প্রশাসনের নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ২০ ব্যাচের যুগ্ম সচিব পদের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। এ জন্য চলছে প্রস্তুতি। চলছে বিচার-বিশ্লেষণ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই ব্যাচের বঞ্চিত কর্মকর্তারা আশা করছেন এবার তারা পদোন্নতি পাবেন। অপরদিকে একই ব্যাচের যেসব কর্মকর্তা ২০১৮ সালে মাঠ প্রশাসনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা পদোন্নতি পাচ্ছেন না বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এদিকে দীর্ঘ সময় পর এবার উপসচিব পদে পদোন্নতির জন্য ৩০ ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এই ব্যাচের ২৯১ কর্মকর্তাকে বিবেচনায় আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তারা চাকরিতে যোগ দেন ২০১২ সালের জুন মাসে। সে হিসাবে পদোন্নতির যোগ্য হয়েছেন ২০২২ সালের জুনে। এখন তিন বছর পর তাদের পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণ নিয়মে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পদে (ষষ্ঠ গ্রেড থেকে পঞ্চম গ্রেড) পদোন্নতির জন্য চাকরির কার্যকাল ১০ বছর হলেই হয়। তবে পদোন্নতির জন্য চাকরিকালে তার সততা, মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশিক্ষণ ও সন্তোষজনক অবস্থান বিবেচনা করে থাকে কর্তৃপক্ষ। সময়ের হিসাবে গত তিন বছর এই ব্যাচের কর্মকর্তারা পদোন্নতি বঞ্চিত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৩০ ব্যাচের কর্মকর্তাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করতেই সময় বেশি পার হয়েছে। গত সরকারের সময়ে এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হলেও বর্তমান প্রশাসন মনে করছে এটা পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ গত সরকার দলীয় বিবেচনায় কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার অলিখিত নিয়ম চালু করেছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় পদোন্নতি দিতে নিরপেক্ষ, যোগ্য, দক্ষ কর্মকর্তা বাছাইয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। তাই দ্বিতীয় দফায় ৩০ ব্যাচের পদোন্নতি যোগ্য কর্মকর্তাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছে সরকার। এ কারণে সময় ক্ষেপণ হয়েছে।
অপরদিকে অতিরিক্ত সচিব পদে ২০ ব্যাচের প্রায় ২০০ কর্মকর্তাকে বিবেচনার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে ১২০ থেকে ১৩০ জনকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী (ডিসি) কর্মকর্তা, আর্থিক অনিয়মে অভিযুক্ত কর্মকর্তাসহ যাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে তারা পদোন্নতির বিবেচনায় থাকছেন না। এ ছাড়া ১৭ ও ১৮ ব্যাচের বঞ্চিত কিছু কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য বিবেচনায় আনা হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
২০ ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারের আদেশ পালন করেছি মাত্র। কারণ চাকরি বিধি অনুযায়ী সরকার চাইলে, যেকোনো সময় যেকোনো সমমর্যাদার পদে একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতে পারে। এখানে একজন কর্মকর্তার সরকারি নির্দেশনা অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলেন, ‘‘সে সময় সরকারি আদেশ অমান্য করলে আমার শাস্তি হতো। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হতাম। আবার যেহেতু গত সরকারের সময় রিটানিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি, তাই গোয়েন্দা সংস্থা আমাদের ‘দিনের ভোট রাতে’ এর কুশীলব বলে চিহ্নিত করেছে।’’
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, খুব শিগগির অতিরিক্ত সচিব থেকে সচিব পদেও পদোন্নতি দেওয়ার সম্ভাবনা আছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি পদোন্নতিসংক্রান্ত সর্বোচ্চ ফোরাম সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পদোন্নতিপ্রত্যাশী কর্মকর্তাদের কর্মজীবন, পারিবারিক তথ্য, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন, গোয়েন্দা তথ্য নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
সূত্র জানায়, কয়েকটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থার কিছু শীর্ষ পদও খালি রয়েছে। এসব পদ সচিব ও সচিব পদমর্যাদার হওয়ায় প্রশাসন ব্যাচের নিয়মিত ১৫ ব্যাচের এক ডজন অতিরিক্ত সচিবকে যোগ্য হিসেবে চূড়ান্ত করে তালিকা করেছে এসএসবি। জনপ্রশাসনসংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির অনুমোদন নিয়ে সারসংক্ষেপ অনুমোদনের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই সচিব পদোন্নতি দিয়ে তাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শূন্য থাকা সচিব পদে নিয়োগ দেবে সরকার।
তবে পদোন্নতির এই ধারায় এর আগে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পাননি বিসিএস ২১, ২২ ও ২৪ ব্যাচের কিছু কর্মকর্তা। এবার তাদের পদোন্নতি দেওয়ার সম্ভাবনা আছে।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ আমলে যেসব কর্মকর্তা রাজনৈতিক কারণে পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন, তাদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, পদোন্নতির লক্ষ্যে এসএসবির নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। এসব বৈঠকে সব বিষয় পর্যালোচনা করে পদোন্নতির তালিকা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। দ্রুত সব কার্যক্রম সম্পন্ন হলে পদোন্নতিসংক্রান্ত আদেশ জারি হবে।
জানা গেছে, পদোন্নতির জন্য কোনো দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য না দিয়ে যোগ্যতা, মেধা ও সততাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদেরও তালিকায় রাখা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পদোন্নতিবঞ্চিতদের মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, পদোন্নতি বিধিমালা অনুযায়ী যারা পদোন্নতির যোগ্য, তাদের পদোন্নতি দেওয়ার জন্য এসএসবির বৈঠকে বিবেচনায় আনা উচিত। পেশাদার, দলনিরপেক্ষ, সৎ কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য গুরুত্ব দিতে হবে। এসবের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। কোনো কারণে বঞ্চিত হলেন সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট করে জানায় না। এমন অজানা কারণে তারা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে থাকেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে এসএসবির সদস্যরা আসন্ন পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেবেন বলে প্রত্যাশা করেন তারা।