‘একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি/তোমার জন্য গলির কোণে/ভাবী আমার মুখ দেখাবো/মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ কবি শঙ্খ ঘোষের লেখা কবিতার এই পঙ্ক্তিটি যেন আজ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে।
জনসাধারণের চলাচলের জন্য স্থাপিত ট্রাফিক নির্দেশনা, সাইনবোর্ড, স্পিড লিমিট বোর্ড, এমনকি ফুটওভার ব্রিজ পর্যন্ত আজ ঢেকে গেছে রাজনৈতিক পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে। রাজনৈতিক পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে ট্রাফিক নির্দেশনা, সাইনবোর্ড, স্পিড লিমিট বোর্ড এবং ফুটওভার ব্রিজ ঢেকে যাওয়ার কারণে চালকরা সঠিক দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখন শুধু নান্দনিকতার ক্ষতি নয়, বরং দুর্ঘটনার নতুন এক কারণ। প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এসব ‘বিজ্ঞাপনে ঢাকা সড়ক’ কখনোই নিরাপদ হবে না।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে মহাসড়কে ২ হাজার ২১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ২৮ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২০-২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরে প্রায় ১১ হাজার দুর্ঘটনা ঘটেছে মহাসড়কে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ।
রাজনৈতিক ব্যানারে ঢাকা মহাসড়ক
ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে দেখা গেছে, ট্রাফিক নির্দেশক সাইনবোর্ডগুলো রাজনৈতিক ব্যানারে ঢেকে গেছে। রাস্তার মোড়, ইউটার্ন, ব্রিজের পাশে কিংবা ফুটওভার ব্রিজের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে অসংখ্য রাজনৈতিক পোস্টার। দেশের শীর্ষ দুই দলের নেতা-কর্মীদের ছবি ও শুভেচ্ছাবার্তায় ভরে গেছে মহাসড়কের প্রতিটি অংশ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী- সবার প্রতিযোগিতা প্রায় একই ধরনের (!), কে কার চেয়ে বড় বড় ব্যানার টাঙাতে পারে।
রাজধানী ঢাকায় প্রবেশের সব পথেই দেখা যায় প্রায় একই চিত্র। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, হানিফ ফ্লাইওভার ব্রিজ, গাবতলী, টঙ্গী-গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, মুন্সীগঞ্জ-ভাঙ্গা ও কুমিল্লার অংশে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লরিচালক আবদুল আজিজ বলেন, ‘প্রতিদিন দেখি কেউ না কেউ নতুন পোস্টার লাগাচ্ছে। ট্রাফিক সাইনের চিহ্নসংবলিত বোর্ডগুলো এখন আর দেখা যায় না। এতে দুর্ঘটনা ঘটছে প্রায়ই।’
ঢাকা-যশোর রুটের বাসচালক হাকিম আলী বলেন, ‘গাবতলীর পর থেকে আমিন বাজার, হেমায়েতপুর, সাভারে নেতাদের পোস্টারে ভরে গেছে। রাতে গাড়ির আলো পড়লে এসব পোস্টার থেকে কোনো দিকনির্দেশনা আমরা পাই না। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে ট্রাক ও প্রাইভেট কারের মধ্যে সংঘর্ষ হয় বেশি।’
তিন চাকার বাহনের চালকরা পড়েছেন সবচেয়ে বিপদে। তারা জানান, সড়ক নির্দেশনা পোস্টারে ঢাকা থাকায় ইউটার্ন ঘুরতে গিয়ে ধাক্কা লাগে বড় গাড়ির সঙ্গে।
আইন কী বলে?
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী জনসাধারণের ব্যবহৃত রাস্তা, সাইনবোর্ড বা সরকারি স্থাপনায় অননুমোদিত যেকোনো ধরনের বিজ্ঞাপন, পোস্টার বা ব্যানার টাঙানো অপরাধ। এ জন্য দায়ীদের জরিমানা বা শাস্তির বিধান রয়েছে। বাস্তবে এসব আইনের প্রয়োগ নেই।
নরসিংদীর শিবপুর মোড়, কুমিল্লার দাউদকান্দি, গাজীপুরের চৌরাস্তা, নারায়ণগঞ্জের মোগরাপাড়া, এমনকি পদ্মা সেতুর সামনের অংশে পর্যন্ত দেখা গেছে একই চিত্র। ট্রাফিক নির্দেশনা বোর্ডের বেশির ভাগই আংশিক বা পুরোপুরি ঢেকে গেছে পোস্টারে। কোথাও বোর্ডের নিচে শুধু কিছু লেখা দৃশ্যমান, কোথাও আবার পুরোপুরি ঢেকে গেছে নির্দেশক চিহ্ন। বিভিন্ন মহাসড়কের মাঝখানে ইউটার্নের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে কিছু অংশে বাঁশের তৈরি লাঠি বা খুঁটিতে নেতাদের ছবিসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে থাকতে দেখা যায়। ব্যানারের দড়ি কখনো বাতাসে ঝুলে থাকে, কখনোবা গাড়ির আয়নায় লাগে, বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
রাতে তৈরি হয় বিভ্রান্তি
চালকদের ভাষ্য, রাতের বেলায় গাড়ির হেডলাইটের আলো ট্র্যাফিক চিহ্নের ওপর প্রতিফলিত হয়ে চালকদের দিকনির্দেশনা দেয়। ট্রাফিক সাইন যখন পোস্টার বা ফেস্টুন দিয়ে ঢাকা পড়ে, তখন আলো প্রতিফলিত না হয়ে বরং অন্ধকারের সৃষ্টি করে, যা দৃষ্টিবিভ্রম ঘটায়।
ঢাকা-কক্সবাজার রুটের বাসচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আগে বোর্ডের আলোতেই বুঝতাম কোথায় ইউটার্ন। এখন ব্যানারে সব ঢেকে গেছে। রাতে গাড়ি চালানো এখন ভয়ংকর। কারণ বোঝা যায় না কোথায় বাঁক, কোথায় ব্রিজ। কোথায় কত কিলোমিটার গতিতে টানতে হবে।’
ফলে চালকদের ‘সেকেন্ড লেভেল ডিসিশন টাইম’ বা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্ত নষ্ট হয়। এটিই দুর্ঘটনার অন্যতম বৈজ্ঞানিক কারণ বলে মনে করেন পরিবহন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, “এগুলো পরিবেশ ও সড়কের ‘দৃষ্টিদূষণ’। সড়ক-মহাসড়কে এই ধরনের পোস্টার-ব্যানারের উপস্থিতি মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। রাস্তার মাঝে এসবের দিকে চালক ও পথচারীরা যখন তাকান, তখন দুর্ঘটনা ঘটে। সেই ঝুঁকির মধ্যে আমরা পড়ে গেছি।”
সড়ক-মহাসড়ক কোনো রাজনৈতিক ময়দান নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো যেমন সড়কের সৌন্দর্য নষ্ট করে, তেমনি নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিয়মিত অভিযান চালানো উচিত। ঢাকা মহানগরের জন্য যেমন দুই সিটি করপোরেশন রয়েছে, তেমনি মহাসড়কের জন্য ট্রাফিক বিভাগ রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
পথচারী ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
নারায়ণগঞ্জের মোগরাপাড়া এলাকার চায়ের দোকানি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায়ই দেখি রাতে ছেলেপেলেরা এসে পোস্টার লাগায়। সকালে দেখি রাস্তার নির্দেশক বা ট্রাফিক সাইনবোর্ড ঢেকে গেছে। পুলিশের লোকেরা পাশ দিয়ে যায়, কিন্তু কিছু বলে না।’
গাবতলী এলাকার পথচারী তানিয়া আক্তার বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজে ওঠার সিঁড়িগুলোতেও এখন নেতাদের পোস্টার। অনেক সময় সেখানে আলো থাকে না। ভয় লাগে ব্রিজে ওঠানামা করতে। মনে হয়, দুর্ঘটনা ঘটবেই।’
‘সড়ক যেন রাজনীতির মাঠ না হয়’: বিশেষজ্ঞরা
পরিকল্পনাবিদ ও সড়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পোস্টার সংস্কৃতি এখন ‘দৃশ্যদূষণ’ থেকে ‘প্রাণঘাতী বিপদে’ রূপ নিয়েছে। এটি ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশনেরও বিষয়। চালকের চোখে পথনির্দেশক হারিয়ে গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়।
পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ট্রাফিক নির্দেশনা আমাদের সড়কে যান চলাচলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা রাজনীতি করেন, তারা তো জনগণের ভালোর জন্য রাজনীতি করবেন। তাহলে জনকল্যাণের কথা বলে জনগণের উপকারে আসে, এমন ট্রাফিক নির্দেশনায় বিভ্রান্তি করতে পারে না। তাদের এই ধরনের কার্যক্রমে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তার দায় কিন্তু যারা পোস্টার-ব্যানার লাগিয়েছেন তাদের ওপরে বর্তায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের এ বিষয় নিশ্চিত করতে হবে যে তার দলের নেতা-কর্মীরা জনগণের সুবিধা-অসুবিধার দিকে নজর দেবেন এবং আইন মেনে চলবেন। এমন কিছু করবেন না, যা রাষ্ট্রীয় আইনের বাইরে।’
এ প্রসঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. সাব্বির হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সড়কের পাশে ট্রাফিক সাইনগুলো আমরা সঠিকভাবে উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে আমাদের সমন্বয় রয়েছে। তারা আমাদের সহযোগিতা করবেন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পোস্টার-ব্যানারের বিষয়টি নজরে আসেনি। আমরা সরেজমিন যাব এবং দেখব। যদি সড়কে পোস্টার-ব্যানার এ ধরনের কিছু ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটা ট্রাফিক পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশকেও জানানো হবে।’