স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সংস্কারের ‘নামগন্ধ’ নেই। কমিশনের সদস্যরা এতে বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তিন মাসের মাথায় স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক এ কে আজাদ দ্রুত সুপারিশ বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দেন। সেই চিঠির পরও প্রায় তিন মাস হতে চলছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ১২ সদস্যের স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে কমিশন। চলতি বছরের ৫ মে প্রধান উপদেষ্টার কাছে ৩২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়। এই প্রতিবেদন তৈরিতে কয়েকটি জরিপ চালানো হয়। পাঁচ মাসের বেশি সময় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন কমিশনের সদস্যরা। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয় প্রতিবেদনে।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রধান এ কে আজাদ বলেন, ‘কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে, সে রকম তো দেখছি না। কতগুলো বাস্তবায়ন হওয়ার পথে, তাও জানি না। প্রতিবেদন দেওয়ার পর সংস্কার কমিশনের সঙ্গে সরকার কোনো বৈঠক করেনি। আনঅফিশিয়ালি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান প্রধান উপদেষ্টার বরাত দিয়ে আলাপ করেছেন। আমি সবার সঙ্গে আলাপ করার পরামর্শ দিয়েছিলাম।’
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত অগ্রগতির কিছু দেখিনি। মাঝে মাঝে শুনি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। কিন্তু সেটি আমরা কাগজে-কলমে জানি না।’
‘স্বল্পমেয়াদি প্রস্তাব এখনই বাস্তবায়নের সুযোগ আছে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে দেওয়ার জন্য অধ্যাদেশ জারি করে বাস্তবায়ন করা যায়। কিছু বিষয় আছে, সেগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে হতে পারে। সেগুলোর সঙ্গে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত। যেমন বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস গঠন করা। এর জন্য হয়তো বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা লাগতে পারে।’
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ডক্টর আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘অধ্যাপক সাইদুর রহমান (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী) মাঝে মাঝে কিছু প্ল্যান-প্রোগ্রামের কথা বলেন। তবে তিনি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন না। তিনি যেগুলো নিয়ে আলোচনা করেন, সেগুলো সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে আছে। যেমন ওষুধের দাম কমানো, ডায়ালাইসিস সার্ভিসের দাম কমানো। এগুলো ছোট বিষয়। এগুলো তো সংস্কার না। সংস্কার হলো সেটা, যেটা আমরা বলেছি, কমিশন গঠন বা স্বাধীন হেলথ সার্ভিস তৈরি করা, বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, সার্ভিসের প্রভিডেন্টটা নিচের দিকে নামিয়ে আনা। এগুলোর জন্য যা দরকার সেগুলো কীভাবে হবে, অর্থায়ন কীভাবে হবে, সেসব নিয়ে এখনো কিছুই হয়নি।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সরকার চাইলে এখনই অধ্যাদেশ জারি করে বাংলাদেশ হেলথ কমিশন গঠন করতে পারে। একটা অধ্যাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তিন-চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বাংলাদেশ হেলথ কমিশন, বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিসে নতুন করে পাবলিক হেলথ ডিজি নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো স্ট্রাকচার। আরবান হেলথের যে স্ট্রাকচার আছে, তাকে পাবলিক হেলথের (যদি বাস্তবায়ন হয়) সঙ্গে একীভূত করতে হবে। ট্রেনিং ইস্যু আছে। স্বাস্থ্য খাতের সূচক সবগুলোই পড়ে গেছে।’
ডা. জাকির হোসেন বলেন, ‘ওষুধের দাম কমালেন। কী হবে? পরে আবার বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এখন সবচেয়ে জরুরি বাংলাদেশ হেলথ কমিশন ও বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস গঠন করা। এগুলো করা হলে বাকিগুলো হতে থাকবে।’
সরকার কেন করছে না? করা কি কঠিন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিবেদন তৈরির সময় বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি- তিনটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এবং তাদের চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠক করি। সবাই এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। এ বিষয়ে কারও প্রশ্ন নেই, কোনো দ্বিমতও নেই। অন্য বিষয় নিয়ে নানা বক্তব্য আছে। কিন্তু বাংলাদেশ হেলথ কমিশন ও বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস গঠন নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু আমি জানি না কেন সরকার এটা করছে না।’
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য প্রফেসর ডা. সায়েবা আক্তার বলেন, ‘তারা (সরকার) দেখছেন যে কী করা যায়। এখনো পর্যালোচনা করছেন। বাস্তবায়ন একবারে সম্ভব হবে না, কিন্তু সিদ্ধান্ত তো নিতে হবে। পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে অবস্থায় আছে, তার থেকে অনেক উন্নত হবে। মানুষের অনেক উপকার হবে।’