কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দল আওয়ামী লীগের ‘ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘিরে সাধারণ মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও পদক্ষেপ সত্ত্বেও একধরনের আতঙ্ক বিরাজ কাজ করছে প্রায় সবখানে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে আওয়ামী লীগের ১৩ নভেম্বরের ব্লকেড কর্মসূচি ঘোষণা এবং অন্যদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধপূর্ণ অবস্থা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। গতকাল মঙ্গলবারও আলাদা আলাদা সমাবেশে জামায়াতের আমির, বিএনপি মহাসচিবসহ একাধিক রাজনৈতিক নেতা জুলাই সনদ, গণভোটসহ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিরোধপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘিরে গত দুই দিন ধরেই বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন নাশকতামূলক ঘটনা ঘটছে। গতকাল ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় আলম এশিয়া পরিবহনের একটি বাসে দুর্বৃত্তরা আগুন দিলে দগ্ধ হয়ে চালক জুলহাস মিয়ার (৩৫) মৃত্যু হয়। গতকাল ভোর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে চারটি বাসে ও একটি প্রাইভেট কারে আগুন দেওয়া হয়। বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা-সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলেও জানা যায়।
যদিও গতকাল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ওই কর্মসূচি ঘিরে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা নেই। আর সন্ত্রাসীদের ছাড় দেওয়া হবে না। একইভাবে নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুংকার ছড়ানো কার্যক্রম নিষিদ্ধ ‘একটি দল’ ও তার সহযোগী সংগঠনের ওই কর্মসূচি নিয়ে নগরবাসীর অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।”
সরেজমিনে গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট, মহাখালী, বনানী, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় চলাচলকালে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা অন্য দিনের তুলনায় কিছুটা কম দেখা যায়। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজেও শিক্ষার্থী উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
গতকাল বিকেলে বাংলামোটর মোড় এলাকায় কথা হয় একজন কলেজশিক্ষকের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই শিক্ষক খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় রাস্তাঘাটে চলতে গিয়ে নিজের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক বোধ করছি। কলেজেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কিছুটা কমে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই হয়তো অভিভাবকরা বাচ্চাদের স্কুল-কলেজে পাঠাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।’
একই প্রসঙ্গে মালিবাগের প্রথম লেনের বাসিন্দা সাবিহা সুলতানা গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেভাবে যানবাহনে দুর্বৃত্তরা আগুন দিচ্ছে, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে, তাতে বাইরে চলাফেরা করতে গিয়ে ভয় পাচ্ছি। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে গিয়ে আরও ভয় পাচ্ছি। কালকে আমার দুই মেয়েকে স্কুলে পাঠাব কি না, সেই চিন্তায় আছি।’
কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, অফিসের কাজে বা ব্যক্তিগত নানা প্রয়োজনে রাজপথে বের হওয়া মানুষের মধ্যেও অগ্নিসংযোগ-ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। সেই সঙ্গে নানা ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ নিয়ে উৎকণ্ঠার মাত্রা বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে ঝুঁকিতে ফেলে বা ঢাল বানিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অপচেষ্টা সব সময়ই নিন্দনীয়-অগ্রহণযোগ্য। জনগণের জন্যই রাজনীতি। দেশ ও জনগণের মঙ্গলের জন্যই কাজ করার কথা রাজনৈতিক দলগুলোর। কিন্তু বাস্তবে আমরা তা দেখতে পাই না। ফলে সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি করে কোনো পক্ষেরই কোনো কর্মসূচি, আন্দোলন বা কর্মকাণ্ড চালানো উচিত নয়। তারপরও জনসাধারণের নিরাপত্তা-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের ওপরে, তাদের এই ধরনের পরিস্থিতিতে অত্যন্ত পেশাদারত্বের সঙ্গে ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা সবার আগে- সেটি সব সময় মাথায় রাখতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইয়ুম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশকে প্রায়ই বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ পুলিশের পাশে বলতে গেলে কেউ নেই। বিগত সরকারের আমলে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা-সম্মানের জায়গাটি নষ্ট হয়েছে। ফলে এখন জনগণের সহযোগিতা-সম্পৃক্ততা পুলিশের জন্য খুব জরুরি। আগে যেভাবে পুলিশ কাজ করেছে, সেই একই ধারায় কাজ করলে চলবে না। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক এই আইজিপি রাজনৈতিক মতবিরোধ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়েও কথা বলেন। আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘রাজনৈতিক মতবিরোধ বা দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেলে নানা ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এত বড় একটা অভ্যুত্থান করেছেন সবাই মিলে। এখন হটকারী কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই ঐক্য নষ্ট করলে পুরো দেশ-জাতি বিপদে পড়বে। ক্ষমতায় থাকার কথা চিন্তা না করে বরং দেশ ও মানুষের কল্যাণের কথা ভাবতে হবে সব রাজনৈতিক দলকে। সংঘাতের পথ পরিহার করে সংলাপ বা আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে হবে। মানুষের আশা-আকাঙ্খার দিকে নজর দিতে হবে দলগুলোকে।’
রাজধানীতে চারটি বাস ও একটি প্রাইভেট কারে আগুন
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল ভোররাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে দুটি, উত্তরায় একটি বাসে এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পরিত্যক্ত একটি প্রাইভেট কারে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব বাস ও কারের বেশির ভাগই পুড়ে গেছে। অন্যদিকে গতকাল সন্ধ্যার পর পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকায় মালঞ্চ পরিবহনের একটি বাসে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়। তার আগে সোমবার ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি বাস-প্রাইভেট কারে আগুন এবং ১০টির বেশ স্থানে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা নেই, সন্ত্রাসীদের ছাড় দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
গতকাল সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, দেশে যেকোনো ধরনের অরাজকতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ভূমিকা পালন করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্ত অবস্থানে আছে ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে। কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা নেই। আর সন্ত্রাসীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
যানবাহনে আগুন-ককটেল বিস্ফোরণের প্রেক্ষাপটে উপদেষ্টা বলেন, রাস্তার পাশে বিভিন্ন দোকানে জ্বালানি তেল বিক্রি হয়, এটি কিছুদিনের জন্য বন্ধ করা হবে। অনেক সময় এ তেল ব্যবহার করে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানো হয়। তা ছাড়া মেট্রোরেল, রেলস্টেশন, ট্রাইব্যুনালসহ কেপিআই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অগ্রগতি বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান অব্যাহত আছে এবং এটি আরও বেগবান করা হবে। কিছু অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি, সেগুলো যাতে দ্রুত উদ্ধার হয়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ সময় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বডি ওর্ন ক্যামেরা কেনার প্রক্রিয়া শিগগিরই সম্পন্ন হবে বলেও জানান উপদেষ্টা।
নগরবাসীর অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই: ডিএমপি কমিশনার
গতকাল রাজধানীর মিন্টো রোডে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার বলেন, কিছুদিন ধরেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ছড়িয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টায় লিপ্ত। সে প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সম্প্রতি তাদের নেতা-কর্মীরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজধানীতে জড়ো হয়ে ঝটিকা মিছিল করছে এবং ককটেল বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ডিএমপি তাদের এই হীন অপতৎপরতা রোধে সচেষ্ট রয়েছে। গত ১ অক্টোবর থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত মোট ৫৫২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অধিকাংশই ঢাকার বাইরে থেকে আসা। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করে নাশকতারীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার নগরবাসীকে কোনো আগন্তুককে আশ্রয় দেওয়ার আগে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এবং হোটেল, গেস্ট হাউসে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে অতিথি ওঠানোর অনুরোধ করেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত ও যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক যানবাহন যেনকোনো অবস্থাতে অরক্ষিত না থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখার জন্য নগরবাসীকে অনুরোধ করেন।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ছাত্র-জনতার সফল অভ্যুত্থানে আমরা স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছি। নাশকতার পরিকল্পনাকারীদের একইভাবে সবাই মিলে প্রতিহত করতে হবে। ঢাকা মহানগর পুলিশ যেকোনো ধরনের নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সক্ষম। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সক্রিয় রয়েছেন। ফলে নাশকতাকারীদের বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডে অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।