যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর চার দিন পার হলেও শোকাবহ এ ঘটনা সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল এখনো তুঙ্গে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের যে ভবনে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে, সেই হায়দার আলী ভবন দেখতে শুক্রবারও (২৫ জুলাই) ভিড় জমিয়েছিলেন উৎসুক জনতা।
এদিকে এ ঘটনায় দগ্ধ আরও দুই শিক্ষার্থী শুক্রবার মারা গেছে। ফলে নতুন করে শোকাহত হন শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ স্কুলসংশ্লিষ্টরা।
গত ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে আরও অনেক শিশু শিক্ষার্থী। উদ্ধার কার্যক্রম ও ক্ষতচিহ্ন সরাতে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত স্কুলে বহিরাগত কারও প্রবেশের অনুমতি ছিল না। ক্যাম্পাসটি ছিল সম্পূর্ণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে। গতকাল উৎসুক জনতাকে প্রবেশের অনুমতি দেয় কর্তৃপক্ষ। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তারা স্কুলের ভেতরে ঢোকার সুযোগ পান। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি দেখতে রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে এসেছিলেন অসংখ্য মানুষ। এদের কেউ কেউ নিহত শিক্ষার্থীদের আত্মীয়, কেউ পরিচিতজন। আবার কেউ কিছু না হলেও শুধু একটিবার চোখের দেখা দেখতে ছুটে আসেন। তারা সেই দিনের ভয়াবহ পরিস্থিতি অনুভবের চেষ্টা করেন।
স্কুলটিতে গিয়ে দেখা যায়, পোড়া দাগ ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন নিয়ে হায়দার আলী ভবন দাঁড়িয়ে আছে। ক্লাসের ফাঁকে বিরতিতে যেখানে খুদে শিক্ষার্থীরা দোলনাতে দোল খেত, সেই পোড়া দোলনা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বিবর্ণ চেহারা হয়েছে নারিকেল গাছের, যা দেখে দর্শনার্থীরাও শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। বিমানটি যেখানে আছড়ে পড়ে, সেখানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু স্থানটি টিন দিয়ে ঘেরা। সেই টিন সরিয়ে এক পলক সেই গর্ত দেখার চেষ্টা করেন অনেকে। একসময় সেখানে পৌঁছায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুসংবাদ। এ সংবাদে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বীভৎস ভবনটির ছবিও তুলছিলেন অনেকে।
এক নারী দর্শনার্থী ভবনটির অবস্থা দেখেই আনমনে বলে উঠলেন, ‘আহারে! কী অবস্থাই না হয়েছিল ছোট বাচ্চাগুলোর! বাচ্চাগুলো ক্লাসে ছিল, এভাবে পুড়ে মরে গেল। আল্লাহ তুমি রহম করো।’
খবরের কাগজের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তার নাম সিনথিয়া আক্তার, থাকেন মিরপুরের পল্লবীতে। ঘটনার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের করুণ ছবি দেখে নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এতগুলো শিশু মারা গেল, আমি সেই কষ্ট মেনে নিতে পারছি না। আমারও একটি সন্তান আছে। ঘটনা শোনার পর আমার মন হাহাকার করছিল। এই শিশুগুলো নিষ্পাপ, ওদের কেন এমন হলো? শুধু এই প্রশ্নটাই মনে জাগে, কিন্তু উত্তর পাই না…।’
অনেকে ঘটনাস্থল থেকে সরতে চাইছিলেন না। এ জন্য উৎসুক জনতার ভিড় থেকে একজন বলছিলেন, ‘যারা দেখেছেন তারা অন্যদের দেখার সুযোগ করে দিন।’ সবার মধ্যে ছিল হাহাকার।
উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টর থেকে আসেন মধ্যবয়স্ক আবদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘শুক্রবারও এসেছিলাম, কিন্তু ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। তাই আজ আবার এসেছি একটু দেখতে। আমার নাতনিও মাইলস্টোনে অন্য শাখায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বিমান দুর্ঘটনায় এত শিশুর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ভিডিও দেখেছি। এতে মনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছিল। তাই ঘটনাস্থল দেখতে এলাম।’
তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে বা ফেসবুকে যখনই দগ্ধ শিশুদের ছবি দেখি তখন আমার কেমন যেন লাগে। কারণ ওদের বয়সী আমার নাতনিও স্কুলে পড়ে। এই শিশুদের মৃত্যু মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর বিষয়।’
গাজীপুর থেকে এসেছিলেন পোশাককর্মী জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি শুনে কী যে খারাপ লেগেছে তা মুখে বলে বোঝাতে পারব না। শুক্রবার বন্ধের দিন বলে বোর্ডবাজার (গাজীপুর) থেকে এখানে এসেছি। আমার সংসারে সন্তান নেই। তবুও আমি এভাবে সন্তান হারানোর বেদনা সহ্য করতে পারছি না।’ তুরাগ এলাকা থেকে এসেছিলেন রাজমিস্ত্রি মো. রুহুল আমিন। তিনি বলেন, ‘দেখতে আইলাম (এলাম), বিল্ডিংয়ের কোন জায়গায় বিমান পড়ছিল। বিল্ডিং পুইড়া ছাই হয়ে গেছে, আহারে বাচ্চাগুলান কী কষ্ট পাইয়া যে মরছে (মারা গেছে) আহারে…।’
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অফিস সহকারী মো. সিয়াম বলেন, ঘটনাস্থল টিন দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। শুক্রবার (গতকাল) শুধু দর্শনার্থীদের প্রবেশে অনুমতি দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। জুমার নামাজের আগে অনেককে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। বিকেল ৫টা পর এখানে আর কাউকে থাকতে দেওয়া হবে না।’
আহত-নিহতদের তথ্য দিল স্কুল কর্তৃপক্ষ, পাশে থাকার অঙ্গীকার
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ চত্বরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহত, আহত ও নিখোঁজদের তথ্য নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ। তাকে আহতদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
মাইলস্টোন কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, বেলা ১টায় স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ায় তখন অভিভাবকদের জন্য শুধু স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী অপেক্ষমাণ ছিল। এ সময়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আমাদের স্কুল শাখার ২৭ জন শিক্ষার্থী, ২ জন শিক্ষক, ৪ জন অভিভাবক মৃত্যুবরণ করেন। এ দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত অবস্থায় হাসপাতালে আছেন ৫০ জন। এদের মধ্যে ৩৯ শিক্ষার্থী, ৭ জন শিক্ষক, ১ জন অভিভাবক, ২ জন আয়া ও ১ জন পিয়ন রয়েছেন। এ ঘটনায় ২২ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় স্কুল কর্তৃপক্ষ শুধু এ প্রতিষ্ঠানে নিহত, আহত ও নিখোঁজের তথ্য তুলে ধরছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য হালনাগাদকরণের কাজ চলমান। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার, বিভিন্ন বাহিনী, গণমাধ্যমসহ যারা এই বিপদে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।