চব্বিশতম ব্যাচের কর্মকর্তা, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজনের একান্ত সচিব (পিএস) তিনি। গত মার্চে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় ২৪তম ব্যাচের পদোন্নতির ধারায় নাম ছিল না তার। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের এক মুখ্য সচিবের পিএস এবং ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। প্রশাসনে গুঞ্জন যাচ্ছে, প্রভাবশালী এক উপদেষ্টার এই একান্ত সচিবকে পদোন্নতি দিতে পুরো প্রক্রিয়াটিই রিভিউ করার সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটি।
গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটির সভায় ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি রিভিউ করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত সচিব পদের শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যে আটকে থাকা ২০তম ব্যাচের পদোন্নতি কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার কথা বলা হয়েছে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
২৪তম ব্যাচের পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তা ছিলেন ৩৩২ জন। এর মধ্যে চলতি বছরের মার্চে নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ২৪তম ব্যাচসহ বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসের ১৯৪ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। পদোন্নতি পাওয়া ২৪ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা রয়েছেন ১৩৯ জন।
এদিকে গত ২৬ আগস্ট জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটি পুনর্গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। পুনর্গঠিত এই কমিটিতে সদস্যসচিব হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে এই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
পাশাপাশি পুনর্গঠিত কমিটিতে প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিনকে কমিটির নতুন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৭ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সভাপতি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ছাড়াও মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন সচিব।
আলোচিত কর্মকর্তা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী এক উপদেষ্টার একান্ত সচিব। তিনি ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা হলেও গত মার্চে পদোন্নতির জন্য যোগ্য বিবেচিত হননি। একই ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্যসচিবের পিএস পদে দায়িত্ব পালন করার সুবাদে এই কর্মকর্তা ঢাকার পাশের গুরুত্বপূর্ণ এক জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগ পান। তখন মন্ত্রিসভা বৈঠকে তার বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করেন সেই এলাকা থেকে নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রী। এতে বিব্রত হয়ে সভা থেকে বের হয়েই অভিযুক্ত ডিসিকে (বর্তমানে উপদেষ্টার পিএস) প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এই অভিযোগের কারণেই ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ২ মাস আগে এই কর্মকর্তাকে ডিসি পদ থেকে প্রত্যাহার করে সরকার।
একই ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকায় এই কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া না হলেও নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে ডিসি পদ থেকে প্রত্যাহারের ঘটনাকে এখন আওয়ামী লীগবিরোধী কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রমাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে তার। এটাই উপদেষ্টাকে বুঝিয়ে নিজের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে চাইছেন আলোচিত এই একান্ত সচিব। তবে রিভিউ হলে ২৪তম ব্যাচের আরও কিছু কর্মকর্তা পদোন্নতি পাবেন বলে একে ভালো উদ্যোগ বলছেন তারা।
রিভিউ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, পদোন্নতি বঞ্চিত হলে যেকোনো কর্মকর্তাই তার পদোন্নতি রিভিউ করার আবেদন করতে পারেন। সরকারও এই আবেদন বিবেচনায় নিয়ে একই পদে পরবর্তী পদোন্নতির সময় বিবেচনা করে থাকে। এটা প্রশাসনের একটি চলমান ধারা।
পাশাপাশি প্রশাসনের নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ২০তম ব্যাচের যুগ্ম সচিব পদের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়েছে। মাঝে শূন্য পদ নেই, এ কারণে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু হলেও আবার থেমে যায়। জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে আবার তা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে এসএসবি ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতি বঞ্চিত এই ব্যাচের কর্মকর্তারা এবার আশা করছেন তাদের পদোন্নতি হবে।
অতিরিক্ত সচিব পদে ২০তম ব্যাচের প্রায় ২০০ কর্মকর্তাকে বিবেচনার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে ১২০ থেকে ১৩০ জনকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী (ডিসি) কর্মকর্তা, আর্থিক অনিয়মে অভিযুক্ত কর্মকর্তাসহ যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে, তারা পদোন্নতির বিবেচনায় থাকছেন না বলে জানা গেছে। এর সঙ্গে ১৭ ও ১৮ ব্যাচের কিছুসংখ্যক বঞ্চিত কর্মকর্তার পদোন্নতি বিবেচনায় আনা হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
২০তম ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, সরকারের আদেশ পালন করেছি মাত্র। চাকরিবিধি অনুযায়ী সরকার চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো সমমর্যাদার পদে একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতে পারে। এখানে পদায়ন হওয়া কর্মকর্তার সরকারি নির্দেশ অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, এতে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, সরকারের অনেক অতিরিক্ত সচিবের পদ শূন্য রয়েছে। এসব শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যে কর্মকর্তা প্রয়োজন। তাই নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে পদোন্নতির প্রক্রিয়া থেমে থাকার বিষয়টি স্বীকার না করে এই কর্মকর্তা বলেন, সরকার তার প্রয়োজন অনুযায়ী শূন্য পদ পূরণ করে থাকে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়।
এই ব্যাচের কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের (২০২৪ সাল) নভেম্বরে তারা সাধারণ নিয়মে পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য হয়েছেন।