বাতাসে হঠাৎ আলোর ঝড়; ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল। প্রখর দাবদাহে প্রকৃতি যেন এক পাণ্ডুর মুখাবয়ব। তবু তাপস নিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে উড়িয়ে নবীন খোঁজে শান্তিপাঠ। অসুন্দর ছেদ করে সে গড়ে নিতে চায় চির সুন্দর।
এক নতুন দিন আর নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে নতুন বঙ্গাব্দ ১৪৩২। আজ পয়লা বৈশাখ। পুরোনো দিনের গ্লানি-ভয়-সংকোচ আর প্রবল প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে বাঙালি এগোবে দীপ্ত পদভারে, আজ তো সেই প্রত্যাশার দিন। সংকটমোচনে নতুন পথ রচিত হবে, বীরত্ব আর মানবিকতার নতুন গল্পে বিশ্বে বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হবে; কায়মনোবাক্যে আজ সে প্রার্থনারই দিন।
‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়াই হোক নববর্ষের অঙ্গীকার’
বিগত বছরের গ্লানি, দুঃখ-বেদনা ভুলে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে তিনি বলেন, ‘২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান বৈষম্যহীন, সুখী-সমৃদ্ধ, শান্তিময় ও আনন্দপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমাদের প্রেরণা দেয়। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়াই হোক এই বাংলা নববর্ষে আমাদের অঙ্গীকার।’ তিনি বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ বাঙালির সম্প্রীতির দিন, মহামিলনের দিন। আবহমান কাল ধরে নববর্ষের এই উৎসবে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সমগ্র বাঙালি জাতি জেগে ওঠে নবপ্রাণ স্পন্দনে, নব-অঙ্গীকারে। এদিনে বাঙালি রচনা করে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, আনন্দ ও ভালোবাসার মেলবন্ধন।’
গতকাল ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান শুভেচ্ছাবার্তা জানিয়েছেন দেশবাসীকে। তিনি বলেন, ‘জাতির আত্মপরিচয়ে পয়লা বৈশাখ এক উজ্জ্বল উপাদান। প্রতিবছর নববর্ষ পেছনের আলোকের দীপ্তিতে উৎকর্ষ ও অগ্রগতির পথে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দেয়। এখন আমাদের প্রাণবন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের উদার দৃষ্টিভঙ্গির যে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রবণতা রয়েছে তার ভিত্তিতে বহুমত ও পথের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চিরস্থায়ী কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।’
জাতীয় পার্টির জি এম কাদের বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ বাঙালির মহাঐক্যের দিন। এমন উৎসবমুখর দিন ধর্ম, বর্ণ, জাত বা গোত্রের সীমারেখা ভেঙে একসঙ্গে একই পথে চলতে আমাদের অনুপ্রেরণা।’
আত্মবোধন-জাগরণের সুরবাণীতে স্বাগত নতুন ভোর
নতুন বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে সংস্কৃতি অঙ্গন ছায়ানট এবার বর্ষবরণের আয়োজন সাজিয়েছে আত্মবোধন-জাগরণের সুরবাণী দিয়ে। বিশ্বব্যাপী মানবতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এ সময়ে সে গানের কথামালা বর্ষবরণের বার্তা হিসেবে ছড়িয়ে দেবেন ছায়ানটের শিল্পীরা। আজ ভোর ৬টায় রাজধানীর রমনা উদ্যানের বটমূলে শুরু হবে ছায়ানটের বৈশাখী আয়োজন। ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে ভৈরবীতে রাগালাপে শুরু হবে বঙ্গাব্দ বরণের সূচনা। ছায়ানটের এবারের বার্তা, ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়।’ অনুষ্ঠানমালায় ৯টি সম্মেলক গান, ১২টি একক গান ও ৩টি পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গণতন্ত্রের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় গত বঙ্গাব্দে আষাঢ়-দুপুরে যে তরুণ উন্মুখ হয়ে ছুটে গেছে রাজপথে, তার অমিত বিক্রমের কথা থাকবে এবারের ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’য়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা স্বীকৃতি পেয়েছিল ইউনেসকোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের। সেই শোভাযাত্রাকে পুরোনো ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে ফিরিয়ে নিয়েছে চারুকলা; যদিও এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়েছে সংস্কৃতি অঙ্গনে। চারুকলা অনুষদের এবারের শোভাযাত্রার স্লোগান- ‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’। পুরো শোভাযাত্রায় থাকছে ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ। ইলিশ মাছ, বাঘ, পালকি, পাখি, মুগ্ধের পানির বোতল, স্বৈরাচারী শাসকের প্রতিবাদে ৮০টি ফ্যাসিবাদের মুখাকৃতি এবার মূল মোটিফ থাকছে। শোভাযাত্রায় ফিলিস্তিনি গণহত্যার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানানো হবে তরমুজের প্রতিকৃতিতে।
বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রায় শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় ২৮টি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বর্ণিল সাজে সজ্জিত হয়ে অংশ নেবে। এ ছাড়া শোভাযাত্রায় দুই শতাধিক ব্যান্ড মিউজিশিয়ান অংশ নেবেন। পৃথিবীর শান্তি কামনায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে সম্মিলিতভাবে গান পরিবেশিত হবে।
আজ সকাল ৯টায় শোভাযাত্রা শুরু হবে। চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ মোড় ঘুরে টিএসসি মোড়, শহিদ মিনার, দোয়েল চত্বর হয়ে আবার চারুকলা অনুষদে গিয়ে শেষ হবে। পয়লা বৈশাখে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো মুখোশ পরা এবং ব্যাগ বহন করা যাবে না। আজ বিকেল ৫টার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা যাবে না।
এ বছর পয়লা বৈশাখে সুরের ধারার প্রভাতী আয়োজনটি হবে রাজধানীর ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে। প্রথমবারের মতো এই আয়োজনে নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর গান পরিবেশিত হবে। এ বছর পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি জনগোষ্ঠীকে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে সম্পৃক্ত করে পাহাড়ের বৈশাখী আয়োজনে বিস্তৃত করা হচ্ছে।’
আজ বেলা ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ‘ড্রোন শো’ এবং ‘নববর্ষ কনসার্টের’ আয়োজন করেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। ড্রোন শোতে সহযোগিতা করছে চীন দূতাবাস। এদিন বিকেলে সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ‘বৈশাখী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’-এর আয়োজন করা হয়েছে।
বেলা ১১টায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বিসিক ও বাংলা একাডেমির যৌথ আয়োজনে সাত দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা শুরু হবে। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে থাকবেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
বেলা সাড়ে ৩টায় বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের উদ্যোগে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজনটি হবে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। অনুষ্ঠানে একক ও দলীয় সংগীত, একক আবৃত্তি, দলীয় আবৃত্তি, দলীয় নৃত্য, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিশেষ পরিবেশনাসহ পথনাটক পরিবেশন করবেন শিল্পীরা।
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সাড়ম্বরে পয়লা বৈশাখ উদযাপনের নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।
প্রকৃতি থাকবে বিচিত্র খেয়ালে
প্রকৃতিবিদ মোকাররম হোসেনের ভাষ্যে, এবারে বৈশাখে প্রকৃতি থাকবে বিচিত্র খেয়ালে। প্রখর রোদেলা দিনে হুট করেই আসতে পারে কালবৈশাখী; আসতে পারে প্রবল তাপপ্রবাহ। তবে বৈশাখের শুরুতেই প্রকৃতিতে নানা রঙের যে ফুল ফুটছে, তাতে নগরবাসী আন্দোলিত হবেন। তিনি বলেন, ‘গ্রীষ্মের শুরুতে আমরা দেখছি কৃষ্ণচূড়া, জারুল, কুচি, কনকচাঁপা ফুলের সমারোহ দেখছি।’
ধুলোময় নগরজীবনে ঋতুবৈচিত্র্য উপভোগ করতে হলে শহরগুলোকে ছয় ঋতুর রঙে সাজানোর কথা বলেন মোকাররম হোসেন। বৈশাখের তাপপ্রবাহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি নগরের মোট আয়তনের অন্তত ১৫ শতাংশ বনভূমি দরকার। আমাদের সেখানে আছে ৫-৬ শতাংশ। তাই আমাদের উৎসবের পাশাপাশি কিন্তু প্রচুর বৃক্ষও রোপণ করতে হবে।’
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাস দিয়েছে, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি ঝরতে পারে। চলতি সপ্তাহে বুধবার পর্যন্ত বৃষ্টির আভাস দিয়েছে অধিদপ্তর। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সোমবার (আজ) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট বিভাগের কয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বিদ্যুৎ চমকানো/বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্য এলাকায় অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সেই সঙ্গে সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে।