ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
রোনালদোর বিশ্বরেকর্ড, প্রথমার্ধে উজবেকিস্তানের জালে ৩ গোল পর্তুগালের গোল করেই ইতিহাস গড়লেন রোনালদো ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে ভাবছেন না হালান্ড তৃণমূল থেকে ফিরহাদ-অরূপসহ ৮ নেতা বহিষ্কার উপদেষ্টা জাহেদের ফেরা ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত: জয়সওয়াল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সিএফমোটো বাংলাদেশের নতুন শোরুম উদ্বোধন পর্তুগালের একাদশে ২ পরিবর্তন ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ঘুরে দেখলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি বিস্ফোরক সংকটে বন্ধ মধ্যপাড়া পাথরখনির উত্তোলন কার্যক্রম জলবায়ু অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর হরমুজ প্রণালিতে রেকর্ড তেল রপ্তানির তথ্য দিলেন ট্রাম্প কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন আলোচিত কৃষক কবির হোসেন আর নেই ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন আদব মানুষকে সম্মানিত করে, আদবহীনতা মর্যাদা নষ্ট করে: ছারছীনার পীর ছাহেব কারা পাবেন হেদায়েতের এই পরম নিয়ামত? রেকর্ড তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে ট্র্যাজেডি, পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে প্রতারণা, রিমান্ডে আইনজীবী বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৮ দেশের বাণিজ্য ঘাটতি, শীর্ষে চীন ও ভারত: বাণিজ্যমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কড়া বক্তব্য দিলেন এমপি রেহানা রানু টিআর-কাবিটা প্রকল্পে অনিয়মের তদন্ত চলছে: ত্রাণমন্ত্রী এক অর্থবছরে প্রবাসী আয় ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ফ্যান্টাসী কিংডম-খবরের কাগজ প্রতিদিনের অনলাইন কুইজ বিজয়ী ডিজিটাল নকল প্রতিরোধে কঠোর নজরদারির আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সাত দশকের অগ্রগতির দাবি প্রশ্নবিদ্ধ: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি ও সংসদ কক্ষের শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ বিরোধীদলীয় নেতার পোশাক ছাড়া গোসল করলে ওজু থাকবে কি? গুজব ও বিচারাধীন ইস্যুতে সংসদের সময় নষ্ট না করার আহ্বান স্পিকারের চালের বাজারে কারসাজি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি চলছে: খাদ্য প্রতিমন্ত্রী নতুন ও প্রথম আয়কর রিটার্ন  দাখিলকারীর প্রতি পরামর্শ

ক্ষমতাপ্রত্যাশী দুই দলের চাপে চিড়েচ্যাপ্টা প্রশাসন

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:৩০ এএম
ক্ষমতাপ্রত্যাশী দুই দলের চাপে চিড়েচ্যাপ্টা প্রশাসন
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

অদৃশ্য বাধায় কাজ করতে পারছে না প্রশাসন। পদোন্নতি-পদায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ‘জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটি’র সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে নানা বাধার মুখে পড়ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রশাসনসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞরা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল নিজেদের লোকজনকে ‘জায়গামতো’ বসাতে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। সে কারণেই প্রশাসনের নৈমিত্তিক কাজে গতি আসছে না। অনেকটা চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থা তৈরি হয়েছে সেখানে।

প্রশাসন বিভাগের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপে পড়েছে প্রশাসনের ‘চেইন অব কমান্ড’। শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই সতর্কতার সঙ্গে পথ চলার নীতি গ্রহণ করেছেন। নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী কারা, তা বোঝার চেষ্টা করছেন এই কর্মকর্তারা। সে অনুযায়ী নিজেদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করছেন তারা। এতে সরকার বা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। 

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে হিসেবে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য সরকার গঠন বা রাষ্ট্রক্ষমতার সমীকরণ জোরালো হচ্ছে। নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় যেহেতু প্রশাসন বিভাগ বেশ গুরুত্ব বহন করে থাকে, তাই আগে থেকেই ক্ষমতায় যাওয়ার প্রত্যাশী বড় দুটি রাজনৈতিক দল ‘নিজেদের লোক’ বিভিন্ন দপ্তরে বসানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। তারা এখন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিতে নানা রকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রশাসনে আলোচনা রয়েছে। 

মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ পদ- জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম, ফেনী, মাদারীপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডিসি নিয়োগ দেওয়ার পরই তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু হয়। একইভাবে ২১ সেপ্টেম্বর নওগাঁর ডিসিকে চট্টগ্রামে বদলি করা হলে তার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন মহলে প্রচার রয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তাকে সেই পদে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। 

দীর্ঘদিন ধরে সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ পদগুলো শূন্য রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের পদ শূন্য হয় গত ২১ সেপ্টেম্বর, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব পদটি শূন্য হয় ২৮ সেপ্টেম্বর, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব পদটি শূন্য হয় ২৮ আগস্ট, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব পদটি শূন্য হয় ৩০ সেপ্টেম্বর। আর সমবায় বিভাগের সচিব পদটি শূন্য রয়েছে গত ২৬ মার্চ থেকে।

এর মধ্যে ১২ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হককে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব মো. কামাল উদ্দিনকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সচিবালয়ে গুঞ্জন রয়েছে, বড় একটি রাজনৈতিক দল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তাদের মতাদর্শের কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতে সক্ষম হলেও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

তাকে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগের এপিডি পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্যই এই মন্ত্রণালয়ে আনা হয়।

তবে গত ১০ দিন ধরে তাকে এপিডি পদে নিয়োগ দিতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

ফিরোজ সরকার প্রসঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, বিভাগীয় কমিশনার পদ থেকে এপিডি পদে পদায়নের জন্য বদলি আদেশ হওয়ার পরপরই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এই কর্মকর্তাকে সাবেক কর্মস্থল থেকে রিলিজ না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তারপর রিলিজ নিয়ে তিনি জনপ্রশাসনে যোগ দিলেও এখনো তাকে এপিডি পদে নিয়োগ দিতে দেয়নি অদৃশ্য শক্তি।

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার মতে, ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সম্প্রতি ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ধর্মভিত্তিক একটি দল তাদের মতাদর্শের কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার সাফল্য পেয়েছে, যা বড় রাজনৈতিক দলটি পায়নি। এই চার মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হিসেবে বিবেচিত।

কর্মকর্তারা ভাবছেন, সরাসরি আইনগত সুবিধা নেওয়ার কোনো সুযোগ না থাকলেও প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং সারা দেশের মাঠ প্রশাসনে ইতোমধ্যে অদৃশ্য প্রভাব বিস্তারের পর বাকি সুযোগও নিতে চেষ্টা করছে ধর্মভিত্তিক দলটি। তাছাড়া স্বরাষ্ট্র সচিবের মাধ্যমে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি নিজেদের মতো করে সাজানোর সুযোগও রয়েছে। পাশাপাশি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিজেদের আদর্শিক কর্মকর্তা নিয়োগে সাফল্য পাওয়ায় ধর্মভিত্তিক দলটি ভোটের আগে সারা দেশের উপাসনালয়গুলো ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রচার চালাতে এবং নিজেদের ভোটব্যাংক বাড়াতে কাজে লাগাতে পারে।

এদিকে জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটি নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে প্রশাসনের ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার সুপারিশ করলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে ২৪তম ব্যাচের পদোন্নতি রিভিউ করে আরও কিছু কর্মকর্তার পদোন্নতি দেওয়ার সুপারিশও অদৃশ্য কোনো কারণে থেমে আছে একই প্রক্রিয়ায়।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রকৃত পক্ষে একটি রাজনৈতিক দল ধারণা করছে পদোন্নতি দিলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল সুবিধা পাবে। আবার ধর্মভিত্তিক দলটি ভাবছে, পদোন্নতি পাবে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের ঘরানার কর্মকর্তারা। এই জটিলতায় আটকে আছে এই দুই ব্যাচের পদোন্নতি।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বর্তমানে ডিসি পদে ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা রয়েছেন ২০ জন, ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা রয়েছেন ২১ জন ও ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা রয়েছেন ২৩ জন। যুগ্ম সচিব পদে ২৪তম ব্যাচের পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারা এখনো জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে দায়িত্ব পালন করছেন। 

পাশাপাশি ২৫তম ও ২৭তম ব্যাচের বেশ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলেও এসব কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করতে পারেনি সরকার। যদিও ইতোমধ্যে এই দুই ব্যাচের আরও বেশ কিছু কর্মকর্তাকে ডিসি পদে নিয়োগের লক্ষ্যে ফিট লিস্টে রাখা হয়েছে। তাছাড়া এরই মধ্যে ২৮তম ব্যাচের আরও কিছু কর্মকর্তাকে সম্প্রতি ডিসি পদে পদায়নের জন্য ফিট লিস্টে নির্বাচিত করে রাখা হয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে, ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের ফিট লিস্ট তৈরি করা হয়েছে নির্বাচনের সময় ডিসি পদে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই।

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে কর্মকর্তারা কোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শ বাস্তবায়নের কাণ্ডারি হতে পারেন না। অথচ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাপ্রত্যাশী দুই বড় রাজনৈতিক দলই সর্বত্র নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলার উপক্রম করেছে। একইভাবে প্রশাসনেরও এক শ্রেণির কর্মকর্তা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার লোভে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থাভাজন হওয়ার প্রতিযোগিতায় রয়েছেন।

এসিব বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দক্ষ, যোগ্য, নিরপেক্ষ প্রশাসন কামনা করেছিল দেশের জনগণ। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি। বরং পুরো প্রশাসনই এখন দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে প্রভাবিত হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শে প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ নেয়। এটা সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। ফলে যোগ্য, দক্ষ, নিরপেক্ষ কর্মকর্তার পরিবর্তে পুরো প্রশাসনে দায়িত্ব পেয়েছে রাজনৈতিক মতাদর্শের কর্মকর্তারা। এতে যোগ্য, দক্ষ, নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। 

মো. ফিরোজ মিয়া আরও বলেন, আগের রাজনৈতিক সরকারও যোগ্য, দক্ষ, নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের যেভাবে যতটুকু মূল্যায়ন করেছে, এই সরকার সেটাও করতে পারছে না। আর বিশেষ সুপারিশের লোকদের নিয়োগের জন্য প্রকৃত কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়ন হওয়ায় প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। স্বাধীনতার পর এত দুর্বল প্রশাসন এই দেশবাসী কখনো দেখেনি।

দীর্ঘদিন সচিবশূন্যতা প্রসঙ্গে ফিরোজ মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, এটা অসম্ভব একটি ব্যাপার, যা আগে কখনোই প্রশাসনে ঘটেনি। সচিব শূন্য থাকায় মন্ত্রণালয়/বিভাগ এবং এর অধীন দপ্তর বা সংস্থাও অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে সেবাবঞ্চিত হয় দেশ ও তার জনগণ।

৯ সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসর
৯ সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছে সরকার। তাদের মধ্যে দুজন সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাও রয়েছেন। গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক ৯টি প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গত রাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রজ্ঞাপনগুলো প্রকাশ করে। সব প্রজ্ঞাপনেই বলা হয়েছে, তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে সংযুক্ত ছিলেন।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, এই ৯ সচিবের চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। সরকার মনে করছে, জনস্বার্থে তাদের সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়া প্রয়েজন। তাই সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে তাদের অবসর দেওয়া হয়েছে। বিধি অনুযায়ী তারা অবসরজনিত সুবিধাদি পাবেন। 

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা হলেন, সচিব শফিউল আজিম (৬৩৬৫), সচিব ড. এ কে এম মতিউর রহমান (৭৬৩১), সচিব ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ (৬০৬৫), সচিব মো. নূরুল আলম (৫৯৯৪), সচিব মো, আজিজুর রহমান (৫৯২৯), সচিব মো. মিজানুর রহমান, এনডিসি (৫৯২৪), সচিব মো. সামসুল আরেফিন (৫৭৭৩), সিনিয়র সচিব মো. মশিউর রহমান, এনডিসি (৫৫৬৮) ও সিনিয়র সচিব মো. মনজুর হোসেন (৫৪৯০)।

বরিশালে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে, পিছিয়ে কর্মসংস্থানে

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৭ এএম
বরিশালে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে, পিছিয়ে কর্মসংস্থানে
ছবি: সংগৃহীত

দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের ধারায় গত এক দশকে বরিশাল বিভাগে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের ফলে বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ। তবে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর জাতীয় প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বরিশাল বিভাগে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪৪টি। ২০১৩ সালের শুমারিতে এ সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬২টি। সে হিসাবে এক দশকে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮২টি অর্থনৈতিক ইউনিট।

দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে বরিশাল বিভাগের অংশীদারত্ব ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রতি ১০০টি অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে প্রায় ছয়টি বরিশাল বিভাগে অবস্থিত।

তবে কর্মসংস্থানের চিত্র তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ইউনিটে বর্তমানে ১২ লাখ ৭৯ হাজার ১২০ জন কর্মরত রয়েছেন। এটি জাতীয় কর্মসংস্থানের মাত্র ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে রয়েছে জাতীয় কর্মসংস্থানের ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।

অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই সেবা খাতনির্ভর। বিভাগে মোট ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৩৯২টি অর্থনৈতিক ইউনিট সেবা খাতের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এটি মোট ইউনিটের প্রায় ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প খাতে রয়েছে ৬০ হাজার ৫৫২টি ইউনিট, যা মোট ইউনিটের ৯ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, বরিশালের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর বড় অংশই ক্ষুদ্র, কুটির ও পারিবারিক পর্যায়ের উদ্যোগ। আকারভিত্তিক শ্রেণিকরণে বিভাগে কুটিরশিল্প রয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪১২টি এবং মাইক্রো শিল্প রয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫৭৪টি। এ ছাড়া ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে ২০ হাজার ১৪০টি, মাঝারি শিল্প ১ হাজার ৫৬৯টি এবং বৃহৎ শিল্প মাত্র ২৪৯টি।

বরিশাল বিভাগের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩৮টি। অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১৯ হাজার ৯৪৬টি। আর অর্থনৈতিক খানা বা পারিবারিক অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬০টি।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত রয়েছেন ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬৮ জন। অর্থনৈতিক খানাগুলোতে কর্মরত আছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৩ জন এবং অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন ২৫ হাজার ৩১৯ জন।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অর্থনৈতিক ইউনিট ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষে রয়েছে বরিশাল জেলা। জেলায় মোট অর্থনৈতিক ইউনিট ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৭৬টি এবং কর্মরত রয়েছেন ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৯২ জন।

এর পর রয়েছে পটুয়াখালী। সেখানে অর্থনৈতিক ইউনিট ১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪টি এবং কর্মসংস্থান ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬ জন। ভোলায় রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮৯টি ইউনিট এবং ২ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ জন কর্মরত।

পিরোজপুরে ৯৫ হাজার ৬০০টি ইউনিটে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩২ জন। বরগুনায় রয়েছে ৭৪ হাজার ৬৭০টি ইউনিট এবং ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৬০ জন কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। সবচেয়ে কম অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ঝালকাঠি জেলায়। সেখানে ইউনিট সংখ্যা ৬২ হাজার ৯৪৫টি এবং কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৪৬ জন।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, ‘অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বরিশালে গত এক দশকে এই প্রবৃদ্ধি নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে।’

তবে কর্মসংস্থানের জাতীয় অংশীদারত্ব তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠা এখনো বিভাগের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জ্যোতিময় বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক পর্যায়ের উদ্যোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এটিকে অতিরঞ্জিতভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রধান সূচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভারী শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও আরও বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে।’

হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১০:৩৩ এএম
হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

২৩ বছরেও পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তর প্রক্রিয়া। ২০০৩ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে এই শিল্পটি স্থানান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়। তারপর নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সাভারের হেমায়েতপুরে এই শিল্পটি স্থানান্তর করার কাজ শেষ হয় ২০২১ সালে। তবে আজও সেই শিল্পনগরী অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কেনা গাড়িগুলো পাঁচ বছর পরও পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ১৫৫টি চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানাকে পরিবেশসম্মত স্থানে স্থানান্তরের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০০৫ সালে। কিন্তু ১০ বার সংশোধন করে সময় বাড়িয়ে তা শেষ করা হয়েছে ২০২১ সালের জুনে। সময় বেশি লেগেছে সাড়ে ১৫ বছর।

‘চামড়া শিল্পনগরী’ স্থানান্তরে প্রাথামিকভাবে খরচ নির্ধারণ করা হয় ১৭৬ কোটি টাকা। পরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ৯৩৮ কোটি টাকা। চামড়াশিল্প থেকে নির্গত বর্জ্য পরিশোধনের জন্য একটি কমন ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপি স্থাপনসহ সব কিছু করা হয়েছে সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার ৬০০ বিঘা জমিতে।

তার পরও পরিবেশগত সনদ পাচ্ছেন না ট্যানারি শিল্পমালিকরা। বিক্রেতারা পাচ্ছেন না চামড়ার দাম। হেমায়েতপুর ট্যানারিশিল্প এলাকা থেকে নির্গত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ট্যানারি শিল্পনগরী প্রকল্পটি প্রণয়ন ‘আগাগোড়া’ ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তাই একবার নয়, দুবার নয়, ১০ বার প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। প্রকল্প খরচও ১৭৬ কোটি থেকে বেড়ে ৯৩৮ কোটি টাকায় ঠেকেছে, বেড়েছে ৪৩৪ শতাংশ। সময় বেড়েছে ৬১৬ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ করে ৬০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ৩২ কোটি টাকায় ২ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার জমি উন্নয়ন, ৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা খরচ করে ৫ তলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ৪৭৭ কোটি টাকা খরচ করে এসটিপিসহ কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হয়েছে ৫১ বিঘা জমিতে। চারটি মডিউলসংবলিত এই সিইটিপি নির্মাণে একবার প্রকল্পটি সংশোধন করে ৩ বছর সময় বাড়ানো হয়।

তবে নির্মাণ সত্ত্বেও তা কার্যকর করা হয়নি। প্রকল্পটির কাজের গতি ছিল খুবই ধীর। শিল্পনগরীর অগ্নিনির্বাপন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ১১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা খরচ করে নির্মাণ করা হয় সীমানা প্রাচীরসহ ফায়ার স্টেশন। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সাড়ে ১২ লাখ টাকায় পুলিশ স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় ৬ কোটি টাকা, শিল্পনগরীর বর্জ্যপানি দ্রুত নিষ্কাশনে প্রায় ৩ কোটি টাকা খরচ করে ড্রেন নির্মাণ করা হয়। ২৭ কোটি টাকা খরচ করে পানি সরবরাহ পাইপলাইন, প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ লাইন, ১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সড়ক বাতি, ৮ কোটি টাকা খরচ করে ডাম্পিং ইয়ার্ড, ২টি গভীর নলকূপ, ৮টি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এভাবে শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ৯৩৮ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্ক ব্যয়ের পরও সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়নি প্রকল্পটি।

সাবেক প্রকল্প পরিচালক ব্যবহার করছেন জিপ গাড়ি

প্রতিবেদন সূত্রে (আইএমইডি) জানা গেছে, হেমায়েতপুরের হরিণধরায় চামড়া শিল্পনগরীর শতভাগ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে সিইটিপির কার্যক্ষমতা, ড্রেনেজব্যবস্থা ও বর্জ্যব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। স্থাপিত সিইটিপির ধারণক্ষমতা দিনে মাত্র ২৫ হাজার ঘনমিটার, যা বর্তমানে উৎপন্ন বর্জ্যপানির পরিমাণের তুলনায় অনেক কম। ফলে সিইটিপি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে না। এদিকে কঠিন বর্জ্য অন্য কোনো শিল্পের উপজাত হিসেবে ব্যবহার না হওয়ায় খোলা জমিতে জমা করে রাখা হচ্ছে, এর ফলে ঘটছে গুরুতর পরিবেশ দূষণ।

শিল্পনগরীতে ১৬২টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সেগুলোর সব কটিতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়নি। প্রকল্পের জন্য ২টি জিপ গাড়ি ও ৩টি মাইক্রোবাস কেনা হয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার ৫ বছর পরও তা পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি। সাবেক প্রকল্প পরিচালক যতীন্দ্র নাথ পাল একটি জিপ গাড়ি ব্যবহার করছেন। একটি মাইক্রোবাস সাভার বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরীতে ব্যবহার হচ্ছে। প্রকল্পটি ৫ বছর আগে শেষ হলেও এখনো ৪৭টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি।

এলডব্লিউজির সনদ না পাওয়ার কারণ

শিল্পনগরীতে নির্মিত সিইটিপি প্রয়োজনের তুলনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ট্যানারির সংখ্যা ও বর্জ্যের পরিমাণের তুলনায় এর কার্যকারিকতা ও অপারেশনাল দক্ষতা পর্যাপ্ত নয়। এর ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আবার অনেক ট্যানারির নিজস্ব ইটিপি নেই। প্রকল্প শেষ হলেও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি আজ পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশও পূর্ণাঙ্গ পরিবেশসম্মত হয়নি বলে মতপ্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

অপরদিকে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদের জন্য উপযুক্ত হতে কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, টোটাল ডিজলভড সলিডস (টিডিএস) মান বজায় রাখা আবশ্যক। কিন্তু এসব কিছু পূরণ হচ্ছে না। 

উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও রপ্তানি কমেছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্যানারির মালিকদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫২ শতাংশ স্নাতক পাস। সাভারে নতুন প্লটে পরিকল্পিত ট্যানারি স্থানান্তরের পর কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। তবে রপ্তানি সক্ষমতা কমে গেছে। শিল্পনগরীতে এখনো ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হয়নি। ফলে বিদেশি ক্রেতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না।

অবকাঠামো উন্নত হলেও শ্রমিকরা এখনো বঞ্চিত

৪৯ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, চামড়া শিল্পনগরীর কর্মপরিবেশ কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে ২ শতাংশ জানান, পরিস্থিতি প্রায় একই রকম আছে। ৭০ শতাংশ শ্রমিক জানান, আগের তুলনায় পরিচ্ছন্নতা কর্মকাণ্ড বেড়েছে। কাজের সময় দুর্ঘটনা অর্ধেক কমেছে। তবে অবকাঠামো উন্নত হওয়ার ৬ বছর পরও ২৮ শতাংশ শ্রমিক জানান, কারখানা থেকে তাদের কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয় না।

ট্যানারি কারখানায় কাজ করার সময় রাসায়নিকের গন্ধ ও বর্জ্যের সমস্যা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। আগে ৫৯ শতাংশ শ্রমিক ত্বকের রোগ, চুলকানি ও অ্যালার্জি সমস্যায় ভুগলেও সাভার ট্যানারিতে এখন ভুগছেন ৩৬ শতাংশ। ৯৪ শতাংশ শ্রমিক জানান, কারখানায় কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মেডিকেল সুবিধা নেই। কাজের সময় দুর্ঘটনায় ক্ষতি হলেও ৪০ শতাংশ শ্রমিক জানান, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না।

চামড়া শিল্পনগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ানের কাছে জানতে চাইলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি বছরখানেক হলো। প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৫ বছর আগে। কাজেই সেই সময়ের ঘটনা বলা সম্ভব না।’

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় পর বাস্তবায়িত হলেও এর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবেশের অবনতির কারণে এলডব্লিউজির সনদ পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও চামড়ার দাম পাওয়া যাচ্ছে না। রপ্তানি কমে যাচ্ছে।

বুড়িগঙ্গার মতোই ধলেশ্বরী নদী দূষণ হচ্ছে। তাই রপ্তানির বাজার ধরতে এটাকে পরিবেশবান্ধব করতে হবে। কীভাবে করতে হবে, সরকারকে সেটা ভাবতে হবে। আইএমইডির মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো প্রকল্প দীর্ঘ না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে।’

মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১০:০৮ এএম
মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দিনের সফরে গতকাল রবিবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পৌঁছেছেন। সেখানে আজ তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রথমে একান্ত এবং পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার কথা থাকলেও মূল টার্গেট থাকবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার ঘোষণা। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে তার সম্ভাবনা কম। 

এই সফরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ফের মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু এ রকম ঘোষণা আসার ক্ষেত্রে দুই দেশেই রয়েছে অনেক জটিল ও গভীর সমস্যা। কাজেই এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানও করতে হবে যৌথভাবে। কারণ মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশের সরকারের ভেতরে ও বাইরের সিন্ডিকেট যেমন দায়ী, তেমনি মালয়েশিয়ার সরকারের ভেতরের ও বাইরের সিন্ডিকেটও সমানভাবে দায়ী।

এ ক্ষেত্রে একটি মজার বিষয় হচ্ছে, এই সিন্ডিকেট নির্মূলে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে জোরালো কোনো উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। সিন্ডিকেট নির্মূল ও দুর্নীতি রোধে দুই দেশের যৌথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, কিন্তু সে উদ্যোগটি অনুপস্থিত। ফলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাংলাদেশে মামলা খেয়ে মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে অবস্থান করলেও যৌথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আবার সিন্ডিকেটের সঙ্গে মালয়েশিয়ার নাগরিক যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে এই শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ কতটা স্থায়ী হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তবুও আশা, এই সফরে ইতিবাচক কিছু একটা হবে। 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর খবরের কাগজকে জানান, মালয়েশিয়ার এই শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট প্রথা উভয় দেশের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বহুরূপী প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়। এর বিরুদ্ধে সরকারি পর্যায়ে শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। না দেশে, না মালয়েশিয়ায়। সিন্ডিকেটের দুর্নীতিবাজরা নানা ভিসায় গিয়ে সে দেশে অবস্থান করলেও উভয় সরকার যৌথ পদক্ষেপ নেয়নি।

দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ে সংকট নিয়ে ভাসা ভাসা আলোচনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ আজও দেখা যায়নি। কাজেই দুর্নীতিবাজদের নির্মূল না করতে পারলে যেনতেনভাবে এই শ্রমবাজারটি খুললেও ফের বন্ধ হয়ে যাবে। এই শ্রমবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শক্ত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট ফের তৈরি হবে এবং বাজারটি বন্ধ হয়ে যাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা কারণে এই শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে। শ্রমিক নিয়োগে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ব্যয়, ভিসা জটিলতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম নিয়ে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যে মামলা আছে, সেগুলো প্রত্যাহারসহ বহু বিতর্ক রয়েছে এখানে। এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার হাজারও ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রম সংস্থাগুলোর চাপে আছে মালয়েশিয়া সরকার।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব চাপ উত্তরণে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে শ্রমবাজারটি খোলার ক্ষেত্রে আরও দেরি হতে পারে। তবে আজ দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক থেকে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, শ্রমিক নিয়োগে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি, তাই নতুন করে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি হবে না। কিন্তু সফরে শ্রমবাজার পুনরায় পুরোপুরি সচল করা, নতুন কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রায় আট লাখ কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে তিন লাখ রয়েছেন অনিয়মিত। এদের বৈধকরণের বিষয়টিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তোলা হবে। যদিও এর আগে বিভিন্ন সময় বিদেশি কর্মীদের বৈধকরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দেশটি বিদেশি কর্মীদের যতবারই বৈধকরণ করেছে, ততবারই নতুন করে ট্যুরিস্ট ভিসায় বা নদীপথে অবৈধ উপায়ে বিদেশি কর্মীরা ঢুকে পড়ে অধিক সংখ্যায় অবৈধ হয়েছেন। এ কারণে ফের আনুষ্ঠানিক বৈধকরণের ঘোষণা দেবে কি না, সেটি সময় বলে দেবে।

এদিকে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার নেতারা মালয়েশিয়া সফরের আগে সিন্ডিকেট বন্ধে প্রধানমন্ত্রীকে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। সংগঠনের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফকরুল ইসলাম জানান, অতীতের সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে মালয়েশিয়ায় কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

শত শত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার সংকট ও বন্ধের মুখে পড়েছে। তিনি শ্রমবাজারটি সিন্ডিকেটমুক্ত করতে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, নেপালসহ ১৪টি দেশ সিন্ডিকেটমুক্ত উপায়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠায়। নেপালেও সিন্ডিকেট করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সে দেশের সরকার সেটি হতে দেয়নি। তাই শুধু বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতেই কেন সিন্ডিকেট থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সফর-পরবর্তী বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সফরে অনেক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হলেও তার বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশিত ছিল না। তাই এবার শুধু চুক্তি নয়, বরং এফটিএ চূড়ান্তকরণ, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা, বিনিয়োগ সহজীকরণ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি বাজার, নতুন বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার এই সময়ে এই সফরকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কৌশল ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। 

বর্তমানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ। দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে জ্বালানি, অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস এবং শিল্প খাতে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমি-কন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং উৎপাদনশীল শিল্পে নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসতে পারে। বাংলাদেশের ২০ কোটির বিশাল বাজার, তরুণ কর্মশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া এই সফর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে। কারণ মালয়েশিয়া আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের অন্যতম সদস্যরাষ্ট্র। বাংলাদেশও আসিয়ানের সদস্য হতে চায়, এ জন্য দেশটির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়াতেও রয়েছে দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে আছে ১৩ লাখ। এসব রোহিঙ্গা মায়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার মাধ্যমে আসিয়ানকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ আছে। এ নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনাও হবে বলে কূটনীতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:০২ এএম
ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না
ইসলামী ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে অধিকাংশের নতুন করে চাকরি পাওয়ার বয়স চলে গেছে। কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির বয়স থাকলেও তারা কোথাও সহজে চাকরি পাচ্ছেন না। ইসলামী ব্যাংক থেকে ছাঁটাইয়ের বিষয়টি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। যে কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নতুন করে চাকরি পাচ্ছেন না। 

  • অধিকাংশের চাকরির বয়স চলে গেছে
  • যাদের বয়স আছে তাদের জন্য ‘টার্মিনেটেড’ শব্দটি নতুন চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে
  • পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটন, দাম্পত্য কলহ, মানসিক বিষণ্ণতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানির এক ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে কয়েক দফায় ব্যাপক জনবল ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটে। যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ঢালাওভাবে চাকরিচ্যুত করার কারণে কর্মকর্তাদের জীবনে এক চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেকের বয়স বেশি হওয়ায় যেমন নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ মিলছে না, তেমনই সামাজিক অপবাদ ও ‘ট্যাগিং’য়ের কারণে অন্য কোথাও দাঁড়ানোর পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে। 

‎একাধিক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের এখনো চাকরির বয়স রয়েছে তারাও চরম বিপাকে আছেন। কোথাও আবেদন করে সাড়া পাচ্ছেন না। তাদের আবেদনপত্রের সঙ্গে যখন চাকরিচ্যুতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়, তখন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। এখানে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এ কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নতুন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও সাড়া পাচ্ছেন না। 

ভুক্তভোগীরা জানান, আকস্মিক এই ছাঁটাইয়ে শুধু তাদের রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়েছে তা নয়, বরং বয়সজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে তাদের পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটন, কলহ, মানসিক বিষণ্ণতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

তারা জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের পেশাগত জীবনে একবার কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার ঘটনা পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংকটি প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে টার্মিনেট করেছে। কিন্তু টার্মিনেশন লেটারে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করেনি, যা তাদের পরবর্তী চাকরি পেতে বড় ধরনের জটিলতায় ফেলে দিয়েছে। এ কারণে ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরি হারানো কিছুসংখ্যক ব্যক্তির এখনো চাকরির বয়স থাকা সত্ত্বেও তারা নতুন করে চাকরি পাচ্ছেন না। যখনই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান জানে আবেদনকারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তখন তারা সন্দেহের চোখে দেখে।

‎ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত সিনিয়র অফিসার সৈয়দ মোহাম্মদ ফখরুল আবেদীন (৩৪) খবরের কাগজকে বলেন, “পরীক্ষা দিয়ে মেধার জোরে চাকরি পেয়েছিলাম, অথচ আজ চোরের অপবাদ নিয়ে সমাজে মুখ লুকাতে হচ্ছে। ‎২০১৭ সালের পর নিয়োগ পেয়েছি বলেই ধরে নেওয়া হলো আমি কোনো এক বিশেষ গ্রুপের লোক। অথচ আমি শতভাগ নিয়ম মেনে, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করে চাকরিতে ঢুকেছিলাম। বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে আমার সংসার। বয়স ৩৪ বছর হয়ে গেছে, এই বয়সে নতুন কোনো ব্যাংক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান আর আমাকে ইন্টারভিউতেই ডাকছে না। অনেকে তো মুখ ফুটে বলেই দেয়–‘আপনারা তো অমুক আমলের লোক, আপনাদের চাকরি দিলে আমাদের রিস্ক।’ ধারদেনা করে দিন চলছে, নিজের সম্মানটুকু হারিয়ে এখন পুরোপুরি সামাজিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছি।”

আরেক ভুক্তভোগী মো. নওশাদ জামান (৩৯) জানান, পরিবারে যে ব্যক্তি একসময় প্রধান ছিল, সে আজ সবার বোঝা। তিনি বলেন, “ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে দীর্ঘ ৭ বছর ৯ মাস সততার সঙ্গে পার করার পর এভাবে বিদায় নিতে হবে কখনো ভাবিনি। ৫ আগস্টের পর এক কলমের খোঁচায় আমাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হলো। বয়স ৩৮ হওয়ায় নতুন চাকরির বাজারে আমি সম্পূর্ণ ‘অনুপযুক্ত’। সমাজ ও আত্মীয়স্বজন এমনভাবে তাকায় যেন আমরা কোনো অপরাধ করে ব্যাংক থেকে বিতাড়িত হয়েছি। নিজের জমানো টাকা যা ছিল তা-ও শেষ। পারিবারিক মূল্যবোধ ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে পারছি না, এর চেয়ে বড় মানসিক নির্যাতন আর কী হতে পারে?”

চাকরিচ্যুত আরেক কর্মকর্তা জোনায়েদ মো. কামরুল হাকিম (৩৮) বলেন, ‘ব্যাংকের টার্গেট পূরণ করতে দিন-রাত এক করেছি, বিনিময়ে পেলাম বিনা নোটিশে ছাঁটাই। ‎বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএর ভালো রেজাল্ট নিয়ে বের হয়ে ব্যাংকে ঢুকেছিলাম। গত বছরও দিন-রাত এক করে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছি। অথচ আমাদের অপরাধ আমরা নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের বাসিন্দা এবং নির্দিষ্ট একটি সময়ে চাকরিতে ঢুকেছি। চাকরি হারিয়ে এখন ছোটখাটো ব্যবসা বা অন্য কিছু করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেখানেও ‘ব্যাংক থেকে বিতাড়িত’ তকমাটা পিছু ছাড়ছে না। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে পড়েছি। এই বয়সে এসে নতুন করে জীবন শুরু করার কোনো পথ খোলা নেই।’

‎সাদিব সাব্বির (৩৬) নামে আরেক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা বলেন, “যে হাত একসময় মানুষকে সাহায্য করত, সেই হাত এখন ধার নেওয়ার জন্য পাততে হয়। ‎বয়স ৩৬ বছর। ব্যাংকিং সেক্টরে আর রি-এন্ট্রি নেওয়ার কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ আমার নেই। হোম লোন ও পার্সোনাল লোনের কিস্তি শোধ করার জন্য এখন ব্যাংক থেকে প্রতিনিয়ত নোটিশ আসছে। যে সমাজ আমাকে একজন সফল ব্যাংকার হিসেবে সম্মান করত, সেই সমাজ এখন আমাকে এড়িয়ে চলে। বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধের খরচ চালাতে পারছি না। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর থেকে পরিবারে আমার অবস্থান এখন একজন ‘ব্যর্থ’ মানুষের মতো। এই তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবমাননা সহ্য করে বেঁচে থাকা প্রতিদিনের এক জীবন্ত যুদ্ধ।”

ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট
সাইফুল ইসলাম। ছবি: খবরের কাগজ

একসময় যিনি মাঠ প্রশাসনে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে মানুষের বিরোধ মীমাংসা করতেন, আজ নিয়তির নির্মম পরিহাসে তিনিই বন্দি চার দেয়ালের অন্ধকারে। একটি স্বাক্ষর কীভাবে একজন মানুষের সাজানো জীবনকে ওলট-পালট করে দিতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ ৩৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলাম।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে নরসিংদীর এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে করা একটি স্বাক্ষরই আজ তাকে দাঁড় করিয়েছে আসামির কাঠগড়ায়। গত প্রায় ১৪ মাস ধরে তিনি কারাগারে। অথচ প্রত্যক্ষদর্শী ও সহকর্মীদের দাবি, ঘটনার সময় তিনি দুর্ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। কারাগারে যখন তিনি ন্যায়বিচারের প্রহর গুনছেন, তখন বাইরে তার চার বছরের অবুঝ সন্তান আর স্ত্রী পার করছেন চরম অনিশ্চয়তা ও একাকিত্বের এক বুকফাটা আর্তনাদ।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নরসিংদী। ১৭ জুলাই জেলখানা মোড়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল বলে আইনজীবীর মাধ্যমে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, সেখানে কিছু সময় অবস্থান করার পর পরিস্থিতির অবনতি হলে অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ফিরে আসেন।

সাইফুল ইসলামের দাবি, আন্দোলন ও গণবিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করায় পরদিন ১৮ জুলাই তিনি আর জেলখানা মোড়ে যাননি। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তিনি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সার্কিট হাউস এলাকায় অবস্থান করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন তিনি কোনো পুলিশি অভিযানে অংশ নেননি এবং কোনো বাহিনীকে নির্দেশও দেননি। কিন্তু ঘটনার কয়েক দিন পর একটি স্বাক্ষরই তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।

জবানবন্দিতে এই কর্মকর্তা জানান, ২২ জুলাই রাতে তাকে পুলিশের এমসিসি ফরমে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তিনি প্রথমে আপত্তি জানান। কারণ তার দাবি অনুযায়ী, তিনি সংশ্লিষ্ট সময় পুলিশের সঙ্গে কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। কিন্তু পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ ও চাপের মুখে তাকে স্বাক্ষর করতে হয়। এই এমসিসি ফরম নিয়েই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

এমসিসি বা বিপি ফরম নং-১০ মূলত পুলিশের দায়িত্ব পালনের একটি রেকর্ড। কোন ফোর্স কোথায় মোতায়েন ছিল, কখন দায়িত্ব শুরু ও শেষ করেছে, এসব তথ্য সেখানে লিপিবদ্ধ থাকে। এটি গুলিবর্ষণের আদেশ দেওয়ার কোনো আইনগত ফরম নয়। আইন অনুযায়ী, জনতা নিয়ন্ত্রণে গুলিবর্ষণের প্রয়োজন হলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নির্দেশ দিতে হয়।

সাইফুল ইসলামের পক্ষে দাবি করা হচ্ছে, ঘটনার দিন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগও তার ছিল না। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের অবস্থান, সহকর্মীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সেদিনের তথ্য যাচাই করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন তার তদন্ত প্রতিবেদনে নরসিংদীর ঘটনায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং এতে বিভিন্ন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। সেই প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৮ জুলাই নরসিংদী জেলখানা মোড়ে গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিহত কিশোর তাহমিদ ভূঁইয়ার বাবা রফিকুল ইসলাম যে অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করেন, সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলামের নাম উল্লেখ নেই।                     

২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর দাখিল করা ওই অভিযোগে ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলেও পরবর্তী সময়ে তদন্ত প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের নাম অভিযুক্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিষয়টি সামনে আসার পর তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং প্রাথমিক অভিযোগপত্রে তার নাম না থাকার বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আলভী সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্পটে ছিলাম। তাহমিদ (১৪) ছিল আমাদের বিক্ষোভ মিছিলের কিছু আগে। সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে বেশ সামনের দিকে চলে গিয়েছিল। পুলিশ গুলি শুরু করলে সরাসরি তার বুকে লাগে। সেখানেই লুটিয়ে পরে তাহমিদ।’ পুলিশ দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলি করেছে? বা সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ছিল কি না? খবরের কাগজের এমন প্রশ্নের জবাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই মুখ্য সংগঠক বলেন, ‘না, সেখানে এই নামের কোনো ম্যাজিস্ট্রেট দেখিনি। সেখানে আন্দোলন দমন করার জন্য ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ ছিল। তারাই গুলি করেছে এবং সেখানেই তাহমিদ নিহত হয়েছে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ হাকিম বলেন, সারা দেশের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ১৭ জুলাই রাতে স্থানীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৮ জুলাই বেলা ৩টা থেকে নরসিংদী জেলখানা মোড়ে ব্লকেড কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এদিন কর্মসূচি পালন স্থলের আশপাশে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট ছিল না। 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র মুনিয়া রহমান মনিকা বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে সে সময় আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম এবং আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। আন্দোলনের একপর্যায়ে তাহমিদ নিহত হয়েছে। সে সময় সেখানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের সঙ্গে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিল বলে আমরা দেখিনি।’ 

নরসিংদী জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমানে চট্টগ্রামের উপ-ভূমি সংস্কার কমিশনের কমিশনার (উপসচিব) পদে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তা ড. বদিউল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঘটনার দিন (১৮ জুলাই) আমি দেশে ছিলাম না। ১৯ তারিখ ভারত থেকে দেশে ফিরে আসি। তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।’ সাইফুল ইসলামকে ২২ জুলাই এমসিসিতে স্বাক্ষরের জন্য ডিসি হিসেবে চাপ প্রয়োগ করেছেন–এমন অভিযোগের বিষয়ে ডিসি বলেন, ‘আমি যেহেতু ঘটনা সম্পর্কে জানি না, তাই কোনো কর্মকর্তাকে স্বাক্ষরের চাপ দেওয়ার প্রশ্ন আসে না।’

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (শিল্পকলা শাখা) ও নরসিংদী জেলার সাবেক ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক (১৮ জুলাই) মৌসুমী সরকার রাখী খবরের কাগজকে বলেন, ‘তৎকালীন সদর উপজেলার সাবেক এসি ল্যান্ড ও ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ঘটনার সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় অথবা সার্কিট হাউসে ছিলেন বলে শুনেছি। কারণ ঘটনার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ কর্মসূচি এতটাই তীব্র ছিল, নিরাপত্তার কারণে সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিত থাকার মতো পরিবেশ ছিল না। জেলার অধিকাংশ ম্যাজিস্ট্রেট সে সময় ডিসি কার্যালয় অথবা সার্কিট হাউসে ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলামের সঙ্গে ডিসি কার্যালয়ে আমার একাধিকবার দেখা হয়েছে।’

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই আরেকটি বাস্তবতার কথা বলছেন। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ বা সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা প্রশাসনিক ও আইনি চাপের মুখে পড়েছিলেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, সাইফুল ইসলামের ঘটনাটিও নিরপেক্ষভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।