বকেয়া আদায়ে এবং ব্যবসায়ীদের রাজস্ব জালের আওতায় আনতে এবার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এনবিআরের একটি প্রতিবেদন থেকে এসব জানা যায়।
সম্প্রতি এনবিআরের প্রাথমিক জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী রাজস্ব (কর-ভ্যাট-শুল্ক) দেন না। অনেকে দিলেও কম দেন। অথচ এদের অনেকে রমরমা ব্যবসা করেন। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঠিকমতো ভ্যাট আদায় করেন। আদায় করা ভ্যাট নিজের পকেটে রেখে দেন। বছরের পর বছর রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের ছোট-বড় সংগঠনগুলোর অনেক সদস্যের অনলাইনে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (ইটিআইএন) পর্যন্ত নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন নেই।
গত পাঁচ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট ভ্যাট (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) আদায়ের গড়ে ৬০ শতাংশ পরিশোধ করে ১১০টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। দেশে ব্যবসায়ী আছেন কমপক্ষে ৩ কোটি। এফবিসিসিআইয়ের সদস্য সংগঠন হিসেবে ৮৩টি চেম্বার ও ৪০১টি অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে।
সরকারের নির্দেশে আরও বলা হয়েছে, বকেয়া আদায়ে এবং রাজস্বের আওতায় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের আনতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজে জোর আনতে হবে। এনবিআরের উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর নজরদারি করতে হবে। এসব পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া ব্যবসায়ীদের ধরতে ব্যবসায়ী সংগঠনের সহযোগিতা নিতে হবে। এ জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এনবিআরের সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে।
সরকারের এমন নির্দেশ পাওয়ার পর প্রতি মাসে একবার করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর। এ বৈঠকে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে কাস্টমস, আয়কর ও ভ্যাট বিষয়ে মাঠপর্যায়ে তাদের সমস্যার কথা সরাসরি এনবিআর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কাছে বলবেন।
বৈঠকে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ শুনে তার সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষভাবে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে তার সমাধানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এনবিআর কর্মকর্তারা। ব্যবসায়ীদের সমস্যার সমাধান হয়েছে কি না বা সম্পূর্ণ সমাধান না হলে কতটা সমাধান হয়েছে, তা পরের মাসের বৈঠকে জানতে চাওয়া হবে। সমস্যার সমাধান না হলে কেন সমাধান হয়নি, এর জন্য এনবিআরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী দায়ী কি না, তা খতিয়ে দেখে দায়ী ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এনবিআরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যবসায়ীদের ভোগান্তিতে ফেললে ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তি দেওয়া হবে। এসব বৈঠকে ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের কাছে তার সংগঠনের কোনো সদস্য রাজস্ব ফাঁকি দিলে, ইটিআইএন না থাকলে বা অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন না করলে তার তথ্য জানিয়ে সহযোগিতা চাওয়া হবে।
আগামী ১০ সেপ্টেম্বর বুধবার বেলা ৩টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এনবিআরে মাল্টিপারপাস হলে (কক্ষ নম্বর-৩০১) এনবিআর ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, ব্যবসায়ীরা রাজস্ব দেন বলেই সরকার রাজস্ব আদায় করতে পারে। এনবিআর ও ব্যবসায়ী একে অপরের শত্রু না, বন্ধু। একে অন্যের সহযোগী হয়ে কাজ করছেন। এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের একই লক্ষ্য দেশের উন্নয়নে অংশ নেওয়া।
তিনি আরও বলেন, সৎ-অসৎ সব জায়গাতে আছে। এনবিআরে যেমন সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, তেমনভাবে অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারীও আছেন। আমরা অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তির আওতায় আনছি। একইভাবে কোনো ব্যবসায়ী যদি রাজস্ব ফাঁকি দেন তাকেও শাস্তির আওতায় আনা হবে। সরকারের দেওয়া সব সুবিধা নিয়েও দিনের পর দিন রাজস্ব ফাঁকি দেবেন, তা মেনে নেওয়া হবে না। সৎ ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সহযোগিতা করছে এনবিআর।
এনবিআরের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন- এমন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে এবং যারা ব্যবসা করলেও এখনো রাজস্বের আওতায় আসেননি তাদের রাজস্বের আওতায় আনতে এবং তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে এবার সৎ ব্যবসায়ীদের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হবে। বিশেষভাবে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা নেওয়া হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ডিসিসিআই মনে করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরাসরি রাজস্ব সংগ্রহ না করলেও বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করে। ঢাকা চেম্বার গবেষণা, ট্যাক্স গাইড, সেমিনার, ডায়ালগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সদস্যদের কর আইন ও সঠিক হিসাবরক্ষণে সচেতন করে। পাশাপাশি সরকারকে নীতিগত সুপারিশ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অটোমেশনের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করে। এ ছাড়া ডিজিটাল ইনভয়েসিং, ই-পেমেন্ট ও পয়েন্ট অব সেল সিস্টেম প্রবর্তনে ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করে রাজস্ব প্রক্রিয়াকে সহজ ও কার্যকর করে তোলে। আমরা বিশ্বাস করি, স্বেচ্ছা কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো কার্যকর রাজস্ব আহরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সৎ-অসৎ সব জায়গায় আছে। আমরা নিয়ম মেনে সৎভাবে ব্যবসা করছি। প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের পাশে ঢাকা চেম্বার নেই। দুর্নীতিবাজ রাজস্ব ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে বকেয়া রাজস্ব আদায়ে সব ধরনের সহযোগিতা করবে ঢাকা চেম্বার। এনবিআরকেও ভোগান্তিমুক্ত সেবা দিতে হবে। এ ছাড়া কোনো ব্যবসায়ীর একার পক্ষে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সম্ভব না। অনেক সময় এনবিআরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে রাজস্ব ফাঁকি দিতে ব্যবসায়ীকে সহযোগিতা করেন। এসব অসাধু কর্মকর্ত-কর্মচারীকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, দেশের সব কর অঞ্চলকে অবিলম্বে রিটার্ন না দেওয়া ফাঁকিবাজ ব্যবসায়ীদের তালিকা করে পাঠাতে বলেছে এনবিআর। শুধু চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত ফাঁকিবাজ ব্যবসায়ীরাই নন, রাজধানী থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেরও ছোট-বড় মার্কেট ও শপিং মলের ব্যবসায়ীদের তালিকাও করা হবে।
প্রতিটি কর অঞ্চলের আওতায় যত ধরনের শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠন, ফাউন্ডেশন, সমিতি, সমবায় সমিতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের সদস্যদের ইটিআইএন আছে কি না, ইটিআইএন থাকলে রিটার্ন জমা দেন কি না, না দিলে তারা কারা এবং কতজন- এসব বিস্তারিত তথ্য নির্দিষ্ট ছকে এনবিআরকে জানাতে হবে। তালিকা পর্যালোচনায় যারা ফাঁকিবাজ হিসেবে চিহ্নিত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে আয়কর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, এটা খুব ভালো উদ্যোগ। সব ব্যবসায়ী রাজস্ব ফাঁকিবাজ না। ব্যবসায়ী সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে এনবিআর সহজে রাজস্ব ফাঁকিবাজ ব্যবসায়ীদের ধরতে পারবে।