অবশেষে সেই ঘোষণা দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ঘোষণা দিয়ে আসছিলেন, পাল্টা শুল্ক আরোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করবেন।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ২টা) হোয়াইট হাউসে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩৭ শতাংশ। এতদিন এ শুল্ক গড়ে ১৫ শতাংশ ছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ব্যবস্থাকে বলেছেন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্কের ঘোষণা। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশসহ অন্য দেশগুলোতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ খবরে এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদ, রপ্তানিকারক ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। এখন ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকপণ্য রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ট্রাম্প সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে তখন বাড়তি শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি কমে যাবে। বন্ধ হবে অনেক কারখানা। বেকার হবেন শ্রমিক। তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করে জরুরি ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার তাগিদ দিয়েছেন সরকারকে।
তবে উচ্চ শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশের বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মইনুল খান। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ প্রতিযোগী সক্ষম থাকবে। এতে রপ্তানিতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা বিশ্লেষণ করা হবে। তবে পাল্টা শুল্ক আরোপে বাংলাদেশ কিছুটা চাপে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপিত বাড়তি শুল্কের বিষয়টি পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে প্রেস সচিব এ কথা বলেন।
বাংলাদেশের প্রধান দুই রপ্তানি বাজারের একটি যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের একটি বড় অংশ রপ্তানি হয় দেশটিতে। যুক্তরাষ্ট্রে বছরে বাংলাদেশের রপ্তানি হয় প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন (৮৪০ কোটি) ডলারের পণ্য, যা প্রধানত তৈরি পোশাক। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন (৭৩৪ কোটি) ডলারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বাণিজ্য অনুকূলে। নতুন করে উচ্চমাত্রায় এই শুল্ক আরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন রপ্তানিকারকসহ সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ও মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এ সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। কেননা উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকপণ্যের দাম বেড়ে যাবে। ফলে সে দেশের নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। এখন কেউ চারটি শার্ট কিনলে বাড়তি শুল্কের কারণে দুটি কিনবে। এতে করে আমাদের অর্ডার বা ক্রয়াদেশ কমে যাবে। ফলে রপ্তানি খাতে একটা ধাক্কা আসবে। এই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’
পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের তিনটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও ক্যাম্বোডিয়া। ফারুক হাসান বলেন, প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ওই তিনটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে থাকবে। কারণ ট্রাম্প সরকার ওই তিনটি দেশে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হারে শুল্ক আরোপ করেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থায় তৈরি হবে অস্থিরতা। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আমাদের নতুন বাজারের সন্ধান করতে হবে।’
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক মালিকদের অপর সংগঠন বিকেএমইএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাতেম এ ঘোষণাকে বিনা মেঘে বজ্রপাত হিসেব অভিহিত করে বলেন, এর ফলে দেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
প্রায় একই মন্তব্য করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে রপ্তানি খাত অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি খাত মিলে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ মনে করেন, বাংলাদেশের রপ্তানি কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র এটি করেছে। উচ্চ শুল্ক আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ভোগ-ব্যয় কমে যাবে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক বিক্রি কমে যাবে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে বাংলাদেশ। অনেকেই মনে করেন বিদ্যমান শুল্কহার কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত। এর ফলে বাংলাদেশি পণ্যে মার্কিন শুল্ক হবে ১৫ শতাংশ। মোস্তফা আবিদ মনে করেন, বাংলাদেশ শুল্ক কমালেও খুব একটা লাভবান হবে না।
আরেকজন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক মঞ্জুর আহমদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, যা দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত টিকফা চুক্তি লঙ্ঘনের শামিল।
উচ্চহারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণার পক্ষে যুক্তি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বাধার মুখে রয়েছে। অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা আরও খারাপ অবস্থা তৈরি করেছে। বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মেধাস্বত্ব চুরিসহ অন্যান্য বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ করেছেন তিনি।
কথা ছিল যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে যত শুল্ক আরোপ করে, সেই দেশের পণ্যে ঠিক ততটাই শুল্ক আরোপ করা হবে। কিন্তু ঘোষণায় ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তা করতে পারতাম; কিন্তু তাতে অনেক দেশ কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই পাল্টা শুল্ক বিশ্বকে বাণিজ্যযুদ্ধের দিকেও ঠেলে দিতে পারে। এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও মন্দা পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন একাধিক বিশেষজ্ঞ ও বাজার সমীক্ষা সংস্থা। ইতোমধ্যে তার লক্ষণ দেখা গেছে। ট্রাম্প যখনই শুল্ক নিয়ে কিছু বলেছেন বা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তার প্রভাব পড়েছে।
কোন দেশে কত শুল্কারোপ
ট্রাম্পের পাল্টা এই শুল্ক আরোপে ভারতের পণ্যের ওপর ২৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। পাকিস্তানের পণ্যের ওপর ২৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। চীনের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ৩৪ শতাংশ। আগে ছিল ২০ শতাংশ। সব মিলিয়ে ৫৪ শতাংশ।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ, ভিয়েতনামের ওপর ৪৬, শ্রীলঙ্কার পণ্যে ৪৪, তাইওয়ানের পণ্যে ৩২, জাপানের পণ্যে ২৪, দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে ২৫, থাইল্যান্ডের পণ্যে ৩৬, সুইজারল্যান্ডের পণ্যে ৩১, ইন্দোনেশিয়ার পণ্যে ৩২, মালয়েশিয়ার পণ্যে ২৪, কম্বোডিয়ার পণ্যে ৪৯, যুক্তরাজ্যের পণ্যে ১০, দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্যে ৩০, ব্রাজিলের পণ্যে ১০, সিঙ্গাপুরের পণ্যে ১০, ইসরায়েলের পণ্যে ১৭, ফিলিপাইনের পণ্যে ১৭, চিলির পণ্যে ১০, অস্ট্রেলিয়ার পণ্যে ১০, তুরস্কের পণ্যে ১০, কলম্বিয়ার পণ্যে ১০ শতাংশ আরোপ করা হয়েছে।
অন্য যেসব দেশের পণ্যের ওপর বেশি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে মায়ানমারের পণ্যে ৪৪ শতাংশ, লাওসের পণ্যে ৪৮ এবং মাদাগাস্কারের পণ্যের ওপর ৪৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
প্রেস সচিবের বক্তব্য
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক পোস্টে লিখেছেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক পর্যালোচনা করছে। এসব শুল্ক আরও যুক্তিসংগত করার উপায় খুঁজে বের করতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), যা শুল্কবিষয়ক জটিলতা নিরসনে প্রয়োজন।
প্রেস সচিব আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আমাদের বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য। ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আমরা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করে আসছি।’
শফিকুল আলম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের চলমান কার্যক্রম শুল্ক সমস্যা সমাধানে সহায়তা করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।’
আরও পড়ুন:
>> ডিউটি কমাতে হবে তাদের ক্ষেত্রে