জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সময়সূচি ও গণভোট আয়োজন নিয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আজ বা আগামীকালই ঘোষণা হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক হবে, যেখানে নির্ধারিত হবে গণভোট কবে এবং জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে।
সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘সব দলের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করেছি। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে ভালো কিছু হবে।’
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারকেই গণভোট ইস্যুতে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার এর আগে গত ৩ নভেম্বর দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যে পৌঁছাতে সাত দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিল, কিন্তু সেই সময়সীমা গত সোমবার শেষ হলেও তাদের মধ্যে মতৈক্য হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার এখন নিজ উদ্যোগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের প্রস্তুতি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামোতে সংস্কার আনতে গঠন করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর জুলাই সনদ প্রণয়ন করে ২৭ অক্টোবর সরকারের কাছে বাস্তবায়ন প্রস্তাব দেয়। কিন্তু গণভোটের সময় ও বিষয়বস্তু নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থেকেই যায়। কেউ চায় নির্বাচনের আগে, কেউ চায় পরে।
সরকার আগেই জানিয়েছিল, রাজনৈতিক ঐক্য না হলে সরকারই উদ্যোগ নেবে। সেই প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতেই আইন উপদেষ্টা জানান, দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই সনদ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ পরিষ্কার হবে।
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দেবে, এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু প্রত্যাশা করেই বসে থাকিনি। সরকার নিজেদের মতো কাজ করেছে।’
সংবিধান নিয়ে অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করে আসিফ নজরুল বলেন, ‘একটি বইয়ের মধ্যে ভালো ভালো কথা লিখে রাখলেই সবকিছু ভালো হয়ে যাবে না। সংবিধান কোনো ম্যাজিক নয়।’ তার দাবি, আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিচার বিভাগীয় ও পুলিশ সংস্কারে বড় অগ্রগতি হয়েছে, যদিও আমলাতান্ত্রিক বাধা অনেক।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে হবে সিদ্ধান্ত: ফয়েজ আহম্মদ
প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ গতকাল খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ দু-এক দিনের মধ্যেই বৈঠকে বসবে। সেখানেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের তারিখ নির্ধারণ হবে। সরকারের উচ্চপর্যায় বলছে, গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এই প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার কোনো সুযোগ নেই। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের সংকল্প অটুট রয়েছে সরকারের।
বিএনপির অবস্থান: গায়ের জোরে চাপালে দায় সরকারের
গতকাল মঙ্গলবার ঠাকুরগাঁওয়ে এক মতবিনিময় সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাস সরকার সংস্কারের নামে কথা বলেছে। কিন্তু একমত হওয়া বিষয়গুলোর বাইরে কিছু চাপিয়ে দিতে চাইলে দায় সরকারকেই নিতে হবে।’
এ সময় জামায়াতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তারা ইসলামের অপব্যাখ্যা দিচ্ছে, পিআর ভোটের নামে জনগণকে ভয় দেখাচ্ছে। কিন্তু আমরা পিআর পদ্ধতি গ্রহণ করব না। তারা জানে, ভোট হলে তাদের অস্তিত্ব থাকবে না। আমরা যেসব সংস্কারে একমত হয়েছি, বিএনপি শুধু সেগুলোর পক্ষে থাকবে। নতুন কোনো কাঠামো চাপিয়ে দিলে সেটির দায় বিএনপি নেবে না।’
জামায়াতের অবস্থান: সনদের স্বীকৃতি না পেলে নির্বাচন নয়
অন্যদিকে জামায়াতের দাবির মূল দুটি পয়েন্ট- নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট আয়োজন এবং জুলাই সনদকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া। গতকাল বিকেলে রাজধানীর পল্টনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটসহ পাঁচ দফা দাবিতে আট দলের সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দেন, জুলাই সনদের স্বীকৃতি ছাড়া ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন হবে না।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন দেখতে হলে আগে জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি লাগবে। আর এর জন্যই জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতে হবে। আমরা ভদ্র ভাষায় বলছি এবং বলবই। তবে দাবি আদায়ের ব্যাপারে হিমালয়ের মতো অটুট থাকব। কারণ এটি বিপ্লবের দাবি। ফ্যাসিবাদের দাবি নয়। জুলাই সনদের স্বীকৃতি না দিলে আমরা রাস্তায় লড়াই করব। কারণ এই সনদই দেশের ভবিষ্যতের ভিত্তি।’
সমঝোতা ব্যর্থ, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার
সরকার গত ৩ নভেম্বর দলগুলোকে আহ্বান জানিয়েছিল, এক সপ্তাহের মধ্যে গণভোট ও সনদ বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দিতে। কিন্তু সোমবার সে সময়সীমা শেষ হয়েছে এবং দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার এখন এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে- সেটি গণভোট, অধ্যাদেশ বা অন্য কোনো সাংবিধানিক পদক্ষেপ হতে পারে। এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ইঙ্গিত দিয়েছেন, ‘সংস্কারের ধারা শুরু হয়েছে, নির্বাচিত সরকার সেটি অব্যাহত রাখবে।’
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আজকালের মধ্যেই উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে। এ সিদ্ধান্ত শুধু গণভোটের তারিখ নয়, বরং ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের রূপরেখা নির্ধারণ করতেও ভূমিকা রাখবে। দেশজুড়ে তাই এখন একটাই প্রশ্ন- জুলাই সনদের ভাগ্য নির্ধারণে সরকারের সিদ্ধান্ত কী হবে?