পাচারকারী একটি চক্র ১০টি প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে জাল কাগজপত্র দেখিয়ে ১ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৬৮ চালানে এই অর্থ পাচার করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবআির) তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে মেসার্স ফেডারেল ইলেকট্রিক লিমিটেড, জইতা ও জামি ফেব্রিকস লিমিটেড, এমি ড্রাই ফ্যাশন লিমিটেড, নুজহাত ক্লিনিক, উত্তরবঙ্গ সেন্ট্রাল হাসপাতাল লিমিটেড, শায়ন সোয়েটার লিমিটেড, এমি গার্মেন্টস, তাংকনি-তাইনা গার্মেন্টস লিমিটেড, জোহা ফ্যাশন লিমিটেড এবং লিপটন কেমিক্যাল লিমিটেডের নাম ব্যবহার করে অর্থ পাচার করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থ পাচার বন্ধে গুরুত্ব বাড়ায়। এ সময় আবদুর রহমান খানকে এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি এনবিআরের দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থ পাচার বন্ধ এবং এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। আবদুর রহমান খান এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল এবং শুল্ক শাখার কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে অর্থ পাচার বন্ধে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার নির্দেশ দেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে টাস্কফোর্স কমিটি অর্থ পাচারকারী সন্দেহে একশরও বেশি প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে। এ তালিকায় ওই ১০ প্রতিষ্ঠানও ছিল।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে অর্থ পাচারকারী দুই প্রতিষ্ঠানের একটি শায়ন সোয়েটার লিমিটেডের নামে দুই কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং লিপটন কেমিক্যাল লিমিটেডের নামে ৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা আগের মতো একইভাবে পাচার করতে গেলে বন্দরের শুল্ক কর্মকর্তারা ধরে ফেলেন।
এরপর টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা এই দুই প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানির তথ্য জোগাড় করেন। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক কারা, কারখানার ঠিকানা কী, কোন ব্যাংকে এলসি আছে, কোন দেশের কোন প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ এবং কোন ধরনের পণ্য রপ্তানি করেছে, এসব তথ্য জোগাড় করেন। কোন দেশের কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল আমদানি করা হয়েছে তার তথ্যও খতিয়ে দেখেন তারা।
তদন্তে দেখা যায়, শায়ন সোয়েটার লি. এবং লিপটন কেমিক্যাল লিমিটেড এই দুই প্রতিষ্ঠানের কারখানার ঠিকানা একই। কারখানার খোঁজ করতে গিয়ে সেখানে দোকানের অস্তিত্ব পেয়েছেন টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা। মালিক আলাদা আলাদা ব্যক্তি। মালিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র জাল। শায়ন লি. ও লিপটন লি. দুবাইয়ের দুটো ভিন্ন নামের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল আমদানি করার কথা বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরকে জানিয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, ভিন্ন নাম হলেও বিদেশে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা একই। এসব বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে কাঁচামাল কিনতে কয়েক দফা অর্থ পাঠানো হয়েছে। কাগজপত্র দিলেও বিদেশে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। নামমাত্র কিছু পণ্য রপ্তানি করা হলেও পণ্যের মূল্য হিসেবে একটা টাকাও দেশে আনা হয়নি।
এসব প্রতিষ্ঠান যত দামের পণ্য আমদানি করেছে, এলসি খুলে দাম হিসেবে তার থেকে কয়েক গুণ বেশি অর্থ পাঠিয়েছে। আমদানি করা কাঁচামাল এনে দিয়ে নামমাত্র পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানি করা পণ্যের মূল্য হিসেবে একটি অর্থও দেশে আনা হয়নি। এই দুই প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা কাঁচামালের শেষ তিনটি চালান বন্দর থেকে একই ব্যক্তি ছাড়িয়ে নেন।
অন্যদিকে মেসার্স ফেডারেল ইলেকট্রিক লিমিটেড ও এমি ড্রাই ফ্যাশন লিমিটেডের ঠিকানা হিসেবে আশুলিয়ার একটি ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গ সেন্ট্রাল হাসপাতাল লিমিটেডের মালিক এবং জোহা ফ্যাশন লিমিটেডের মালিক হিসেবে একই ব্যক্তির নাম ও জাল জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবে ১০ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয়ে একটি বিশেষ চক্রের যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তদন্ত করে নিশ্চিত হন যে এই ১০ প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে একটি চক্র সংঘবদ্ধভাবে অর্থ পাচার করেছে।
অর্থ পাচারের কৌশল হিসেবে, বেশি দামের বেশি পরিমাণের কাঁচামাল আমদানির কথা বলে ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে কম পরিমাণ এবং কম দামের পণ্য এনেছে। পক্ষান্তরে, প্রকৃত দামের চেয়ে পাঠানো হয়েছে কয়েক গুণ বেশি অর্থ। যে পরিমাণ অর্থের পণ্য রপ্তানি করার কথা প্রকৃতপক্ষে তার চেয়ে অনেক কম পরিমাণে নিম্নমানের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। কিন্তু রপ্তানি করা পণ্যের দাম হিসেবে কোনো অর্থ আনা হয়নি।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, অর্থপাচার রোধে বর্তমান সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। পাচারকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হবে। কোন কৌশলে, কারা পাচার করেছেন, তা চিহ্নিত করে আটকানো হচ্ছে। পাচারকারীরা যত কৌশলই করুক, তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে না।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই ১০ প্রতিষ্ঠানের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নাই। পাচারকারী চক্র ব্যাংক, এনবিআর, বন্দরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাল কাগজপত্র দেখিয়ে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। প্রণোদনা, নগদ সহায়তা, শুল্কমুক্ত সুবিধা, অগ্রাধিকারে ভিত্তিতে ঋণপত্র বা এলসি খোলা, বন্দরে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পণ্য খালাস এবং জাহাজে ওঠানোর মতো সুবিধা নিয়েছে। তারা বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে এমন সব ব্যক্তিকে দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে এসব সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই ১০ প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রাপ্তির তালিকায় থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের নামে কাঁচামাল আমদানিতে একটি টাকার শুল্ককর সরকারি তহবিলে জমা দিতে হয়নি। রাজস্ব আইন অনুসারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামালের সবটা উৎপাদনে লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে আইন ভঙ্গ করে আমদানি করা কাঁচামালের পুরোটাই পাচারকারী চক্র খোলা বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের কারখানার ঠিকানা হিসেবে যেসব জায়গার নাম দেওয়া হয়েছে, সেসব জায়গায় একটি কারখানারও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কাগজকলমে যেসব ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, সেসব ঠিকানায় গিয়ে এনবিআরের কর্মকর্তারা আবাসন ভবন, দোকান, বিউটি পার্লার, খোলা জায়গা, গাড়ির গ্যারেজ, ছাত্রী হোস্টেল এসব পেয়েছেন।
এ বিষয়ে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মো. হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, সব জায়গায় ভালোমন্দ, সৎ-অসৎ থাকে। ব্যবসায়ী নামধারী কিছু ব্যক্তি দুর্নীতি করেছেন, অর্থ পাচার করেছেন। এসব অর্থ পাচারকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবে এসব অপকর্ম কোনো ব্যক্তির একার পক্ষে করা সম্ভব হয় না। ব্যাংক, এনবিআর, বন্দরের অসাধু কর্মকর্তা- কর্মচারীদের সহযোগিতা ছাড়া অর্থ পাচার করা সম্ভব নয়। বিনিময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই বড় অঙ্কের ঘুষ, অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। এই অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি করছি।