ভারত হঠাৎ করে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার পর বাংলাদেশ দ্রুত বিমানের কার্গো অবকাঠামো বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। বিশেষভাবে রপ্তানি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য তৈরি পোশাকের নিরবচ্ছিন্ন রপ্তানি নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ। এ জন্য কার্গো সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ ও পরিবহন খরচ কমানোর জন্য সব পর্যায়ের অংশীজন- বিমান, সিভিল অ্যাভিয়েশন, প্রাইভেট সেক্টর সবার সঙ্গে বৈঠক করে জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। সেবা বাড়াতে ঢাকাসহ সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে কার্গো ফ্লাইট বাড়ানো এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও অ্যারোনটিক্যাল চার্জসহ অন্যান্য ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কার্গো ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে কার্গো হ্যান্ডলিং পরিষেবার ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থ দেওয়া সত্ত্বেও ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করা এয়ারলাইনসগুলোকে এর জন্য নিজস্ব খরচে কর্মী নিয়োগ দিতে হয়। যার ফলে খরচ বাড়ে।
এয়ারলাইনস অপারেটর কমিটির (এওসি) ডিসেম্বর পর্যন্ত এক হিসাবমতে, এই বিমানবন্দরের একমাত্র গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এজেন্ট বাংলাদেশ বিমানকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিষেবার জন্য প্রতি ফ্লাইটে ২ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার ডলার এবং কার্গো অপারেশনের জন্য প্রতি কেজিতে অতিরিক্ত দশমিক শূন্য ৭ সেন্ট দেয়। এসব ফি দেওয়ার পরও সেবাগ্রহীতা প্রতিটি এয়ারলাইনসকে মাত্র দুই থেকে তিনজন গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মী দেওয়া হয়, যা তাদের ফ্লাইট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়- বলছে এওসি।
যদিও প্যাসেঞ্জার বোর্ডিং (যাত্রীদের ফ্লাইটে ওঠানো-সংক্রান্ত কার্যক্রম), ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, কার্গো ব্যবস্থাপনা ও উড়োজাহাজ সচল রাখার বিভিন্ন সহায়ক কার্যক্রম রয়েছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিষেবার মধ্যে, যা বাংলাদেশের সব বিমানবন্দরে একমাত্র বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসই দিয়ে থাকে। আগামী ২৭ এপ্রিল সিলেট বিমানবন্দর থেকে যে কার্গো ফ্লাইট শুরু হবে সেটির গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিষেবাও এই সংস্থা দেবে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, শুধু এয়ারপোর্টের চার্জ কমানো হলেই আগের মতো চাঙা হয়ে যাবে আকাশপথের রপ্তানি। তখন ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিলের কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
এ বিষয়ে টাওয়ার ফ্রেইট লজিস্টিকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) ভাইস প্রেসিডেন্ট নুরুল আমিন খবরের কাগজকে বলেন, গত বছর ঢাকা বিমানবন্দরের প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার টন হ্যান্ডলিং সক্ষমতার মধ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল মাত্র ১ লাখ ৯৮ হাজার টন। অথচ প্রতিদিন প্রায় ৮০০ টন পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বছরে ১৫ হাজার টনের মতো রপ্তানি পণ্য ভারত হয়ে যেত। এটি কেন হতো? কারণ ফরওয়ার্ডার ও আমাদের পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে প্রতি কেজিতে শূণ্য দশমিক ৮০ ডলার থেকে ১ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হতো, যা সড়ক পরিবহন ও সীমান্তে শুল্ক খরচ বহন করার পরও লাভজনক ছিল।
ঢাকা থেকে খরচ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রথমত- একক হ্যান্ডলিং এজেন্ট বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনসের চার্জ অনেক বেশি। বিমান প্রতি কেজিতে হ্যান্ডলিং বাবদ একটি উচ্চ চার্জ আরোপ করে। দ্বিতীয়ত- দ্বৈত হ্যান্ডলিং ব্যয়। এই চার্জ দেওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত সার্ভিস না পাওয়ার কারণে এয়ারলাইনসগুলোকে তাদের বড়সংখ্যক স্টাফ রাখতে হয়, যার ফলে খরচ বেড়ে যায়। এ ছাড়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম যেমন- ট্রলি, ডলি বা লোডিং যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। রয়েছে স্ক্যানিং মেশিনের ঘাটতি। এ ছাড়া স্ক্যানিং মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সময়মতো পণ্য হস্তান্তর করতে না পারার কারণে প্রায়ই বুকিং মিস হয়। এ ছাড়া স্ক্যানিং করাতে হয়রানিমূলক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খরচ তো গুনতে হয়ই। খরচ বাড়ার একটি বড় কারণ হলো ঢাকা বিমানবন্দরে ফুয়েলের দাম আশপাশের দেশের তুলনায় বেশি। এ ছাড়া সিভিল অ্যাভিয়েশনের অত্যধিক ফ্লাইট অপারেশন চার্জ এই খরচ বাড়ার অন্যতম আরেকটি কারণ। এ ছাড়া এয়ারলাইনসগুলো তাদের আয় দেশে নিয়ে যেতে পারছে না। ফলে ফ্লাইট কমিয়ে দেওয়া বা অতিরিক্ত পরিচালনায় অনীহা খরচ বাড়ায় রপ্তানিকারকদের। পাশাপাশি কার্গো ভিলেজে চুরি ও পণ্য খোয়া যাওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতা আনার ওপর জোর দিয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ বিমানের একচেটিয়া হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার পরিবর্তে বেসরকারি অপারেটর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ইক্যুইপমেন্ট ও স্ক্যানিং অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে শুধু আধুনিকায়ন নয়, সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণও করতে হবে ইক্যুইপমেন্টগুলোর। অপারেশনাল চার্জ পুনঃমূল্যায়ন করতে হবে।’ ফুয়েল ও ফ্লাইট চার্জ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, এক্সপ্রেস ফ্যাসিলিটেশন সেল বা রপ্তানি প্রক্রিয়া দ্রুত করতে ওয়ান স্টপ সেবা চালু করতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং একমাত্র গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং এজেন্ট বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নিরবচ্ছিন্ন কার্গো কার্যক্রম সহজতর করতে এরই মধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে, জানিয়েছে বেবিচক ও বিমানের একাধিক কর্মকর্তা। তারা বলছেন, থার্ড টার্মিনালকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে অনেক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বিমান অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং যন্ত্রপাতি কিনেছে। যার কিছু ইতোমধ্যে বহরে যুক্ত হয়েছে এবং কিছু ক্রয় প্রক্রিয়ায় আছে। এ ছাড়া ফ্লাইট ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের চার্জ কমাতেও জোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে, বেবিচক ও বিমান থেকে জানান কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমানে সিলেটের কার্গো ফ্লাইটের সব সুবিধা যেন ঠিকভাবে দেওয়া যায় তার জন্য আমরা ঢাকা থেকে কিছু ইক্যুইপমেন্ট পাঠিয়েছি। সিলেটের প্রথম কার্গো ফ্লাইটে গ্যালিস্টেয়ার অ্যাভিয়েশনের এয়ারবাস এ৩৩০-৩০০ পণ্যবাহী বিমান ২৭ এপ্রিল স্পেনে ৬০ টন তৈরি পোশাক পরিবহন করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিমান বাংলাদেশ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৭০০ জনেরও বেশি কর্মীর বর্তমান দলের পাশাপাশি পরিপূরক হিসেবে ৪০০ জন অতিরিক্ত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগ করছে বিমান।’ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের খরচের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে দেশে বাংলাদেশ বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খরচই সবচেয়ে কম। আর সেবার মান বাড়াতে এবং থার্ড টার্মিনালের জন্য আমরা নতুন অনেক ইক্যুইপমেন্ট কিনেছি এবং আরও কিছু কেনা প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে।’
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘কার্গো সেবার সমস্যা সমাধানে বেবিচক ও বিমান বাংলাদেশ একসঙ্গে বিমানের কার্গোকে আরও সাশ্রয়ী করার জন্য বর্তমান বেসামরিক বিমান চলাচল ও গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং শুল্ক সংশোধন করতে এখন কাজ করছি। যেকোনো বাধা-বিপত্তির পরেও যেন বিমানে পণ্য পরিবহন কার্যক্রম অব্যাহত থাকে, সে জন্য আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কার্গো কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত ফি ও খরচ সহজতর ও হ্রাস করতে সরকার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে অংশীদারদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনা করছে। আমরা খুব শিগগিরই হ্রাসকৃত হ্যান্ডলিং চার্জ ঘোষণার আশা করছি।’