ঢাকা ৭ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মালয়েশিয়ায় কারাবন্দি বাংলাদেশিদের মুক্তিতে উদ্যোগের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর প্রথমার্ধে সৌদি আরবের জালে ৩ গোল স্পেনের তীব্র গরমের পর স্বস্তির বৃষ্টি প্রথম গোলেই ইতিহাস গড়লেন ইয়ামাল সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেনের দাফন সম্পন্ন সিংগাইরে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু সুরের মূর্ছনায় বিশ্ব সংগীত দিবস: ঢাকার দুই প্রান্তে সুরের বিভা কুড়িগ্রামে এক বাঘা আইড় ৮৫০০০ অজু করার সময় বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৩ মাদরাসাছাত্রের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলায় দণ্ডিত ৫৯ জন: আইনমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ‘অসত্য’ বক্তব্য, উত্তপ্ত সংসদ স্পেনের শুরুর একাদশে ইয়ামাল সুফিয়া কামাল ও আবু হেনা মোস্তফা কামালের স্মরণে জবিতে দুই দিনব্যাপী সেমিনার শুরু মানিকগঞ্জে ঝোপে মিলল স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ মালয়েশিয়ায় তারেক রহমান, বাণিজ্য–বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা দিনাজপুরে কোল্ডস্টোরেজে আলু সংরক্ষণ ফি ৫ টাকা নির্ধারণের দাবিতে মানববন্ধন চট্টগ্রামে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ শরীয়তপুরে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদরাসা শিক্ষক আটক স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য নয়: ইসি সচিব বোয়ালমারীতে শতবর্ষী কালী মন্দিরে ভাঙচুর চাঁদাবাজির অভিযোগে সোনারগাঁওয়ের এমপি পুত্র সজীব আটক প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন তারেক রহমান মাদারগঞ্জে বজ্রপাতে এক বৃদ্ধের মৃত্যু ‘কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে আনার উদ্যোগ নিচ্ছেন’ আধ্যাত্মিক ধনী হওয়ার সহজ সমীকরণ যুদ্ধবিরতির পথে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংলাপ শুরু জেনেভায় সিলেটে টানা বৃষ্টি, বন্যার শঙ্কা পাউবোর বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২০২৭: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা গাজীপুরে নিষিদ্ধ আ. লীগের বিক্ষোভ মিছিল প্রযুক্তির অপচ্ছায়া সড়কে ‘এআই ক্যামেরা’ ও অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি

১০ অক্টোবরের পর প্রার্থীদের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত বিএনপির

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৫, ১১:১৯ এএম
আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৫, ১১:২৭ এএম
১০ অক্টোবরের পর প্রার্থীদের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত বিএনপির
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

দেশে না থাকলেও নির্বাচনের ব্যাপারে সব ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সরকারি ও বেসরকারি মোট সাতটি মাধ্যম থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করেছেন তিনি। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে ইতোমধ্যে ১৮০ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দিতে যাচ্ছেন। আগামী ১০ অক্টোবর পর প্রার্থীদের চূড়ান্ত বার্তা বা সবুজ সংকেত দেবেন তিনি। দুই মাস ধরে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি কথাও বলেছেন তারেক রহমান।
 
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সরকারি ও বেসরকারি দুই মাধ্যম থেকেই তথ্য সংগ্রহ করছেন তিনি। সরকারি তিনটি মাধ্যম হলো জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) এবং পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। এই তিনটি সংস্থার কাছ থেকে কোন নির্বাচনি আসনে কোন নেতার জনপ্রিয়তা কেমন এটি জানার পাশাপাশি নেতাদের ইমেজের বিষয়েও তিনি খোঁজখবর নিয়েছেন।

বেসরকারি চারটি মাধ্যমের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ছাত্রদলের নিরপেক্ষ নেতাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা। বিশেষ করে সংগঠনটির বড় কোনো পদে নেই, আবার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথাও ভাবছেন না, এমন নেতাদের মাঠপর্যায়ে পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সারা দেশে বিএনপিপন্থি শিক্ষক সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। তিনি মনে করেন, শিক্ষকরা তুলনামূলক নিরপেক্ষ। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমসহ বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী সাংবাদিকদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিএনপিপন্থি প্রভাবশালী একজন সাংবাদিক এই বিষয়টি সমন্বয় করছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া তারেক রহমানের আস্থাভাজন তথা ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকেও মতামত নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছে।
 
সূত্র জানায়, এসব মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহের পর যারা মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে রেটিংয়ে এগিয়ে আছেন, তাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি কথা বলছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তবে যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী একাধিক প্রার্থী নেই তাদের অনেককে ইতোমধ্যে সবুজ সংকেত দিয়েছেন তিনি। ওই প্রার্থীরা ইতোমধ্যে স্ব-স্ব এলাকায় নির্বাচনি প্রচারও শুরু করেছেন। যদিও এগুলোকে চূড়ান্ত বা আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন বলতে রাজি নয় বিএনপি। ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী সাবেক মন্ত্রী ও এমপিদের মনোনয়ন পাওয়া নিশ্চিত।
 
তবে এলাকায় নির্বাচনি ঢেউ তোলা, তথা প্রচারের সুবিধার্থে আগামী ১০ অক্টোবরের পর প্রার্থীদের সবুজ সংকেত প্রশ্নে গণমাধ্যমে বা অন্য কোনো উপায়ে এ ধরনের বার্তা দিতে চায় বিএনপি। অপর একটি সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ভিডিও বার্তার মাধ্যমেও নেতা-কর্মীদের সবুজ সংকেত দিতে পারেন। ওই সময় প্রার্থীদের একটা তালিকাও প্রকাশ করা হতে পারে।
 
তবে সংকেত পাওয়া নেতাদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হবে। নির্বাচনি আসনে সবুজ সংকেত পাওয়া নেতারা যদি সব নেতা-কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে না পারেন, গ্রুপিং-কোন্দলে জড়িত হন, তাহলে তারা ‘রেড জোন’-এ পড়তে পারেন। অর্থাৎ তাদের মনোনয়ন বাতিল হয়ে যেতে পারে। 
উল্লেখ্য, বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ড দলটির প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন দিয়ে থাকে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সাংগঠনিক সম্পাদকরা মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট জেলা বিএনপির শীর্ষ দুই নেতারও মতামত নেওয়া হয়। তবে তাদের কেউ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলে তাদের ডাকা হয় না।
 
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। নির্বাচনি আসনে কে বেশি জনপ্রিয়, কার জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি, সেটাই দেখা হচ্ছে। যাকে দিলে আসন নিরাপদ হবে, তাকেই এবার মনোনয়ন দেওয়া হবে। জরিপ টিমের ফলাফলের ভিত্তিতে মনোনয়ন বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বেগম সেলিমা রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রার্থীদের ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। এর মাধ্যমে এলাকায় কার কী অবস্থান, জনপ্রিয়তা কেমন, তা জানা যায়। প্রার্থীদের সবুজ সংকেত আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হবে। তবে কবে দেওয়া হবে, তা আগাম বলা কঠিন।’ 
যদিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি বলেছেন, ‘খুব শিগগির আসনভিত্তিক একক প্রার্থীকে মাঠে কাজ করার জন্য আমরা গ্রিন সিগনাল দেব। তবে সেটা চূড়ান্ত নয়। তফসিল ঘোষণার পর পার্লামেন্টারি বোর্ডের মাধ্যমে আমরা চূড়ান্ত মনোনয়ন দেব।’
 
সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গুলশান কার্যালয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে বিএনপির হাইকমান্ড। এসব বৈঠকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ ছাড়া প্রত্যেক বিভাগের সঙ্গে কথা বলার সময় বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের দলের ঐক্য বজায় রাখার জন্য তৎপর থাকতে বলা হয়েছে।
 
জানা গেছে, ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ২৪ জনকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। এরা হলেন নোয়াখালী-১ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, নোয়াখালী-২ আসনে জয়নুল আবদিন ফারুক, নোয়াখালী-৩ আসনে বরকত উল্লাহ বুলু, নোয়াখালী-৬ আসনে সাবেক এমপি প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়া, লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে জোটের শাহাদাত হোসেন সেলিম, ফেনী-১ আসনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মজনু, ফেনী-২ আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নাল আবেদীন (ভিপি জয়নাল), ফেনী-৩ আসনে ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু, কক্সবাজার-১ আসনে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ, কক্সবাজার-৩ আসনে সাবেক এমপি লুৎফুর রহমান কাজল, কক্সবাজার-৪ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৫ আসনে মীর হেলাল প্রমুখ।
 
বরিশাল বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সম্প্রতি ভার্চুয়ালি কথা বলেছেন তারেক রহমান। এই বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান ও মাহবুবুল হক নান্নু। এই বিভাগের কয়েকজনকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।

বেশ কয়েকটি আসনে হেভিওয়েট দুজন করে প্রার্থী রয়েছেন। বরিশাল-১ আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, বরিশাল-২ আসনে বিএনপির নির্বাহী সদস্য সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু ও ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইদ মাহামুদ জুয়েল, বরিশাল-৩ আসনে স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন, বরিশাল-৪ আসনে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ, বরিশাল-৫ (সদর) আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার ও নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ, বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম খান রাজন, ভোলা-১ আসনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর ও হায়দার আলী লেলিন, ভোলা-২ আসনে হাফিজ ইব্রাহীম, ভোলা-৩ আসনে স্থায়ী কমিটির মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ভোলা-৪ আসনে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন ও সাবেক এমপি নাজিম উদ্দিন আলম, পটুয়াখালী-১ আসনে ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, পটুয়াখালী-২ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য শহীদুল আলম তালুকদার ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ফারুক তালুকদার, পটুয়াখালী-৩ আসনে নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন, পটুয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন, বরগুনা-১ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মোল্লা, বরগুনা-২ আসনে ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি, ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল ও নিউইয়র্ক মহানগর বিএনপির (দক্ষিণ) সভাপতি হাবিবুর রহমান সেলিম রেজা, ঝালকাঠি-২ আসনে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নু ও সাবেক সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, পিরোজপুর-১ আসনে সাবেক আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান, পিরোজপুর-২ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদ হোসাইন ও ব্যবসায়ী ফখরুল আলম, পিরোজপুর-৩ আসনে মঠবাড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন দুলাল ও মঠবাড়িয়া পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি কে এম হুমায়ুন কবীর। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় থাকা নেতাদের মধ্য থেকেই চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশাল বিভাগের একজন সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিভাগের সম্ভাব্য প্রার্থী ও দায়িত্বশীল সবার সঙ্গে কথা বলেছেন। সবাই বলেছেন, বিগত ১৭ বছর দলের জন্য যারা রাজপথে ছিলেন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের যেন মনোনয়ন দেওয়া হয়। তবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কথা বলেছেন।
 
এ ছাড়া ঢাকা-৪ আসনে মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন, ঢাকা-৮ আসনে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ঢাকা-১৩ আসনে জোট শরিক এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, ঢাকা-১৪ আসনে যুবদল নেতা শফিকুল ইসলাম মিল্টন, ঢাকা-১৫ আসনে যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মামুন হাসান, ঢাকা-১৬ আসনে উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক, ঢাকা-১৭ আসনে জোট শরিক বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, ঢাকা-৬ আসনে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন ও বিএনপির সমাজ কল্যাণবিষয়ক সহ-সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, সিলেট-২ আসনে তারেক রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, সিলেট-৩ আসনে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মানবাধিকারবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার এম এ সালাম, সিলেট-৫ ফাহিম আল চৌধুরী, জামালপুর-১ আসনে বিএনপির কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত, টাঙ্গাইল-৫ আসনে প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, যশোর-৩ আসনে খুলনার সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, খুলনা-৩ আসনে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-৪ আসনে তথ্যবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, ঝিনাইদহ-৪ আসনে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, মাগুরা-২ আসনে নিতাই রায় চৌধুরী, কাজী সলিমুল হক কামাল ও যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, পঞ্চগড়-১ আসনে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিনের ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, সুনামগঞ্জ-১ আসনে যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, পাবনা-২ আসনে এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব, পাবনা-৩ আসনে কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন, পাবনা-৪ আসনে হাবিবুর রহমান হাবিব, পাবনা-৫ আসনে অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ফরিদপুর-২ শামা ওবায়েদ, ফরিদপুর-৪ আসনে কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে জেলা বিএনপির সদস্য কবির হোসেন ভূঁইয়া, শেরপুর-১ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক হযরত আলী, ময়মনসিংহ-১ আসনে যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, নেত্রকোনা-১ আসনে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, টাঙ্গাইল-৩ আসনে নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মাইনুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে সমমনা জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদাকে মাঠপর্যায়ে কাজ করার জন্য সবুজ সংকেত দিয়েছেন। 

ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট
সাইফুল ইসলাম। ছবি: খবরের কাগজ

একসময় যিনি মাঠ প্রশাসনে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে মানুষের বিরোধ মীমাংসা করতেন, আজ নিয়তির নির্মম পরিহাসে তিনিই বন্দি চার দেয়ালের অন্ধকারে। একটি স্বাক্ষর কীভাবে একজন মানুষের সাজানো জীবনকে ওলট-পালট করে দিতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ ৩৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলাম।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে নরসিংদীর এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে করা একটি স্বাক্ষরই আজ তাকে দাঁড় করিয়েছে আসামির কাঠগড়ায়। গত প্রায় ১৪ মাস ধরে তিনি কারাগারে। অথচ প্রত্যক্ষদর্শী ও সহকর্মীদের দাবি, ঘটনার সময় তিনি দুর্ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। কারাগারে যখন তিনি ন্যায়বিচারের প্রহর গুনছেন, তখন বাইরে তার চার বছরের অবুঝ সন্তান আর স্ত্রী পার করছেন চরম অনিশ্চয়তা ও একাকিত্বের এক বুকফাটা আর্তনাদ।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নরসিংদী। ১৭ জুলাই জেলখানা মোড়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল বলে আইনজীবীর মাধ্যমে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, সেখানে কিছু সময় অবস্থান করার পর পরিস্থিতির অবনতি হলে অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ফিরে আসেন।

সাইফুল ইসলামের দাবি, আন্দোলন ও গণবিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করায় পরদিন ১৮ জুলাই তিনি আর জেলখানা মোড়ে যাননি। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তিনি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সার্কিট হাউস এলাকায় অবস্থান করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন তিনি কোনো পুলিশি অভিযানে অংশ নেননি এবং কোনো বাহিনীকে নির্দেশও দেননি। কিন্তু ঘটনার কয়েক দিন পর একটি স্বাক্ষরই তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।

জবানবন্দিতে এই কর্মকর্তা জানান, ২২ জুলাই রাতে তাকে পুলিশের এমসিসি ফরমে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তিনি প্রথমে আপত্তি জানান। কারণ তার দাবি অনুযায়ী, তিনি সংশ্লিষ্ট সময় পুলিশের সঙ্গে কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। কিন্তু পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ ও চাপের মুখে তাকে স্বাক্ষর করতে হয়। এই এমসিসি ফরম নিয়েই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

এমসিসি বা বিপি ফরম নং-১০ মূলত পুলিশের দায়িত্ব পালনের একটি রেকর্ড। কোন ফোর্স কোথায় মোতায়েন ছিল, কখন দায়িত্ব শুরু ও শেষ করেছে, এসব তথ্য সেখানে লিপিবদ্ধ থাকে। এটি গুলিবর্ষণের আদেশ দেওয়ার কোনো আইনগত ফরম নয়। আইন অনুযায়ী, জনতা নিয়ন্ত্রণে গুলিবর্ষণের প্রয়োজন হলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নির্দেশ দিতে হয়।

সাইফুল ইসলামের পক্ষে দাবি করা হচ্ছে, ঘটনার দিন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগও তার ছিল না। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের অবস্থান, সহকর্মীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সেদিনের তথ্য যাচাই করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন তার তদন্ত প্রতিবেদনে নরসিংদীর ঘটনায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং এতে বিভিন্ন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। সেই প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৮ জুলাই নরসিংদী জেলখানা মোড়ে গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিহত কিশোর তাহমিদ ভূঁইয়ার বাবা রফিকুল ইসলাম যে অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করেন, সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলামের নাম উল্লেখ নেই।                     

২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর দাখিল করা ওই অভিযোগে ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলেও পরবর্তী সময়ে তদন্ত প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের নাম অভিযুক্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিষয়টি সামনে আসার পর তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং প্রাথমিক অভিযোগপত্রে তার নাম না থাকার বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আলভী সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্পটে ছিলাম। তাহমিদ (১৪) ছিল আমাদের বিক্ষোভ মিছিলের কিছু আগে। সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে বেশ সামনের দিকে চলে গিয়েছিল। পুলিশ গুলি শুরু করলে সরাসরি তার বুকে লাগে। সেখানেই লুটিয়ে পরে তাহমিদ।’ পুলিশ দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলি করেছে? বা সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ছিল কি না? খবরের কাগজের এমন প্রশ্নের জবাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই মুখ্য সংগঠক বলেন, ‘না, সেখানে এই নামের কোনো ম্যাজিস্ট্রেট দেখিনি। সেখানে আন্দোলন দমন করার জন্য ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ ছিল। তারাই গুলি করেছে এবং সেখানেই তাহমিদ নিহত হয়েছে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ হাকিম বলেন, সারা দেশের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ১৭ জুলাই রাতে স্থানীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৮ জুলাই বেলা ৩টা থেকে নরসিংদী জেলখানা মোড়ে ব্লকেড কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এদিন কর্মসূচি পালন স্থলের আশপাশে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট ছিল না। 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র মুনিয়া রহমান মনিকা বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে সে সময় আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম এবং আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। আন্দোলনের একপর্যায়ে তাহমিদ নিহত হয়েছে। সে সময় সেখানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের সঙ্গে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিল বলে আমরা দেখিনি।’ 

নরসিংদী জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমানে চট্টগ্রামের উপ-ভূমি সংস্কার কমিশনের কমিশনার (উপসচিব) পদে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তা ড. বদিউল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঘটনার দিন (১৮ জুলাই) আমি দেশে ছিলাম না। ১৯ তারিখ ভারত থেকে দেশে ফিরে আসি। তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।’ সাইফুল ইসলামকে ২২ জুলাই এমসিসিতে স্বাক্ষরের জন্য ডিসি হিসেবে চাপ প্রয়োগ করেছেন–এমন অভিযোগের বিষয়ে ডিসি বলেন, ‘আমি যেহেতু ঘটনা সম্পর্কে জানি না, তাই কোনো কর্মকর্তাকে স্বাক্ষরের চাপ দেওয়ার প্রশ্ন আসে না।’

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (শিল্পকলা শাখা) ও নরসিংদী জেলার সাবেক ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক (১৮ জুলাই) মৌসুমী সরকার রাখী খবরের কাগজকে বলেন, ‘তৎকালীন সদর উপজেলার সাবেক এসি ল্যান্ড ও ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ঘটনার সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় অথবা সার্কিট হাউসে ছিলেন বলে শুনেছি। কারণ ঘটনার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ কর্মসূচি এতটাই তীব্র ছিল, নিরাপত্তার কারণে সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিত থাকার মতো পরিবেশ ছিল না। জেলার অধিকাংশ ম্যাজিস্ট্রেট সে সময় ডিসি কার্যালয় অথবা সার্কিট হাউসে ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলামের সঙ্গে ডিসি কার্যালয়ে আমার একাধিকবার দেখা হয়েছে।’

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই আরেকটি বাস্তবতার কথা বলছেন। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ বা সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা প্রশাসনিক ও আইনি চাপের মুখে পড়েছিলেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, সাইফুল ইসলামের ঘটনাটিও নিরপেক্ষভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় খাল খননের পর ভরাট করে গাড়ির গ‍্যারেজ, কার গরজে?

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম
খাল খননের পর ভরাট করে গাড়ির গ‍্যারেজ, কার গরজে?
‘শহিদ রুদ্রসেন লেক’ ভরাট করে এভাবেই নির্মাণ করা হচ্ছে গাড়ির গ্যারেজ। ছবিটি মঙ্গলবার তোলা। ইনসেটে খননের পর খাল। ছবি: খবরের কাগজ

দেশজুড়ে যখন খাল খনন ও জলাধার সংরক্ষণের উদ্যোগ জোরদার হচ্ছে, তখন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে খনন করা একটি খাল ভরাট করে সেখানে গাড়ির গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে।

খালটি দৃষ্টিনন্দন জলাধার রূপে দৃশ্যমান হওয়ার পর প্রথমে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সাস্ট লেক’। পরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে নিহত শাবিপ্রবির একমাত্র শিক্ষার্থী শহিদ রুদ্র সেনের স্মরণে এর নামকরণ করা হয় ‘শহিদ রুদ্র সেন লেক’। কিন্তু বর্তমানে গ্যারেজ নির্মাণের কারণে লেকটির অস্তিত্বই প্রায় মুছে যেতে বসেছে। ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হওয়া লেকটি এখন আর চিহ্নিত করার মতো অবস্থায় নেই। গ্যারেজ করার মতো জায়গা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রশ্ন, একটি কার্যকর জলাধার ভরাট করে গাড়ির গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে কার গরজে?

লেক সৃষ্টি যেভাবে

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাতের সময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো। এ সমস্যা প্রাকৃতিকভাবে মোকাবিলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথমে খাল খননের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে সেই খালকে কেন্দ্র করে একটি লেক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ছিল লেক, লেকপাড়ে ওয়াকওয়ে এবং মাঝখানের একটি টিলায় পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পরিকল্পনা।

এ বিষয়ে ২০২৪ সালের ৭ মে ‘শাবিপ্রবিতে হবে পাখির অভয়ারণ্য’ শিরোনামে খবরের কাগজে সচিত্র একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে ২০২৫ সালের ২ জুন ‘শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা: খাল খননেই মিলল সুফল’ শিরোনামে ফলোআপ প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। 

২০২৫ সালের ৩ জুলাই লেকটির উদ্বোধনকালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী এটিকে ‘রুদ্র সেন লেক’ হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু সেই ঘোষণার এক বছরের মধ্যেই লেকটি ভরাটের মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে গাড়ির গ্যারেজ। লেকটি এখন গায়েব প্রায়।

কার গরজে গ্যারেজ?

সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্যারেজ নির্মাণের জন্য লেকের বড় একটি অংশ ভরাট করা হয়েছে। নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তবে তাদের অভিযোগ, প্রশাসন সে প্রতিবাদ আমলে নেয়নি। শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলছেন, যে লেক নির্মাণে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, এখন সেই লেকই অর্থ ব্যয় করে ভরাট করা হচ্ছে। তাদের মতে, এটি পরিকল্পনার সমন্বয়হীনতার স্পষ্ট উদাহরণ। মাত্র ২২টি গাড়ির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার ও ক্যাম্পাসের নান্দনিকতা নষ্ট করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অবিচারের শামিল।

গাড়ির গ্যারেজ তৈরিতে গরজ ছিল কার? এ প্রশ্নে অনুসন্ধানে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যারেজের পাশেই প্রায় শতাধিক গাড়ি রাখার মতো খালি জায়গা রয়েছে। গ্যারেজটি সেখানে স্থানান্তর করা হলে লেক রক্ষা পেত এবং খালি জায়গারও যথাযথ ব্যবহার হতো। কিন্তু বর্তমান স্থানে নির্মাণকাজ চলতে থাকলে পেছনের খালি জায়গায় যাওয়ার পথ স্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্ত হবে এবং জায়গাটি ভবিষ্যতে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে। মাত্র ২২টি গাড়ি রাখার জন্য সাত কোটি টাকা ব্যয় কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২’ এর আওতায় লেক ভরাট করে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের একটি দোতলা গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। গ্যারেজ নির্মাণের জন্য পাশের টিলার কিছু অংশও কাটা হয়েছে। নির্মাণাধীন গ্যারেজটিতে মাত্র ২২টি গাড়ি রাখা যাবে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে বর্তমানে ৪২টি যানবাহন রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। এ ছাড়া নতুন নির্মিত গ্যারেজটিতে বড় যানবাহন প্রবেশের জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত গ্যারেজটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন পূরণে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান আশিক বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রধান সৌন্দর্য হলো লেকটি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সেই লেক ভরাট করে গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে! এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করবে। আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই, তবে প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন উন্নয়ন আমরা চাই না। প্রশাসনের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ–অবিলম্বে লেক ভরাটের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বন্ধ করুন এবং ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা করুন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন এক্সপ্লোর সোসাইটি’র সভাপতি জাহ্নবী দত্ত বলেন, ‘বর্তমানে যে লেকটি শহিদ রুদ্র সেন লেক বা ‘সাস্ট লেক’ নামে পরিচিত, সেটির যখন পরিকল্পনা ও নির্মাণ কাজ শুরু হয়, তখন এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার কাছেই বেশ প্রশংসার বিষয় ছিল। লেকটি ছিল একাধারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধনের উপাদান, পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার একটি কার্যকর মাধ্যম। কিন্তু এখন যে ভরাটের কাজ চলছে, এটি সত্যিই দুঃখজনক। এখানে আমাদের উচিত প্রকৃতিকে না সরিয়ে মানবসৃষ্ট কাঠামোর বিকল্প উপায় ভাবা। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে চেষ্টা করব, এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি-না।’

কর্তৃপক্ষ কী বলে

যোগাযোগ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. জয়নাল ইসলাম চৌধুরী দাবি করেন ২০১৯ সালের জুলাইয়ে যখন ডিপিপি অনুমোদন হয়, তখন এই লেকটা ছিল না। গ্যারেজ নির্মাণের গরজ সম্পর্কে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘যখন এই লেক খনন করা হয় তখন আমরা বাধা দিয়েছিলাম। কারণ ডিপিপিতে গ্যারেজের জন্য এই স্থানটা উল্লেখিত। এটা ছিল প্লেইন ল্যান্ড।  এখানে লেক কখনোই ছিল না। ডিপিপিতে যেটা আছে সেটা হলো একনেকে পাস করা প্রধানমন্ত্রী থেকে অ্যাপ্রোভড। এখানে কেন লেক করা হলো সেটা প্রকৌশল দপ্তরকে জানানোই হয়নি। কারণ আমরা করব না আগেই না করে দিয়েছিলাম। লেক খননের কাজে প্রকৌশল দপ্তরের কোনো অংশগ্রহণই ছিল না। কারণ শুরু থেকেই বলা হয়েছিল যে, এটা ডিপিপির অন্তর্ভুক্ত গ্যারেজের জায়গা।’

লেক যেহেতু খনন করা হয়ে গেছে এবং শিক্ষার্থীরাও এখানে গ্যারেজ করার বিরুদ্ধে দাবি জানিয়েছিলেন, তবু বিকল্প জায়গায় গ্যারেজ স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে চিফ ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যখন দাবি জানাল, তখন আমরা টিলার পেছনে গ্যারেজ করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ওই সময় ভিসি স্যার (সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী) আমাদের জানান যে ভিসি বাংলোর আশপাশে এ ধরনের কোনো স্থাপনা করবেন না। যেখানে আছে সেখানেই করেন। এখন যেখানে আছে সেখানে তো লেক। তখন আমরা টিলার কাছ ঘেঁষে লেকের ঢালের কিছু অংশ ভরাট করে রিটেইনিং ওয়াল দিয়ে দিই, যাতে লেকের বাকি অংশের কোনো ক্ষতি না হয়।’

গ্যারেজ নির্মাণের সিদ্ধান্তের দায় সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরীর ওপর বর্তান চিফ ইঞ্জিনিয়ার। তবে এ বিষয়ে সাবেক উপাচার্যের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একদিকে লেক নির্মাণে ব্যয়, অন্যদিকে সেই লেক ভরাট করে নতুন ব্যয়—এই দ্বৈত আর্থিক ব্যয়ে রয়েছে অর্থের নয়ছয় ও অপচয়। এ নিয়ে তখনকার প্রশাসনের দায়িত্বশীল কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

জানতে চাইলে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয় ঈদের ছুটির কারণে বন্ধ ছিল। শিগগিরই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এখানে গ্যারেজ নির্মাণের কারণ ও প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস ৯ বছরেও খোলেনি রোহিঙ্গাদের ফেরার পথ

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৯:৪৮ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম
৯ বছরেও খোলেনি রোহিঙ্গাদের ফেরার পথ
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায়। ছবি: খবরের কাগজ

নিরাপদে নিজ ভূমিতে ফেরার আশায় দিন গুনছেন বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশা এখনো অধরাই। একদিকে মায়ানমারের চলমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসার কারণে রোহিঙ্গা সংকট নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, সংঘাত, নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রতি সংহতি জানাতে দিবসটি পালিত হয়। তবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে দিনটি বছর বছর ফিরে আসে অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং স্বদেশে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে।

বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে মাত্র কয়েক সপ্তাহে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে নতুন করে আরও দেড় লাখের মতো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীর এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট এখন অর্থায়নের সংকটেও পরিণত হয়েছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। তবু বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। একই সঙ্গে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় ৯ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু রাখাইন অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থা এখনো প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি।’

আরআরআরসি কার্যালয় জানায়, ২০১৮ সালে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা পরিবারের তথ্য মায়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ পরিবারের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময়ে পরিবারগুলোর সদস্যসংখ্যা পরিবর্তিত হওয়ায় নতুন করে তথ্য হালনাগাদ ও যাচাইয়ের কাজ চলছে।

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারাও। রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান দরকার। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থানের কারণে পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে চাপ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষ এখন প্রত্যাবাসনের কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান।’
 
বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চান না রোহিঙ্গারা

রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মাস্টার জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হলে আমরা স্বেচ্ছায় মায়ানমারে ফিরে যেতে প্রস্তুত।’
ক্যাম্পে থাকা সাধারণ রোহিঙ্গারাও একই দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘প্রায় ৯ বছর ধরে আমরা শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটাচ্ছি। আমাদের সন্তানদের অনেকেই মায়ানমার দেখেনি। আমরা বাংলাদেশে নিরাপদে আছি, কিন্তু এটি আমাদের দেশ নয়। আমরা নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে চাই। তবে ফিরে গিয়ে যদি আবার নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা বৈষম্যের শিকার হতে হয়, তাহলে সেই প্রত্যাবাসনের কোনো অর্থ থাকবে না। আমাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘মায়ানমার ছেড়ে আসার সময় আমি সবকিছু হারিয়েছি। বাড়িঘর, জায়গা জমি, আত্মীয়স্বজন কিছুই আর আগের মতো নেই। একজন মা হিসেবে আমার একটাই চাওয়া, সন্তানদের একটি স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ দেখতে চাই। আমরা ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল জীবন চাই না। নিজের দেশে সম্মান নিয়ে বাঁচার সুযোগ চাই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আমাদের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধানে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া।’

টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পের যুবক আবদুন নবী বলেন, ‘শরণার্থী শিবিরের জীবন সীমাবদ্ধতার জীবন। এখানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সব সময় তাড়া করে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হতাশায় ভুগছে। আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ, কিন্তু অনির্দিষ্টকাল ধরে ক্যাম্পে বসবাস কোনো সমাধান নয়। আমরা এমন একটি প্রত্যাবাসন চাই, যেখানে আমাদের পরিচয়, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।’

উখিয়ার জামতলী ক্যাম্পের জমিলা খাতুন বলেন, ‘নারীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টের মধ্যে আছেন। অনেকেই স্বজন হারিয়েছেন, অনেকের পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবু আমরা আশা ছাড়িনি। আমরা আমাদের গ্রাম, আমাদের স্মৃতি, আমাদের শিকড়ে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু সেই ফেরাটা হতে হবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। শুধু সীমান্ত পার করে পাঠিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।’

শালবাগান ক্যাম্পের ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘আমার জীবনের শেষ সময় চলছে। আমি শুধু মৃত্যুর আগে নিজের জন্মভূমি আরেকবার দেখতে চাই। আমরা কখনো বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকার দাবি করিনি। আমাদের দাবি একটাই, মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি এবং নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে এই সংকটের সমাধান সম্ভব।’
 
চাপ বাড়ছে স্থানীয় জনপদে

রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে আশ্রয়দাতা এলাকার জনজীবনে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে বনভূমি উজাড়, পরিবেশের ভারসাম্যহানি, শ্রমবাজারে মজুরি কমে যাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের বিষয়টি সমর্থন করেন, তবে সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধান দেখতে চান।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ক্যাম্প স্থাপনের শুরুতে হাজার হাজার একর পাহাড় ও বনভূমি কেটে ফেলা হয়েছিল। এখনো বনাঞ্চলের ওপর চাপ রয়েছে। আগে যেসব এলাকায় বন্যপ্রাণী দেখা যেত, সেসব জায়গার পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। আমরা চাই বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।’

সমাজকর্মী জুবাইদা বেগম বলেন, ‘আগে গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ দিনমজুরের কাজ করে ভালো মজুরি পেতেন। এখন শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই মজুরি কমে গেছে। এতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

কোটবাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘জনসংখ্যার চাপ বেড়ে যাওয়ায় সড়ক, বাজার, পানি ও অন্য সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রাও নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু রোহিঙ্গাদের নয়, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি সহায়তা দিতে হবে।’

জেসমিন আক্তার বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হলেও স্থানীয় মানুষের মধ্যে এখনো উদ্বেগ রয়েছে। মাদক, মানব পাচার ও অপরাধ চক্রের তৎপরতা নিয়ে আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। তাই নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি সংকটের রাজনৈতিক সমাধান জরুরি।’
 
নারী ও কিশোরীদের ঝুঁকি

রোহিঙ্গা শিবিরে নারী ও কিশোরীরা এখনো নানা ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছেন। মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও সীমিত সুযোগের কারণে বাল্যবিবাহ, মানব পাচার, নিরাপত্তাহীনতা এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার মতো সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে কিশোরীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে পরিবারগুলোর মধ্যে।

উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পের বাসিন্দা রাশেদা খাতুন বলেন, ‘অনেক পরিবার দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার কারণে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। মা-বাবারা মনে করেন, এতে মেয়েরা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু এতে তাদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে।’

শফিউল্লাহ কাটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কিশোরী নুর আয়েশা বলে, ‘আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। কিন্তু অনেক মেয়েই বিভিন্ন কারণে স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। কেউ বিয়ে করছে, কেউ পরিবারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। সুযোগ পেলে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।’

কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক পরিবার উদ্বিগ্ন থাকে। সন্ধ্যার পর চলাফেরা, বিভিন্ন সেবা নিতে যাওয়া, সবকিছুতেই সতর্ক থাকতে হয়। আমরা চাই নারী ও শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।’

নয়াপাড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘দালাল চক্র এখনো সক্রিয়। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক নারী ও তরুণকে পাচারের চেষ্টা করা হয়। সচেতনতা বাড়লেও ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি। এই বিষয়টিতে আরও কঠোর নজরদারি দরকার।’

মোচনী ক্যাম্পের হাজেরা খাতুন বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তা হয়। বছরের পর বছর ক্যাম্পে থেকে অনেক শিশুর পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো না গেলে একটি পুরো প্রজন্ম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চলে যাবে।’
এদিকে বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে কিছুটা স্বস্তির খবরও এসেছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন অতিরিক্ত ১৪ মিলিয়ন ইউরো অনুদান দিয়েছে। এই অর্থ মানবিক সহায়তা, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

প্রায় এক দশক ধরে বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের জীবন থমকে আছে অপেক্ষায়। বাংলাদেশ মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাদের আশ্রয় দিয়ে গেলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগের দাবি ক্রমেই জোরালও হয়ে উঠছে। প্রশ্ন একটাই, কবে ফিরবে রোহিঙ্গারা?

নিত্যপণ্যের বাজারে নেই মূল্যতালিকা

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
নিত্যপণ্যের বাজারে নেই মূল্যতালিকা
ভোগ্যপণ্যে ঠাসা মুদি দোকানে দেখা যায়নি কোনো মূল্যতালিকা। ছবিটি চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকা থেকে তোলা/ মোহাম্মদ হানিফ।

চট্টগ্রামে নিত্যপণ্যের বাজারে অধিকাংশ দোকানেই মূল্যতালিকা দেখা যায় না। ফলে একই পণ্য সব দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া পণ্যের প্রকৃত মূল্য নিশ্চিত হতে না পেরে প্রতিদিনই বিভ্রান্তি ও ভোগান্তির মুখে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, মূল্যতালিকা না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করছেন। ফলে তাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে নিয়মিত তদারকি এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শন জরুরি বলে মনে করছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতারা। 

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর কাজীর দেউড়ি, চকবাজার, বহদ্দারহাট, হালিশহর, রিয়াজউদ্দিন বাজার এবং রাস্তার পাশের খুচরা দোকান ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানে মূল্যতালিকা নেই। কিছু কিছু দোকানে থাকলেও তারিখ ও পণ্যের দাম পরিবর্তনের দিকে বিক্রেতার খেয়াল নেই। আবার বিভিন্ন দোকানে একই পণ্য ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কাজীর দেউড়ি বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তার পাশে ব্যাটারি গলিতে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ নগরীর বিভিন্ন অলিগলির খুচরা বাজারে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ (হালি জাত) বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। অথচ রিয়াউদ্দিন বাজার থেকে বের হয়ে দেখা যায়, একই পেঁয়াজ ভ্যানগাড়িতে ৩ কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কেজিপ্রতি দাম পড়ছে ৩৩ টাকা। বাজারভেদে মাছ, মাংস, সবজির দামেও এ রকম হেরফের দেখা গেছে। 

এদিকে মূল্যতালিকা না থাকার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন করেও কোনো সদুত্তর মেলেনি। ব্যবসায়ীদের একেক জনের রয়েছে একেক রকম যুক্তি। কেউ কেউ জানিয়েছেন, তাদের কাছে একাধিক মূল্যতালিকা রয়েছে, কিন্তু বাজারে মূল্যতালিকা কেউ টাঙায় না। তাই তিনিও রাখেননি। আবার কেউ জানিয়েছেন, মূল্যতালিকা রাখলে বা কম দামে পণ্য বিক্রি করলে, যারা বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করে তাদের সঙ্গে ঝগড়া হয়। তাই ঝগড়া এড়াতে এবং যে যার মতো করে ইচ্ছামতো দামে পণ্য বিক্রি করতে মূল্যতালিকা রাখেন না। 

রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী মো. শওকত বলেন, ‘আপনি পুরো বাজার ঘুরে দেখেন কোনো মূল্যতালিকা নেই। সবাই যেহেতু মানছে না, আমি আর একা মূল্যতালিকা রেখে লাভ কী!’

হালিশহর কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী মো. আলম বলেন, ‘আমার কাছে ৩টা মূল্যতালিকা আছে। কিন্তু রাখা হয়নি। কারণ একটি পণ্য একেক জায়গায় একেক দামে বিক্রি হয়। আমি একটি পণ্যের দাম পাশের দোকানদারের তুলনায় কম লিখলাম। তখন আমাদের ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া হয়।’ 

নগরীর ফইল্যাতলী এলাকার বাসিন্দা আল আমিন বলেন, ‘এক লিটার গরুর দুধ কিনতে গেলাম। এক দোকানে ৮০ টাকা, পাশের আরেক দোকানে ৯০ টাকা। অন্য ভোগ্যপণ্যের দামেও একই অবস্থা। অর্থাৎ দামে কোনো স্বচ্ছতা নেই। তাই এখন বাজার করতে গেলে আগে পুরো বাজার ঘুরি। যেখানে কম দাম বলে সেখান থেকেই কিনি। কিন্তু এটা তো আমাদের জন্য কষ্টদায়ক। সব জায়গায় একই দাম থাকলে যে যেখান থেকে ইচ্ছা কিনতে পারেন। ক্রেতারাও বিভ্রান্ত হন না।’ 

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ জানান, যখনই কোনো বাজারে অভিযান চালানো হয়, সেখানে কেউ বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করছে কি না, মূল্যতালিকা ও কেনা-বেচার পাকা রসিদ আছে কি না- ইত্যাদি বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। 

ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘মূল্যতালিকা রাখা বা বেশি দামে পণ্য বিক্রির বিষয়ে বিভিন্ন সভা, সেমিনার করেও কোনো লাভ তো হচ্ছে না। পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী দুজনই নানা কায়দায় জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়। বাজারকে কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। ফলোআপ করতে হবে। তাহলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।’

পোলাওয়ের চাল ১৯০ টাকা কেজি!

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:২৩ এএম
পোলাওয়ের চাল ১৯০ টাকা কেজি!
ছবি: সংগৃহীত

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন। এই বাজেটের কার্যকর হবে আগামী ১ জুলাই থেকে। কিন্তু ইতোমধ্যে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে বাজেটে মসলাসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের দাম কমাতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু সাত দিন চলে গেলেও এক টাকা কমেনি এসব পণ্যের দাম। আগের মতোই বেশি দামে চাল, ডাল, মসলা বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া, পাঙাশসহ অন্য মাছের দামও কমেনি। কোরবানি ঈদের পর চাহিদা কমলেও আগের মতো চড়া দামে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। বাজার সবজিতে ভরা থাকলেও অধিকাংশ সবজির দাম ১০০ টাকার বেশি।

বিক্রেতারা বলছেন, সরকার মুখে বললেও বাজার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই তো কোনো জিনিসের দাম কমে না। ভরা মৌসুমেও এক কেজি পোলাওয়ের চাল  বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকায়। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিভিন্ন বাজার ঘুরে সংশ্লিষ্ট ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করে সরকার। তাতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই রাজস্ব আদায়ে অর্থমন্ত্রী বেশ কিছু পণ্য ও সেবায় দাম কমার প্রস্তাব করেছেন সাধারণ মানুষকে একটু স্বস্তি দিতে। ধান, চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি পণ্যের দাম কমাতে উৎসে কর এবং খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়ার মতো মসলার দাম কমাতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু গতকাল বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে এসব জিনিসের দাম এক টাকাও কমেনি।

মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের মো. বাবু মিয়াসহ অন্য বাজারের খুচরা বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার যাই বলুক বাজার চলছে বাজারের মতো । মিল থেকে দাম না কমালে আমরা কীভাবে কম দামে বিক্রি করব। কাজেই মিলে যাতে দ্রুত দাম কমে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারব। ভোক্তারাও কম দামে কিনতে পারবেন। বর্তমানে সব পণ্যের দাম ঝিম ধরে আছে।’

বেশি দামেই চাল বিক্রি

গতকালও আগের মতো মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি, আটাশ ৬০ থেকে ৬৫ ও মোটা চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হয়। দেশি মসুর ডাল ১৬০ টাকা, আমদানি করা ডাল ১২০ টাকা, ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা, ২ কেজির প্যাকেট আটা ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, চিনি ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়।  

টাউন হল বাজারের মায়ের দোয়া রাইস স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রিয়াদ হোসেন বলেন, ‘বোরো ধান ওঠা শেষ। তার পরও চালের দাম কমছে না। ব্যবসায়ীরা গোডাউনে ধান ভরে নিয়েছেন। মিল থেকে এখনো বেশি দামে পুরোনো চাল বিক্রি করছে। মিলমালিকদের না ধরলে চালের দাম কমবে না। প্রাণ, চাষি গ্রুপসহ অন্যরাও ইচ্ছামতো পোলাও চালের দাম বাড়িয়েছে, যা ১৯০ টাকা কেজি। আজব এ দেশ।’

কোরবানির ঈদের আগে আদার দাম বাড়লেও গতকাল তা ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, আলু ৩০ টাকা, দেশি রসুন ১০০ টাকা, চায়না রসুন ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়। শুল্ক কমানো হলেও মসলার দাম কমেনি। আগের মতো গতকালও  লবঙ্গের কেজি দেড় হাজার টাকা, দারুচিনি ৫২০ টাকা, জিরা ৬৫০ টাকা ও এলাচ সাড়ে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।’ খেজুর বিক্রেতারাও জানান দাম কমেনি। নিউ মার্কেটের মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আগের দামেই সব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। বাজেটের পণ্য দেশে এলে কমতে পারে।’

অধিকাংশ সবজি ১০০ টাকার ঘরে

বাজারে এখনো শীতের কপি, টমেটো বিক্রি হচ্ছে। গ্রীষ্মকালের সবজিও ভরে আছে। তার পরও বেগুনসহ অধিকাংশ সবজি যেন ১০০ টাকা কেজিতে স্থির হয়ে গেছে। বিভিন্ন বাজারে টমেটো ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শসা ৭০ থেকে ১০০, বরবটি ও কচুরলতি ৮০ থেকে ১০০, কাঁচামরিচ ১২০ থেকে ১৪০, শজনেডাঁটা ২০০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৪০ থেকে ৬০, পটোল ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। গ্রীষ্মকালের ঝিঙা, ধুন্দুল, চিচিঙ্গাও ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৬০ থেকে ৭০ টাকার কমে মেলে না। নিউ মার্কেট বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. সবুজসহ অন্য বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে। এর প্রভাবে সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। আড়তে সব সবজিই বেশি দামে কেনা। তাই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’

কমেনি মাছের দাম

কোরবানির ঈদের পরও মাছের দাম কমেনি। তেলাপিয়া মাছও আকারভেদে ২২০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি, পাঙাশ ২০০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। রুই, কাতল মাছও আগের মতো ৩৬০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি, নদীর চিংড়ি, কাজলি, ট্যাংরাসহ নদীর অন্য মাছ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। তবে চাষ করা এসব মাছ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। আগের সপ্তাহের মতোই গতকালও সোনালি মুরগির কেজি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা, ব্রয়লার ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, দেশি মুরগি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, গরুর মাংস ৮০০ ও  খাসির মাংস ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। তবে ডিমের দাম ১০ টাকা কমে ১১০ থেকে ১২০ টাকা ডজন বিক্রি হয়।