অল্প কয়েক দিন আগের কথা। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় দগ্ধ ও আহতদের উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয় রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে। তখন ওই স্কুলের শিশুশিক্ষার্থীসহ আহতদের বাঁচানোর জন্য রক্তের হাহাকার চলছে বলে প্রচার করা হয়। মানবিক কারণে অনেকেই ছুটে যান রক্ত দিতে। দেদার রক্ত দান করেন তারা। কিন্তু পরে জানা যায়, ওই সব রক্তের বেশির ভাগই মাইলস্টোনের রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করতে হয়নি।
তা হলে দান করা এত রক্ত গেল কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে জানা গেল, দান করা এসব রক্ত দিয়ে মূলত চলছে ‘দালালি’ কারবার। রক্তদাতারা বুঝতেও পারেননি তাদের রক্ত দিয়ে অসাধু চক্র বাণিজ্য করেছে! কেবল মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি নয়, বিভিন্ন অজুহাতে সংগ্রহ করা এ ধরনের ডোনেশনের (দান করা) রক্ত অনেক সময়ই দালাল চক্রের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন ক্লিনিক-হাসপাতালে; যা দিয়ে পরে মুমূর্ষু রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচানোর অজুহাতে ডোনারদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এরপর তা প্রথমে সংরক্ষণ করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে। সেই রক্ত রোগীকে না দেওয়া হলে তা বেশি মূল্যে বিক্রি করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গড়ে উঠেছে এমন বেশ কয়েকটি দালাল চক্র। যারা প্রতিনিয়ত দান করা রক্ত নিয়ে ব্যবসা করে আসছে।
বেশ কয়েকজন রক্তদাতার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে খবরের কাগজের করা প্রায় দুই সপ্তাহের অনুসন্ধানে মিলেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। শুধু দান করা রক্তই নয়, পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের কাছ থেকেও কম দামে রক্ত কিনে তা রোগীর স্বজনদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছে দালাল চক্র।
ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সড়ক দুর্ঘটনায় আহতসহ জটিল রোগে আক্রান্তদের রক্তের প্রয়োজন হয়। এক ব্যাগ রক্ত জোগাড় করতে ঘাম ছুটে যায় স্বজনদের। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রক্তের ব্যবসা করছেন দালালরা। এখানেই শেষ নয়, রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে মেয়াদোত্তীর্ণ রক্তও গছিয়ে দেন তারা। সংগ্রহ করা রক্তের বেশির ভাগ আসে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের থেকে। অন্যদিকে যারা স্বজনদের কাছ থেকে রক্ত জোগাড় করতে পারেন না তাদের শেষ ভরসা ব্লাড ব্যাংক। দেশের নামিদামি ব্ল্যাড ব্যাংকগুলো নিয়ম মানার ক্ষেত্রে কঠোর থাকলেও ঢামেকের আশপাশে ব্যাঙের ছাড়ার মতো গজিয়ে ওঠা ব্লাড ব্যাংকগুলো এখন মানুষের জন্য বিষফোড়া।
দান করা রক্ত নিয়ে দালালি কারবার
সম্প্রতি ঢামেক হাসপাতালের আশপাশ ও চানখাঁরপুল ঘুরে দেখা যায়, এই দুটি স্থানে রক্তের দালালদের জটলা। তারা সেখানকার ব্লাড ব্যাংকগুলোর সামনে ওত পেতে থাকেন। কাউকে ঢুকতে দেখলে জিজ্ঞাসা করেন কী গ্রুপের রক্ত লাগবে, কম টাকায় দেওয়া যাবে। ডোনার লাগলেও রেডি আছে। ঢামেকের দক্ষিণ পাশের গেট দিয়ে সড়কের ওপারে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে একাধিক ব্লাড ব্যাংক। একটি ব্লাড ব্যাংকের সামনে যেতেই এগিয়ে আসেন এক দালাল। নাম সাগর। রক্ত লাগবে বলতেই বিভিন্ন তথ্য দিতে শুরু করেন। এরপর এই প্রতিবেদককে সঙ্গে নিয়ে যান ওই ব্লাড ব্যাংকের ভিতর। একটি জরাজীর্ণ ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তিন-চারজনকে রক্ত দেওয়া হচ্ছে। নেই কোনো চিকিৎসক বা নার্স। পরে সেখানে রিসিপশনে কাজ করা ব্যক্তি এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করেন, কী গ্রুপের রক্ত লাগবে? ‘ও পজিটিভ’ বলতে তিনি উত্তরে জানান, কাগজ আনছেন? ২ হাজার টাকা লাগবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকায় তিনটি ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। স্বাধীন ব্লাড ব্যাংক, ক্রিয়েটিভ টিজি ব্লাড ব্যাংক ও বন্ধন ব্লাড ব্যাংক। ‘ও পজেটিভ’, ‘এ পজেটিভ’ গ্রুপের প্রতি ব্যাগ বিক্রি হয় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। আর ‘এবি পজেটিভ’ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। তবে যেকোনো নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ হলে গুনতে হবে ৫ হাজার টাকা। স্বেচ্ছায় দান করা রক্ত কাগজ-কলমে সরকারি ব্লাড ব্যাংকে রাখার এক দিন দুই দিন পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মিলে বিক্রি করে দেন বলে জানিয়েছে ঢামেকের একাধিক সূত্র।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ঢামেক ব্লাড ব্যাংকের কর্মচারী মো. হাশেম ও অফিস সহকারী মো. মিন্টু এবং কর্মচারী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ওরফে নাসিরের সঙ্গে সখ্য রয়েছে বন্ধন ব্লাড ব্যাংকের জাকির হোসেন, মোহাম্মদ রিপন ও সেন্টু মিয়ার সঙ্গে। তাদের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন আজাদ, রনি ও জব্বার মোল্লাসহ আরও অনেকে। ঢামেকে সরকারি চাকরির পাশাপাশি নাসির নিজেই এখন একটি ব্লাড ব্যাংকের মালিক।
সম্প্রতি দালালের খপ্পরে পড়া মেহেদি জামান খবরের কাগজকে বলেন, “আমার স্ত্রী মেহেরুন রক্তশূন্যতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে রক্ত দিতে ঢামেকে নিয়ে আসি। রক্তের প্রয়োজন ‘ও নেগেটিভ’। স্বজনদের কারও সঙ্গে ম্যাচ করছিল না। পরে এক দালালের কাছ থেকে রক্ত কিনে প্রতারিত হয়েছি। ওই রক্তে সমস্যা আছে বলে চিকিৎসকরা দেননি। এরপরে এক স্বজন রক্ত দিয়েছেন বলে রক্ষা।” অন্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দালালদের কাছ থেকে রক্ত কিনবেন না। রক্তের প্রয়োজনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা নিজের স্বজনদের কাছে যান।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের একাধিক চিকিৎসক খবরের কাগজকে বলেন, এই দালালদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রোগী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কয়েক দিন আগেই আনসার সদস্যরা কয়েকজন দালালকে ধরে পুলিশে দেন। রোগীদের রক্তের প্রয়োজন হলে তাদের স্বজনরা ওয়ার্ডে থাকা অবস্থাতেই দালালরা রক্তের জন্য তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকেন। কেউ অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ঢামেক হাসপাতালের ট্রান্সফিউশন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. তানজিন আরা করিম খবরের কাগজকে বলেন, শুধু ক্রস ম্যাচিংয়ের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি নেওয়া হয়। এর বাইরে ব্লাডের জন্য কোনো টাকা নেওয়া হয় না। তিনি বলেন, দালালদের উৎপাত হাসপাতাল এলাকাজুড়েই আছে। এসব দালালকে ধরতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সোচ্চার আছে। দালালরা মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে তাদের সর্বনাশ করে। ধরতে পারলে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। সন্ধানী ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত সংগ্রহ করি। তবে অধিকাংশ সময় রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে ব্লাড সংগ্রহ করি।
ফ্রেশ রক্ত কী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) মতে, সংরক্ষণের দিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত রক্তকে ফ্রেশ হিসেবে ধরা হয়। উপাদানভেদে রক্ত বিভিন্ন মেয়াদে রাখা হলেও সিপিডিএ১ ব্যবহার করার ফলে ৩৫ দিন পর্যন্ত রক্ত ব্যবহার উপযোগী থাকে। এক ব্যাগ রক্ত দিতে সময় লাগে মাত্র ১০ থেকে ১২ মিনিট। রক্তদাতাকে ভাইরাসজনিত রোগ, শ্বাসযন্ত্র ও চর্মরোগমুক্ত থাকতে হয়। একজন সুস্থ ব্যক্তি তিন মাস পরপর রক্ত দিতে পারেন।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সব সময় ফ্রেশ রক্ত দেওয়ার চিন্তা করি। ফ্রিজে রাখা রক্ত ব্যবহার থেকে বিরত থাকাই উত্তম।’
রক্ত বিক্রির অভিযোগ একাধিক দাতার
২৯ জুলাই বিকেল ৪টা। ঢামেক ব্লাড ব্যাংকের ২২৯ নম্বর রুমের সামনে রক্তদান করতে ব্লাড ব্যাগ নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন বিকাশ দাস। পুরান ঢাকার শাঁখারি বাজার থেকে ঢামেকে এসেছেন খালু লক্ষণ মালাকাকে রক্ত দিতে। লক্ষণ মালাকা কিডনির সমস্যায় ভুগছেন। তাকে রক্ত দেওয়ার মধ্য দিয়ে ১০ বার রক্ত দান করলেন তিনি। বিকাশের রক্তের গ্রুপ ‘বি পজিটিভ’।
বিকাশ খবরের কাগজকে বলেন, রক্তদান করা মনের শান্তির ও আনন্দের বিষয়। এ ছাড়া রক্তদান করলে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়। এটা একটা নেশার মতো। তিনি অভিযোগ করেন, রক্ত রোগীর না লাগলে তা বিক্রি করে দেন হাসপাতালের অসাধু কর্মকর্তারা।
এ পর্যন্ত ৪২ বার রক্তদান করেছেন একটি বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা জাকারিয়া জামান। তার রক্তের গ্রুপ ‘ও পজিটিভ’। স্বজন থেকে শুরু করে অপরিচিত যে কারও ফোন পেলেই রক্ত দিতে ছুটে যান তিনি। রক্তদানকে মানবসেবা মনে করে অসুস্থ মানুষের জীবন বাঁচাতে তিনি সব সময় পাশে দাঁড়ান।
জাকারিয়া জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘একবার আমি বাংলাদেশ মেডিকেলে একজনকে রক্ত দিয়েছিলাম। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি রক্ত লাগেনি। এরপর হাসপাতালে দায়িত্বরতদের বলেছি রক্ত যেন অন্য রোগীকে দেওয়া হয়। পরে কী করছে সেই রক্ত আর খোঁজ নিইনি।’
দান করা রক্ত অনেকে বিক্রি করে দেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এটা চরম অসততা। যারা এ কাজ করেন, তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।
সম্প্রতি এক বন্ধুর স্ত্রীকে রক্ত দিয়েছেন এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মাহমুদুন্নবী চঞ্চল। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘নিয়মিত রক্তদানের চেষ্টা করি। প্রায় এক বছর আগে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে এক বন্ধুর স্ত্রীর সিজার হয়েছে। এ জন্য রক্ত দিয়েছেলাম। পরে জানতে পারি, দানকরা রক্ত রোগীর প্রয়োজন হয়নি। পরে ওই রক্ত কী হয়েছে, তা খোঁজ নিইনি। আমার রক্ত দেওয়া বৃথা গেছে মনে হয়।’