে।’