বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) ‘ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। প্রকল্প দপ্তর এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নানা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ব্যয় বৃদ্ধির ওই তথ্য পাওয়া গেছে। আইএমইডি বলছে, প্রকল্পের নির্মাণ কাজে ধীরগতির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে।
এদিকে ওই প্রকল্পে ১৬ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও প্রকল্পে নিয়োজিত দেশীয় ঠিকাদারকে নানা অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া থাকলেও ওই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত নির্মাণ কাজের লক্ষ্যমাত্রা ৬৮ শতাংশ নির্ধারণ করা ছিল। তবে বাস্তবে অর্জিত হয়েছে ৫৫ শতাংশ। প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, বিলম্বের জন্য প্রকল্প ব্যয় বাড়বে যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় বোঝা হতে পারে।
তিন বছরে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৩২০ কোটি টাকা
২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন হয়। তখন প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। ২০২২ সালের জুন মাসে এই প্রকল্প শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। পরে ডিপিপি সংশোধন করা হয় এবং প্রকল্পের সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন মাসে নির্ধারণ করা হয়। তখন মূল প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে ৬৫১ কোটি টাকা বেড়ে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকায়।
আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, গত তিন বছরে এই প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্পের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি পরিসঞ্চালন লাইন স্থানান্তর (ইউটিলিটি শিফটিং) করতে এখন ৫১৫ কোটি টাকা ব্যয় বাড়বে বলে খবরের কাগজকে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম।
এ ছাড়া ডলার বিনিময় হার পরিবর্তন বড় প্রভাব ফেলেছে প্রকল্প ব্যয়ে। অনুমোদিত মূল ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রাইস কন্টিজেন্সি ছিল ৬৩৭ কোটি টাকা। প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে এ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পায় ৬৩৮ কোটি টাকা। (অপ্রত্যাশিত খরচ বৃদ্ধি বা দামের পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রকল্প চুক্তিতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ থাকে, যা হলো প্রাইস কন্টিজেন্সি)।
মূল উড়াল সড়ক (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) নির্মাণ করতে বরাদ্দ ছিল ৭ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা, সংশোধনের পরে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪২২ কোটি টাকায়। এ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৩১ কোটি টাকা।
র্যাম্প নির্মাণ করতে ৩৩ কোটি টাকা এবং ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে ১১ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। সড়ক পুনর্নির্মাণ করতে মূল ডিপিপিতে সংস্থান রাখা হয়েছিল ৬৪৬ কোটি টাকা। পরে এ খাতে ব্যয় বাড়ে ৪৩ কোটি টাকা। সেতু নির্মাণ করতে ব্যয় বেড়েছে ২০ কোটি টাকা। টোল প্লাজা নির্মাণে ১৬ কোটি টাকা এবং ট্যাক্স বা ভ্যাট পরিশোধে ৪০৫ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ছে।
ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়ক প্রকল্পটি সরকার-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১৫ সালে। ২০২১ সালে চায়না এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ২০২২ সালের মে মাস থেকে কার্যকর হয়। ২০২২ সালের ১২ নভেম্বর থেকে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
অস্ট্রেলিয়া ও ডেনমার্কের দুটি প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে। তারা প্রকল্পের ঠিকাদারি কার্যক্রমের জন্য প্রাথমিক দর দিয়েছিলেন ১ হাজার ১২০ কোটি টাকা। তবে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএমসি তাদের প্রাক্কলিত দর দিয়েছে ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে সিএমসির প্রাথমিক দর অনুমানের চেয়ে ১০৮ কোটি টাকা বেশি। সবশেষে নানা আলোচনার পর প্রকল্পের কারিগরি কমিটি সব ভ্যাট বা কর বাদ দিয়ে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ১ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা দর নির্ধারণ করেছে।
বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট অডিট অধিদপ্তর বলেছে, চুক্তির শর্ত মোতাবেক প্রকল্পের নকশা ও প্রকল্প কার্যক্রম নজরদারির ওপর কোনো মূল্য সমন্বয় করে ঠিকাদারকে দেওয়া যাবে না। কিন্তু চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে সেই অর্থ ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। প্রাক্কলন মূল্য থেকে অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যে চুক্তি করা হয়েছে বলে বৈদেশিক সংস্থাটি অডিট আপত্তিতে জানিয়েছে।
অতিরিক্ত ৫১৬ কোটি টাকা চেয়েছে সেতু বিভাগ
এ বছরের জুলাই মাসে সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত ৫১৬ কোটি টাকা চেয়ে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়াবে ১৮ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। সেতু বিভাগ পরিকল্পনা কমিশনকে জানিয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে এই অর্থ না পেলে ৯ কিলোমিটার গুরুত্বপূর্ণ অংশের কাজ থমকে যেতে পারে। এতে নির্মাণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদার ক্ষতিপূরণের দাবি তুলতে পারে।
তবে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি অর্থবছরে এই প্রকল্পে বরাদ্দ হওয়া নির্ধারিত অর্থ যথাসময়ে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তারপরও চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রকল্প কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে নির্মাণ কাজ যথাযথ গতি পায়নি। প্রকল্পের অবকাঠামোগত ৫৫ শতাংশ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সেসব কাজেও বিস্তর অনিয়মের চিত্র আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রকল্পের জন্য ঢাকা ও গাজীপুর জেলার কিছু অংশে এখনো ১০ দশমিক ১৬৫৩ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ বাকি রয়ে গেছে। ঢাকা ও গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে প্রকল্প কর্মকর্তাদের দেনদরবার চলছে এ নিয়ে। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ওয়াসা এবং তিতাস গ্যাসের সঙ্গেও ইউটিলিটি স্থানান্তর নিয়ে নানা জটিলতা আছে। এসব প্রতিষ্ঠান ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরের কাজে মোটা অঙ্কের বিল দাবি করেছে। তবে প্রকল্পের এই খাতে কোনো অর্থের সংস্থান রাখা হয়নি। অন্য খাত থেকে টাকা এনে বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে প্রকল্প কর্মকর্তাদের। এতে উড়াল সড়ক এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
১৬ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার অডিট আপত্তি
বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর প্রকল্পের নানা অনিয়ম নিয়ে অডিট আপত্তি তুলেছে। ১৫টি অডিট আপত্তিতে ১৬ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার অনিয়ম উঠে এসেছে।
প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরও একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঠিকাদার ওই প্রকল্পের ত্রুটির জন্য দায়ী থাকেন। এই সময়ের মধ্যে কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে ঠিকাদারকে তা মেরামত করতে হবে বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাই রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ঠিকাদারের কিছু বিল পরিশোধ করা হয় না। কিন্তু প্রকল্প অফিস সেই বিল পরিশোধ করেছে। ঠিকাদারকে অযৌক্তিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ায় ১৬ হাজার ৫১২ কোটি টাকার অডিট আপত্তি এসেছে।
নির্মাণ কাজের চুক্তি লঙ্ঘন করে ঠিকাদারকে ৪২৯ কোটি ১৯ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে অডিট আপত্তি এসেছে। বিদেশি পরামর্শকের ব্যক্তিগত আয়করের অর্থ সমন্বয় বা চালান জমা করার বিষয়ে ৪ কোটি ২২ লাখ টাকার অডিট আপত্তি এসেছে। প্রকল্পের নানা পণ্য কেনাকাটার হিসাবপত্রে গরমিল দেখা গেছে। তাতে ৫ লাখ টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, চীনা ঠিকাদারি দুই প্রতিষ্ঠানের বাইরে কাউকে কাজ দেওয়া যাবে না। কিন্তু এ প্রকল্পে অনেক দেশি ঠিকাদারকে (সাব-কন্ট্রাক্টর) বিভিন্ন প্যাকেজে নির্মাণ কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে করে প্রকল্পের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অডিট আপত্তি নিয়ে বেজায় নাখোশ প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইএমইডিতে সব অপেশাদার লোক। সরকারের অডিট বিভাগ প্রকল্পের নানা অসংগতি নিয়ে আপত্তি জানাবে, সংশোধনীর জন্য সুপারিশ করবে, এটা স্বাভাবিক। কিছু আইএমইডি বা বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিটের লোকজন অনেক কিছু না বুঝেই এত এত টাকার অডিট আপত্তি লিখে বসে আছে। অডিট আপত্তিতে অভিযোগ এলেই প্রকল্প কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত আসামি বলা যাবে না। আমরা অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করছি।’
বিশেষজ্ঞের ভাষ্য
যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামছুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বৃহৎ প্রকল্পে বিদেশি ঠিকাদারকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া যেন খুব সাধারণ দৃশ্য হয়ে গেছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অঙ্কের টাকা ঋণ নিয়ে আসে। তারা সরকারকে নানাভাবে চাপ দিয়ে নানা সুবিধা আদায় করে নেয়। তাই নতুন করে কোনো বড় প্রকল্পের চুক্তি করতে গেলে ডিপিপিতেই সে বিষয়গুলোর সুরাহা করা দরকার। কে কী সুবিধা নেবে, কীভাবে প্রকল্পের লগ্নি করা টাকা উঠিয়ে নেবে তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা ভালো।’