মুখ থুবড়ে পড়েছে রাজধানীসহ দেশের প্রধান শহরগুলোর সড়কে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানোর কথিত কঠোর অভিযান। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরানো এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার বিরুদ্ধে কয়েক মাস আগেও ব্যাপক হাঁকডাক দেওয়া হয়। কিন্তু রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে সড়কের সেই বিশৃঙ্খল অবস্থা এখনো বিরাজমান। চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন। ট্রাফিক আইনের লঙ্ঘন ঘটছে দেদার। কোথাও কোথাও ক্ষেত্রবিশেষে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, অর্থনৈতিক মেয়াদকাল উত্তীর্ণ হওয়ার পর (বাসের ক্ষেত্রে ২০ বছর, পণ্য পরিবহন করা ট্রাক-লরিতে ২৫ বছর) যানবাহনগুলোকে সড়ক-মহাসড়ক থেকে অপসারণ করতে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে এই অভিযান জোরদার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেসরকারি কোম্পানির বাসমালিকদের দৌরাত্ম্যে বিআরটিএর সেই অভিযান মুখ থুবড়ে পড়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ বাস-ট্রাক সরাতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ চলতি বছর একের পর এক সভা আয়োজন করেছে। তবে প্রভাবশালী বাসমালিকরা সড়ক পরিবহন আইনের নানা ধারা-উপধারা মানতে নারাজি জানানোয় বিপাকে পড়েছে এই বিভাগ। সড়ক পরিবহন আইনের যেসব ধারায় বিআরটিএ শৃঙ্খলা অভিযান পরিচালনা করছে, তা নিয়েও প্রবল আপত্তি তুলেছেন পরিবহনমালিকরা।
গত সোমবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর প্রগতি সরণি, তাজউদ্দীন আহমদ সরণির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। মধ্য বাড্ডা লিংক রোড, রামপুরা ব্রিজ এলাকায় সড়কে যেসব মিনিবাস চলাচল করছিল, তার সব কটি থেকেই বিষাক্ত কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছিল। বাম্পার খুলে সাইন ইনডিকেটর নষ্ট হয়ে গেছে, এমন কয়েকটি বাস সাতরাস্তা মোড় থেকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দিকে যাচ্ছিল।
রামপুরা ব্রিজে তুরাগ পরিবহনের একজন যাত্রী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাসে উঠেছি। কিন্তু বাসের ফ্যান নষ্ট। চালক ব্রেক কষলে মনে হয়েছে, এই বুঝি বাস উল্টে গেল।’
বিষাক্ত কালো ধোঁয়া বের করে অনাবিল পরিবহনের একটি বাস এ সময় মালিবাগের দিকে চলে যায়। রিকশার যাত্রীরা রুমাল বা টিস্যুতে মুখ চেপে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তাদের একজন বলেন, ‘সড়কে নামলেই যেন এক বিষাক্ত গ্যাস চেম্বারে ঢুকে পড়ছি আমরা।’
রামপুরা ব্রিজে দায়িত্বরত ডিএমপির একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, ‘আমরা লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলোকে বেশি সময় আটকে রাখতে পারি না। কোনো একটি কোম্পানির বাস আটকে রাখলে অন্য কোম্পানির শ্রমিকরা এসে মব তৈরি করেন। তারা বাস না ছাড়লে নানা রকম সমস্যা তৈরির কথা বলেন। তখন ফিটনেসবিহীন, রুট পারমিটবিহীন বাসগুলো ছেড়ে দিতে হয়। জরিমানা আদায় করা যায় না।’
সড়কে আমূল সংস্কার করে যানবাহনের অর্থনৈতিক মেয়াদকাল অন্তত পাঁচ বছর করে বাড়ানোর দাবি তুলেছেন পরিবহনমালিকরা। পাশাপাশি সড়কে দুর্ঘটনার দায়ে পরিবহনমালিক, চালক ও চালকের সহকারীদের জেল-জরিমানার বিধান আরও কমিয়ে আনার জন্য নানা তোড়জোড় করছেন তারা। এসব কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিআরটিএর অভিযান গতি হারিয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরাতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একাধিক সভার কার্যবিবরণী নথি এসেছে খবরের কাগজের হাতে। সেসব নথিতে উঠে এসেছে বাস, ট্রাকমালিকদের নানা দাবি-দাওয়ার কথা।
এই প্রসঙ্গে বিআরটিএর চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেসরকারি বাসমালিকরা এমন কিছু দাবি তোলেন, যেগুলো বিদ্যমান সড়ক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে সড়ক আইনের ধারা বদল করা যাবে না তা তো নয়। পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে সেই ধারাগুলো সংশোধন করা যায়। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। সড়ক আইনে কোন কোন ধারা সংশোধন করা যাবে এ বিষয়ে আগামী ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।’
বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা আইনের বাইরে গিয়ে কিছু বলতে পারব না। সড়ক আইনে এখন যে ধারা বিদ্যমান, আমরা সেই ধারা অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করছি। আমাদের অভিযানে বাসমালিকরা চূড়ান্ত অসহযোগিতা করছেন, এ অভিযোগ পুরোপুরি সত্যি না। তারাও চান, সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ বাস উঠিয়ে নেওয়া হোক। এখন তারা কিছু দাবি জানিয়েছেন। সেগুলো নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কমিটি কাজ করছে।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. সরওয়ার এ বিষয়ে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হলে কোর্টে মামলা হয়ে যায়। কোর্ট থেকে মোটরযানের মালিকানার তথ্য চাওয়া হয়। বিআরটিএ থেকে মালিকানার তথ্য যাচাই করে কোর্টকে অবহিত করে মোটরযানটি মালিকের জিম্মায় দেওয়া হয়। তিনি বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে মোটরযানটি মালিকের জিম্মায় হস্তান্তরে আগ্রহ থাকলেও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে সময়ক্ষেপণ হয়ে থাকে। সড়ক পরিবহন আইন অনুসারে জব্দ করা গাড়ি যথাসময়ে মালিকের জিম্মায় দিতে চায় পুলিশ।
এ প্রসঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক আরমানা সাবিহা হক বলেন, ‘আমাদের দেশের সড়কের প্রেক্ষাপটে কোনো যানবাহনের অর্থনৈতিক মেয়াদকাল নির্ধারণ করা সম্ভব না। বাসমালিকরা দাবি করছেন, পরিচালনার মেয়াদকাল (অপারেটিং লাইফ) নির্ধারণ করা হোক। কিন্তু বাসের যে মডেল দেখি, আমরা তাতে অপারেটিং লাইফও নির্ধারণ করতে পারি না। কোনো যানবাহনের অর্থনৈতিক মেয়াদকাল নির্ধারণ করতে গেলে তার যন্ত্রাংশ সংযোজনের (ম্যানুফ্যাকচারিং) বিষয়গুলো প্রাধান্য দিতে হবে। দেখতে হবে, এ বাস বা ট্রাকটি কতটা জ্বালানি পোড়াচ্ছে, তা কতটা পরিবেশদূষণ করবে। হুট করে বাসমালিকদের ওপর কোনো মেয়াদকাল চাপিয়ে দিলে তারা তা মানতে চাইবেন না।’
জানা যায়, গত ১০ আগস্ট বিদ্যুৎ ভবনে পরিবহনসংশ্লিষ্ট সভায় সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। ওই সভায় সড়ক পরিবহন আইনের নানা ধারা নিয়ে আপত্তি তোলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিনিধিরা। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি থানায় আটক হলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মালিকের জিম্মায় দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবহনমালিকরা। তারা সড়ক পরিবহন আইনের ৯৮, ১০৫ নম্বর ধারা নিয়ে আপত্তি তোলেন। ৯৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গতিতে বা বেপরোয়াভাবে অথবা ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বা ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটালে চালক, চালকের সহযোগীর তিন বছরের কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা জরিমানা হবে। এ আইনে উভয় দণ্ডের কথাও বলা আছে। ১০৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার কারণে কেউ মারা গেলে বা গুরুতর আহত হলে চালকের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা হবে। এই আইনেও উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির বলেন, ‘এই দুটি আইনের অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে। যে পরিমাণ অর্থ দণ্ডের বিধান রয়েছে, তা একজন চালকের পক্ষে পরিশোধ করা কোনোভাবে সম্ভব না।’