ডাউন সিনড্রোম একটি জেনেটিক রোগ। এটি হয় অতিরিক্ত ক্রোমোজোমের কারণে। এতে আক্রান্তদের বয়সের তুলনায় বুদ্ধির বিকাশ অনেক কম হয়। শরীরেও থাকে নানা ধরনের সমস্যা। শারীরিক বৃদ্ধি কম হওয়া, কানে কম শোনা, কথা দেরিতে বলা, বেখেয়ালি, নাক চ্যাপ্টা, চোখের মনি ওপরের দিকে ওঠানো থাকে, হাতের তালুতে একটি রেখা, হাত পা নরম হয়, শিশু অবস্থায় সর্দি লেগেই থাকে। এ ছাড়া অনেকের হার্টের সমস্যা, থাইরয়েডর সমস্যা, রক্তের রোগ, ক্যানসার, নিউমোনিয়া হয়। এসব শিশু দেখলেই বোঝা যায় তারা স্বাভাবিক নয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে এমন রোগী রয়েছে অন্তত দুই লাখ। বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশি বয়সে সন্তান জন্মদানে ডাউন সিনড্রোমের ঝুঁকি বেশি। তাই তাদের পরামর্শ, কম বয়সে সন্তান জন্ম দেওয়ার। তারা বলছেন, ৩০ বছর বয়সের মধ্যে সন্তান ধারণ করলে সেই সন্তানের ডাউন সিনড্রোমের ঝুঁকি কম থাকে।
বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। গর্ভকালীন সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। ৩৫-৪০ বছরের পর গিয়ে সন্তান জন্ম না দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এই বয়সের পর সন্তান জন্ম দিলেই তাদের ডাউন সিনড্রোমের আশঙ্কা থাকে।’
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সানজিদা আহমেদ বলেন, ‘ধারণা করা হয়, দেশে প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে একজনের ডাউন সিনড্রোম। ৩৫ বছরের পর সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে ৩৫০ শিশুর একজনের এবং ৪০ বছরের পর প্রতি ১০০ শিশুর একজনের ডাউন সিনড্রোমের আশঙ্কা থাকে। সবচেয়ে কম আশঙ্কা থাকে ২০ বছরে সন্তান জন্মদানে। ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে সন্তান জন্মদানে ডাউন সিনড্রোমের ঝুঁকি কম থাকে। এ ছাড়া কারও যদি ডাউন সিনড্রোম সন্তান জন্ম নেয়, তারপরের সন্তানদেরও ডাউন সিনড্রোমের ঝুঁকি থাকে।’
তিনি বলেন, ‘ডাউন সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুদের জন্মের পর তিন-চার বছর খুব ভালোভাবে পরিচর্যা করতে হবে। ডাক্তারের ফলোআপে থাকতে হবে। তাহলে জটিলতা অনেকটা কম হয়। যাদের একই সঙ্গে অন্য সমস্যা থাকবে, যেমন থাইরয়েড, হার্টের সমস্যা, রক্তের রোগ, তাদের সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে।’
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেসের (নিনস) পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইয়ামিন শাহরিয়ার চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রায়ই ডাউন সিনড্রোমের রোগী পাই। এসব রোগীর যে সমস্যা বেশি হয়, সেটি হলো তাদের বুদ্ধির বিকাশ কম হয়। শারীরিক অনেক বিষয় শুরুতে চিকিৎসায় অনেকটা স্বাভাবিক করা গেলেও বুদ্ধির দিকটা পুরোপুরি ঠিক হয় না। জন্মের পর চোখ-নাক, কান দেখেই এসব শিশু শনাক্ত করা যায়। তাদের কান ছোট থাকে। নাক চ্যাপ্টা থাকে। হাতের তালুতে একটা রেখা থাকে। আরও কিছু প্যারামিটার আছে। যেগুলো দেখে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হতে পারেন। তারপর পরীক্ষা করা হয়। বারডেম এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার পর কিছু থেরাপি আছে সেগুলো নিয়ে অনেকটা উন্নতি করা যায়। আগের তুলনায় এসব মানুষের গড় আয়ু অনেকটা বেড়েছে। আগে যেখানে তারা ২০-৩০ বছর বাঁচতেন এখন সেখানে ৫০-৫৫ বছর বাঁচে থাকেন।
ক্রোমোজোম-সংক্রান্ত রোগের মধ্যে ডাউন সিনড্রোম প্রথম সারির একটি রোগ। ২০১৩ সালে ডাউন সিনড্রোমের রোগী ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন এবং মৃত্যুবরণ করে ২৭ হাজার জন। যেখানে ১৯৯০ সালে মারা গিয়েছিল ৪৩ হাজার জন।
চিকিৎসকরা জানান, মানুষের শরীরে ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে। ৪৬টি ক্রোমোজমের মধ্যে ২৩টি মায়ের এবং ২৩টি বাবার কাছ থেকে আসে। একটি ক্রোমোজোম বেশি হলে অর্থাৎ ৪৭টি হলেই ডাউন সিনড্রোম হয়। ২১তম ক্রোমোজোমে ট্রিপ্লিকেশন থাকে; যার কারণে ডাউন সিনড্রোম হয়। এ কারণেই ডাউন সিনড্রোমকে ট্রাইসোমি ২১ও বলা হয়।
আজ ২১ মার্চ বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রতিবছর ২১ মার্চ দিবসটি পালিত হয়। ২১তম ক্রোমোজোমের ত্রিভুজের (ট্রাইসোমি) স্বাতন্ত্র্য বোঝাতে ২১ মার্চ (বছরের তৃতীয় মাস) দিনটি বেছে নেওয়া হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১২ সাল থেকে প্রতিবছর এটি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জন ল্যাংডন ডাউন নামে এক ব্রিটিশ ডাক্তার ১৮৬৬ সালে প্রথমবার এ রোগের পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দেন, তাই তার নামে এই রোগের নামকরণ করা হয়।