প্রতিবছরই ঈদের আগে আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজার বা কলমানিতে টাকার চাহিদা বাড়ে। সেই সঙ্গে বাড়ে সুদহারও। তবে চলতি বছর ঈদের আগেও কলমানি বাজারে কোনো উত্তাপ নেই। বাড়েনি সুদহারও। শেষ কার্যদিবসে তা ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশে নেমে গেছে। যা আগের দিন ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। অর্থাৎ কলমানিতে সুদহার আগের চেয়ে কমে গেছে।
সাধারণত ঈদের আগে, ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকা তোলার চাপ অনেক বেশি বাড়ে। ফলে বাড়তি চাহিদা মেটাতে ব্যাংকগুলো একে অপরের কাছ থেকে বাড়তি সুদের বিনিময়ে টাকা ধার করে। সংকটের সময় এক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে, আবার ব্যাংক থেকে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িক সময়ের জন্য টাকা ধার নেয়। সাধারণত এক দিনের জন্য এই ধার দেওয়া-নেওয়া হয়। এই কার্যক্রম যে ব্যবস্থায় সম্পন্ন হয় তা আন্তব্যাংক ‘কলমানি বাজার’ নামে পরিচিত। চলতি মার্চ মাসের ২৬ দিনে প্রায় প্রতিদিনিই গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে কলমানিতে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদ গুনতে হয়েছে ১১ শতাংশ পর্যন্ত। তবে শেষ কার্যদিবসে তা কমে ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশে নেমে যায়।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঠিক তারল্য ব্যবস্থাপনার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এবার তারল্যসংকট হয়নি। ফলে কলমানিতে এবার সুদহার বাড়েনি বরং কমে গেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শতভাগ চাহিদা বাংলাদেশ ব্যাংক পূরণ করেছে। সপ্তাহে এক দিন রেপোর মাধ্যমে ধার দিলেও সেখানে সব ব্যাংকের চাহিদা পূরণ করছি। এ ছাড়া কয়েকটি ব্যাংকে বিশেষ সংকটের কারণে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে এবার কলমানি বাজারে ব্যাংকগুলোর খুব বেশি ধার করতে হয়নি।
যদিও সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ হতে থাকে। এ সময় কয়েকটি ব্যাংকের লাগামহীন দুর্নীতির খবর প্রকাশ হতে থাকলে আমানতকারীরা সেসব ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন। ফলে তারল্যসংকটে পড়ে ব্যাংকগুলো। আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে এসব ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে এই ব্যাংকগুলোকে। অন্যদিকে এসব ব্যাংকের আমানত তুলে গ্রাহকরা ভালো ব্যাংকগুলোতে রেখেছেন। ফলে কিছু ব্যাংকের আমানত কমলেও অধিকাংশ ব্যাংকের আমানত এ সময় বেড়েছে। আর ব্যাংকগুলোতে ভালো আমানত থাকাও কলমানিতে চাপ না বাড়ার একটি বড় কারণ বলে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম।
এই প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘কলমানি বাজারে এবার উত্তাপ না থাকার বড় কারণ হচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে হাত দিচ্ছেন না। ফলে ঋণের চাহিদা কমে গেছে। আর শুরুতে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলেও এখন সেটা কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ অনিয়মের তথ্য প্রকাশিত হলে ব্যাংকগুলোও ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে যাচাই-বাছাই করছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি ভালো আছে। যদিও এই ভালো থাকার কারণটা অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। কারণ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম হলে বিনিয়োগ হবে না, কর্মসংস্থান বাড়বে না, সর্বোপরি অর্থনীতির গতি কমে যাবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমানত প্রবৃদ্ধিও ধীরে ধীরে বাড়ছে। টানা চার মাস পর জানুয়ারিতে ব্যাংক খাতে আমানতে প্রবৃদ্ধি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়ে ৮ শতাংশের ওপরে উঠেছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮১ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। আগের বছর একই সময় যা ছিল ১৬ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ এ সময় আমানত বেড়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। অপর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেসরকারি খাতে ঋণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত ২৫ মার্চ কলমানিতে ২ হাজার ১৩৩.৬২ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে, যার জন্য ৯ দশমিক ৭৫ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হয়েছে। ২৪ মার্চ লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৭৪ কোটি, ২৩ মার্চে ৩ হাজার ৭৫৮ কোটি এবং ২০ মার্চ ৪ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।