যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান শুল্কহার কমাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। এ কমিটি দেশটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দর-কষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে আলোচনার অগ্রগতি উপদেষ্টা পরিষদকে জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি তালিকা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি কেনাকাটা বাড়ানো হচ্ছে। বেসরকারি খাতের সঙ্গেও যোগাযোগ করে আমদানিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে এসে দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে মূলত বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি বাড়াতে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তার সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও যোগাযোগ করে একই বিষয়ে আলোচনা করেছে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমাতে আলোচনা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষণা প্রকল্প অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটির (ওইসি) তথ্যানুসারে, ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বাড়িয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা অনেক পণ্য দেশে এসে পৌঁছেছে, আবার অনেক পণ্য আমদানির প্রস্তুতি চলছে। সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ ও ডেল্টা অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন বীজ আমদানির চুক্তি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ১৪ লাখ টন সয়াবিন বীজ আমদানির চুক্তিও হয়েছে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ৫৭ হাজার টন সয়াবিন বীজ চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হয়েছে। সয়াবিন বীজ নিয়ে ১০ হাজার টনের আরও দুটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সয়াবিন বীজ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিয়মিতভাবে তুলা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানো হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শুল্ক কমানোর দর-কষাকষির বিভিন্ন বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দেশটি থেকে আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সে সময়ে পোশাক খাতের নেতারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানির অঙ্গীকার করেন।
ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচারের (ইউএসডিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে বিক্রি হওয়া তুলার প্রায় ২০ শতাংশ বা ৮৪ লাখ বেল আমদানি করবে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরে দেশে কাঁচা তুলা আমদানি হয়েছিল প্রায় ৮১ লাখ বেল, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। মোট আমদানির প্রায় ২৩ শতাংশ এসেছিল ভারত থেকে। সাধারণত ২০-২৫ শতাংশ তুলা ভারত থেকে আমদানি হলেও সম্প্রতি তার পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কটন ইউএসএর উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সঙ্গে বৈঠক করেছে। রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে তুলা রপ্তানি বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বিদ্যমান সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা জানান, পোশাক উৎপাদনে অন্তত ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করা হলে, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক থেকে আনুপাতিক ছাড় পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বর্তমানে আমদানি করা তুলার প্রায় ১০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে, যা দ্বিগুণ বা তিন গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব।
বৈঠকে কটন কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিরা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারিত করতে পারবে।’
শুল্কছাড়ের সুবিধা পেতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলনামূলক বেশি দামে গমও আমদানি করেছে। ইতোমধ্যে দেশটি থেকে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানি করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্টিল, স্ক্র্যাপ লোহা, তৈলবীজ, শস্য, বীজ, ফল, তুলা, জৈব রাসায়নিক, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), পশুখাদ্য, খাদ্যের অবশিষ্টাংশ, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, উড-পাল্প, ওষুধ, পারফিউম, প্রসাধনী, বাদাম, ডিম, মধু, সাবান, মোম, লবণ, সালফার, রেলওয়ের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, বই, খেলনা, সার, কফি ইত্যাদি আমদানির সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে অনেক পণ্য ইতোমধ্যেই আমদানি করা হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগেই জানিয়েছে যে বাণিজ্য ঘাটতি না কমালে শুল্ক বাড়তে পারে। তাই বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি পণ্য আমদানি করতে পারে। তবে বেসরকারি খাতকে বেশি দামে আমদানির জন্য চাপ দেওয়া উচিত নয়। সরকার ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা, নগদ সহায়তা বা ভর্তুকির মতো সুবিধা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে উৎসাহিত করতে পারে।