রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনে (বিআরটিসি) ১২ বছরে প্রায় ৬ কোটি টাকা লুটপাট করেছেন বিআরটিসির দুই শীর্ষ কর্মকর্তা গোলাম ফারুক ও নূর-ই আলম। গোলাম ফারুক এখন এই প্রতিষ্ঠানে উপমহাব্যবস্থাপক (এস্টেট) পদে ও নূর-ই আলম ব্যবস্থাপক (অপারেশনস) পদে কর্মরত রয়েছেন।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের তদন্ত ও শৃঙ্খলা বিভাগের নথিপত্র, বিআরটিসির নানা তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, নানা অপকর্মে অভিযুক্ত এই দুই কর্মকর্তা বিআরটিসি থেকে ৬ কোটি ৮১ লাখ ১৭ হাজার ৬৮৫ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বিআরটিসির বিভাগীয় মামলার নথি থেকে জানা গেছে, তারা রাজধানীসহ নানা জেলায় বিআরটিসির ডিপোগুলোতে বাস রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, যন্ত্রপাতি কেনায় ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করেছেন। কখনো অকেজো দ্বিতল বাস কেটে বাইরে বিক্রি করে দিয়ে, কখনো বহিরাগত চালকদের দিয়ে বাস চালিয়ে অর্থ লোপাট করেছেন দেদার।
একাই ৪ কোটি টাকা লুটেছেন ডিজিএম গোলাম ফারুক
১৯৯৯ সালের জুন মাসে বিআরটিসিতে ইন্সট্রাক্টর পদে যোগ দিয়েছিলেন গোলাম ফারুক। তিনি এখন বিআরটিসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার।
এক ডিপোর ইউনিটপ্রধান হিসেবে রেকর্ড ২ কোটি ৩৩ লাখ ১১ হাজার ৭৫০ টাকা বিআরটিসির তহবিলে জমা দেননি মো. গোলাম ফারুক। তখন তিনি বগুড়া ডিপোতে কর্মরত ছিলেন। নথিপত্র থেকে জানা যায়, বিআরটিসি বাসের দৈনন্দিন অর্জিত রাজস্ব বিভিন্ন চালক, কন্ডাক্টর, ব্যক্তিদের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া রেখেছেন, যা বিআরটিসির কোষাগারে জমা হয়নি।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিসির নিজস্ব চালকদের বাদ দিয়ে বাইরের পছন্দসই চালকদের দিয়ে গাড়ি পরিচালনা করেছেন। পরে সেসব গাড়ি পরিচালনায় অর্জিত অর্থ তিনি রাজস্ব তহবিলে জমা দেননি। এ কাণ্ডে তিনি ১ কোটি ১২ লাখ ৬২ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে বিআরটিসির একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০১৬-১৭ সালে তিনি কর্মরত ছিলেন মোহাম্মদপুর বাস ডিপোতে। এ সময় তিনি বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি ইস্যুতে নানা অনিয়ম করেন। এতে বিআরটিসির ২৮ লাখ ৩৫ হাজার ৬০০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এ কাণ্ডে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তবে প্রভাব খাটিয়ে সেসব মামলা খারিজ করিয়ে নেন তিনি।
বিআরটিসির প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গাবতলী ডিপোর ম্যানেজার থাকাকালীন বেতন-ভাতা বাবদ ৩৫ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫ টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ে চাকরিবিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে একাধিকবার শোকজ নোটিশ পেয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে ৪ কোটি ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন গোলাম ফারুক।
গোলাম ফারুকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তারও উত্তর দেননি তিনি।
অভিযোগের অন্ত নেই নূর-ই-আলমের বিরুদ্ধে
নূর-ই-আলম ২০১১ সালের জুন মাসে বিআরটিসিতে ট্রাফিক অফিসার পদে যোগদান করেছিলেন। পরে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কর্মরত ছিলেন বিআরটিসির সিলেট ডিপোতে।
বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই ডিপোতে কর্মরত থাকাকালীন ঈদ স্পেশাল সার্ভিসের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি। বিআরটিসির চালকদের বাদ দিয়ে বহিরাগত চালকদের দিয়ে বাস পরিচালনা করেছেন তিনি। আর এই প্রক্রিয়ায় নিজের ভাইকেও যুক্ত করেছিলেন তিনি। বাসের টায়ার ক্রয়ে ভুয়া বিল-ভাউচারে অর্থ উত্তোলন করেছেন। এ ছাড়া অনিয়ন্ত্রিতভাবে চেক ইস্যু করার একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি এক চালক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন- এমন এক মিথ্যা তথ্য দিয়ে টাকা লুট করেছেন। এসব অপকর্মে ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছিল; যাতে ৩৭ লাখ ২১ হাজার ৮১৭ টাকা লুটের তথ্য উল্লেখ করা হয়।
২০২২ সালে বিভাগীয় মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, নূর-ই-আলম সিলেট ডিপোতে কর্মরত থাকার সময় ১ কোটি ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৬২৫ টাকা রাজস্ব কোষাগারে জমা দেননি। আরও একটি বিভাগীয় মামলার নথিপত্র থেকে দেখা গেছে, নূর-ই-আলম ঢাকার মিরপুরে দ্বিতল বাস ডিপো থেকে ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪ টাকা, গাজীপুর বাস ডিপো থেকে ৮ লাখ ৯১ হাজার ২৪৫ টাকা, গাবতলী ডিপো থেকে ৫ লাখ ৬ হাজার ৬৬৪ টাকা, কল্যাণপুর বাস ডিপো থেকে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ টাকা রাজস্ব আত্মসাৎ করেছেন। সব মিলিয়ে তিনি ১ কোটি ৬৫ লাখ ৪৩ হাজার ২৪৫ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ করে তিনি রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়ায় একটি অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট এবং ৪০ লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি কিনেছেন।
নূর-ই-আলম ২০২৩ সালে কল্যাণপুর বাস ডিপোপ্রধান হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে একটি অকেজো দ্বিতল বাস কেটে বাইরে বিক্রি করে দেন। এই কাণ্ডে তার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় গত বছর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। মামলাটি এখনো চলমান।
রাজধানীর কল্যাণপুর বাস ডিপোতে কর্মরত অবস্থায় বাজারমূল্য থেকে অতিরিক্ত দাম দিয়ে যন্ত্রাংশ কেনার অভিযোগ রয়েছে নূর-ই-আলমের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে চায়না গাড়ির রিকন্ডিশন্ড যন্ত্রাংশ (অয়েল পাম্প, গিয়ার পিনিয়ন) কিনে এনে নতুন যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে মর্মে তিনি ভুয়া বিল দাখিল করেন। তিনি কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল (কাট আউট, ফিউজ, সুইচ, ব্লোয়ার) কেনা হয়েছে বলে জানান বিআরটিসিকে। পরে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সেসব প্রতিষ্ঠান আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিভিন্ন অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ঢাকার অন্যান্য ডিপোর তুলনায় কল্যাণপুরে মেরামত খাতে তিনি অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালে বিআরটিসিতে সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে মৌখিক পরীক্ষার সময় নিয়োগ-প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন তিনি। এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
নূর-ই-আলমের অপকর্মের শেষ এখানেই নয়। গত বছর নোয়াখালীর সোনাপুর, নরসিংদী, চট্টগ্রাম ডিপোতে অর্থসংকটের কারণ অনুসন্ধানে তাকে সরেজমিনে পাঠানো হয়। এই সরেজমিনে বিআরটিসির ম্যানেজারের (অপারেশন) পদের কর্মকর্তার জন্য কোনো ভ্রমণ ভাতার (টিএ-ডিএ) বিধান ছিল না। পরে ভ্রমণ ভাতা পেতে তিনি প্রশাসন শাখায় নিজের পদবি ‘সচিব (বিআরটিসি)’ হিসেবে দাখিল করে নোটিশ পাঠান ঢাকার বাইরের ডিপোগুলোতে। সচিব হিসেবে সরেজমিনে গিয়ে তিনি ডিপো থেকে টিএ-ডিএ আদায় করবেন বলে পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। বিআরটিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নেন। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবে নূর-ই-আলম সেই যাত্রায়ও রেহাই পান।
অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অপকর্ম আর বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ ভুল এবং একেবারেই বিভ্রান্তিকর। আমি সব সময় আইনের প্রতি অনুগত। ট্যাক্স ফাইল অনুযায়ী আমার সব সম্পদই বৈধ।’
‘সেবা নয়, লুটপাটেই মনোযোগ তাদের’
এই দুই কর্মকর্তার সীমাহীন দুর্নীতি নিয়ে বিপাকে পড়েছে বিআরটিসি। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ একাধিকবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিআরটিসির পরিচালক (অর্থ, হিসাব, প্রশাসন, অপারেশন) অনুপম সাহা এখন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বিআরটিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। কর্মকর্তাদের এই আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বিআরটিসির আর্থিক বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত চলছে। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। আমি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে না জেনে বলতে পারছি না।’
বিআরটিসির জেনারেল ম্যানেজার (হিসাব) মো. আমজাদ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি নথিপত্র না দেখে তো কোনো মন্তব্য করতে পারব না। আপনি সব নথি নিয়ে অফিসে আসেন। নথি দেখি আগে, তারপর বলতে পারব।’
বিআরটিসির এই আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে পরিবহন খাত বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, ‘বিআরটিসির কর্মকর্তাদের পরিবহন সেক্টর পরিচালনা করতে কোনো কারিগরি জ্ঞান নেই। তারা সেবা দেওয়ার জন্য নয়, আসেন শুধু লুটপাটের জন্য। এদের অধিকাংশ সড়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, বিআরটিসিতে আসেন ডেপুটেশনে। কখনো কখনো যখন বিআরটিসি একটু লাভের মুখে দেখেছে, তখনই নতুন বাস কিনে, রোলিং স্টক আধুনিকায়নের প্রকল্প দেখিয়ে টাকা লুটেছেন। বিআরটিসির অডিট রিপোর্ট আরও বিশ্লেষণ করলে মূলধন আর মুনাফার বিস্তর তফাত ধরা পড়বে।’