পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে ওয়ার্ড বা পোষ্য কোটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন অংশীজনরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তান ও স্বামী-স্ত্রী এই কোটায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে শিক্ষার্থীরা এই কোটা বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ইস্যুতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে এই কোটার নিয়মও ভিন্ন ভিন্ন। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটাই নেই। নানা সময়ে এই কোটার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি নানা অস্বচ্ছতাও সামনে এসেছে। তবে কোটার দাবিদাররা বলছেন, বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য এ ধরনের সুবিধা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। যেহেতু ওয়ার্ড কোটা নিয়ে কথা হচ্ছে, শিক্ষক-কর্মকর্তারা একদিকে, ছাত্ররা অন্য দিকে। তাই ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করতে হবে।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের স্পিরিটের কথা যদি বলি, তাহলে এই কোটা রাখা উচিত না। এই আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়ার্ড কোটা আছে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এটাও বৈষম্য। থাকলে সবার জন্য থাকবে, না থাকলে কারও জন্য থাকবে না।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং কর্মকর্তাদের সন্তানরা তো মধ্যবিত্ত। তারা এই সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু চা-বাগানের শ্রমিকের সন্তানরা তো পাচ্ছেন না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই কোটা রাখাটা নীতিগতভাবে ঠিক না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় তো চলে সরকারি পয়সায়। সরকারি পয়সা মানে জনগণের পয়সা। এখানে সবার সমান অধিকার থাকবে। সবাই মেধার ভিত্তিতে আসবে।’ তিনি বলেন, ‘অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পেয়ে কেউ চান্স পাবে কোটায়, তার চেয়ে ভালো নম্বর পেয়ে অন্য কেউ বাদ পড়বে, সেটা তো হয় না। কোটার বিরুদ্ধে এত আন্দোলন, তারপরও কোটা থাকবে কেন? কোটা না থাকাই বাঞ্ছনীয়।’
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীরা পোষ্য কোটা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। গত বছর কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে নতুন করে এই দাবিতে সরব হন শিক্ষার্থীরা। বেশি সরব হতে দেখা যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য বা ওয়ার্ড কোটায় বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা চলছে। প্রথমে শর্ত সাপেক্ষে কোটা বহাল রেখে আবার স্থগিত করা হয়। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে রয়েছে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি আন্দোলনের মুখে উপাচার্য পোষ্য কোটা বাতিল করেন।
গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ওয়ার্ড কোটা বাতিলের দাবিতে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেন শিক্ষার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেককে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোটার ভিন্ন ভিন্ন নিয়মের কথা জানা গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছরে ১৪৮ জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বিভাগে কমপক্ষে ২ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬৬ জন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৮ জন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জনের ভর্তির সুযোগ রয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটার আসনসংখ্যা অনির্দিষ্ট।
রেজিস্ট্রার অফিস ও কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসে যোগাযোগ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটা ঠিক কবে থেকে চালু হয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট অনেকের ধারণা, এই কোটায় অনেক আগে থেকেই ভর্তি চলে আসছে। তবে বিভিন্ন সময় এই কোটায় ভর্তির ক্ষেত্রে নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ভর্তি কমিটি এই নিয়ম নির্ধারণ করে দেয়। যেখানে প্রতি বিভাগে ওয়ার্ড কোটায় দুজনকে ভর্তি করানোর সুযোগ রাখা হয়। কোটার আসন মূল আসনের অতিরিক্ত হিসেবে ধরা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক খবরের কাগজকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তারা সরকারের অন্য কর্মকর্তাদের তুলনায় সেরকম সুবিধা পান না। অন্যরা সুদমুক্ত গাড়ি কেনা, প্লট পাওয়াসহ বিভিন্ন সুবিধা কোটার ভিত্তিতে পেয়ে থাকে। যদি ওয়ার্ড কোটা বাদ দিতে হয়, তাহলে সবখান থেকে কোটা তুলে দিতে হবে।
আরেকজন অধ্যাপক বলেন, এটা এক ধরনের ইনসেনটিভ। ভালো স্টাফদের ধরে রাখার জন্য এসব সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টাফদের সন্তানদের ভর্তির সুযোগ যেমন আছে; পাশাপাশি টিউশন ফি কম রাখার নজির আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম খাদেমুল হক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘কোটা নিয়ে এক তোলপাড়ে সরকার পড়ে গেল! বছর ঘুরতে না ঘুরতে আবার সেই কোটা নিয়ে তোলপাড়; শিক্ষার্থীর হাতে লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন শিক্ষক। কেউ কেউ এখন এ নিয়ে আক্ষেপও করছেন! কিন্তু আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। আমাদের পণ্ডিতরা তো সব এক কথায় উড়িয়ে দিচ্ছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে পোষ্য কোটা নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গেই যায় না!
তিনি লিখেছেন, ‘তো একটু খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম নর্থ আমেরিকায় এটা খুবই স্বাভাবিক। আমেরিকান ‘আইভি লিগ’ ইউনিভার্সিটিগুলোর সব কটিতেই আছে লিগ্যাসি প্রেফারেন্স, যার মধ্য দিয়ে ওই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীদের সন্তানরা ভর্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা থাকলে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। এই ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে লিগ্যাসি স্টুডেন্ট হিসেবে আবেদনকারীদের ৩৩ শতাংশ ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন, যেখানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাত্র ৬ শতাংশ ভর্তির সুযোগ পেয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে যুক্তিটা হলো, সন্তানদের পরিবারের সঙ্গে রাখার সুযোগ পেলে শিক্ষক-কর্মচারীরা নির্ভার হয়ে কাজ করতে পারেন।’
তিনি আরও লিখেন, ‘লিগ্যাসি প্রেফারেন্স-এর বিপক্ষে জনমত গড়ে ওঠার প্রবণতা একেবারে সাম্প্রতিক। আর সেই সূত্র ধরে বিগত কয়েক বছরে ২০ শতকের গোড়ার দিক থেকে প্রচলিত এই সুবিধা বাতিল হচ্ছে কোথাও কোথাও। তবু শুধু কলোরাডো, মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া আর ক্যালিফোর্নিয়া ছাড়া অন্য সব স্টেটেই এখন প্রবল প্রতাপে বিদ্যমান!’
তবে এই পোস্টে একজনের মন্তব্য ছিল, হার্ভার্ড প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই পলিসি নিলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটা অযৌক্তিক।