দেশে বাড়ছে ডায়াবেটিসের রোগী। প্রতিরোধ সম্ভব এই রোগে গত ১০ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে অন্তত দ্বিগুণ। আক্রান্ত ৫০ শতাংশই থেকে যাচ্ছেন চিকিৎসার বাইরে। তারা জানেনই না তাদের ডায়াবেটিস আছে।
এমন পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘কর্মস্থলে ডায়াবেটিস সচেতনতা গড়ে তুলুন’। বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করাই এ দিবসের মূল লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারা বিশ্বেই ডায়াবেটিস মহামারি আকার ধারণ করেছে। ডায়াবেটিস কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নয়, কর্মক্ষেত্রের উৎপাদনশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলে। আইডিএফ ডায়াবেটিস অ্যাটলাস-২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫৯ কোটি। ডায়াবেটিস ৭০ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধযোগ্য। এখনই প্রতিরোধ করা না হলে ২০৫০ সালে দেশে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৮৫ কোটিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ১ কোটি ৩৮ লাখেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়, যাদের প্রায় অর্ধেকই নারী। ডায়াবেটিস আছে, এমন অর্ধেকেরও বেশি মানুষ জানেনই না যে তাদের ডায়াবেটিস আছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ১০০ জনের মধ্যে ২৬ জন নারী গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, যাদের ৬৫ শতাংশই পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের ও গর্ভের শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস যদি নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি আরও বেশি থাকে।
বারডেম, বিআইএইচএস ও ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক (এনএইচএন)-এর ৩৪টি কেন্দ্র এবং ৯৪টি অধিভুক্ত সমিতির মাধ্যমে রাজধানীসহ সারা দেশে ডায়াবেটিস-সেবা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে ডায়াবেটিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন নিবন্ধিত ৬৫ লাখ রোগী। এর মধ্যে ২০ লাখই ঢাকার। বাকি ৪৫ লাখ ঢাকার বাইরের।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি জানায়, ২০১৫-১৬ সালে ৩৫ লাখ ১০ হাজার, ২০১৬-১৭ সালে ৩৯ লাখ ৭৯ হাজার, ২০১৭-১৮ সালে ৪৪ লাখ ৮৫ হাজার, ২০১৮-১৯ সালে ৪৯ লাখ ৭১ হাজার, ২০১৯-২০ সালে ৫২ লাখ ৭৬ হাজার, ২০২০-২১ সালে ৫৬ লাখ ২৬ হাজার ও ২০২৩-২৪ সালে ৬৫ লাখ রোগী তাদের নেটওয়ার্কে নিবন্ধন করে সেবা নিয়েছেন। ২০২১-২১ ও ২০২২-২৩ এই দুই বছরের তথ্য পাওয়া যায়নি। ২০২৪-২৫ সালের তথ্য এখনো সমিতি আপডেট করেনি। তাতে সমিতির ধারণা রোগী এখন ৭০ লাখের কাছাকাছি। সেই হিসাবে ১০ বছরে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।
তবে দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা কত বা প্রতিবছর নতুন করে কতজন আক্রান্ত হচ্ছেন তার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। যদি ৭০ লাখ রোগী শুধু ডায়াবেটিক সমিতির নেটওয়ার্কে নিবন্ধিত থাকেন, তার বাইরে আরও অন্তত ৭০ লাখ রোগী রয়েছেন। যারা চিকিৎসা তো দূরের কথা, জানেনই না তাদের ডায়াবেটিস আছে। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে একটি বড় অংশ চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। সেই সংখ্যা কত তারও নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির পরিচালক (প্রকাশনা ও জনসংযোগ) ফরিদ কবির জানান, দেশে ডায়াবেটিসের পরিস্থিতি বুঝতে ২০১৮ সালে ১ লাখ লোকের ওপর জরিপ চালানো হয়। তখন নতুন রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২৫ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপে থাকলে, অতিরিক্ত ফাস্টফুড ও চর্বিযুক্ত খাবার খেলে, শারীরিক পরিশ্রম না করলে, নিয়মিত শরীরচর্চা না করলে, স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত ওজন বেড়ে গেলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি ফেইলিওর, অন্ধত্ব ও অঙ্গচ্ছেদের মতো মারাত্মক ঝুঁকির পাশাপাশি প্রাণ হারানোর ঝুঁকি থাকে। এ অবস্থায় নিয়মিত ব্যায়াম করা, মানসিক চাপমুক্ত থাকা, সুষম খাদ্য খাওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ ও ইনসুলিন গ্রহণ করা, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করা প্রয়োজন।
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জারি বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর ড. অরূপরতন চৌধুরী বলেন, ‘সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ক্রমান্বয়ে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের জীবনযাত্রার যতক্ষণ পরিবর্তন না হবে, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যাবে না।
যারা তরুণ বয়সে ধূমপান করেন একটা সময়ে তাদের ডায়াবেটিস হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ধূমপায়ীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৫ দশমিক ৫০ শতাংশ তামাক গ্রহণ করে। এ ছাড়া মাড়ির রোগ নিয়ে যারা আসেন, তাদের অনেকেই জানেন না তাদের ডায়াবেটিস আছে। ফাস্টফুড খাওয়া ও কায়িক পরিশ্রম না করাও ডায়াবেটিসের অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ‘মানবদেহে ইনসুলিন নামক হরমোনের অভাব কিংবা উৎপাদিত ইনসুলিন কার্যকরভাবে শরীরে ব্যবহৃত না হলে বা ইনসুলিন নিষ্ক্রিয় থাকলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এই গ্লুকোজ পরে প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। এ অবস্থাকেই ডায়াবেটিস বলে। ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নির্ধারিত নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চললে এবং প্রয়োজনে পরিমাণ মতো ওষুধ গ্রহণ করলে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। ডায়াবেটিস আছে এমন রোগীদের অন্তত ৫০% জানেনই না যে, তাদের ডায়াবেটিস আছে। এ কারণে দেশের সকল শ্রেণির মানুষকে এ রোগ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা প্রয়োজন। আমাদের সকলেরই উচিত সময়ে সময়ে রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করে দেখা যে ডায়াবেটিস আছে কি না।
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়াও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ও সমাজকল্যাণ শারমীন এস মুরশিদ পৃথক বাণী দিয়েছেন। উভয়েই তাদের বাণীতে দিবসটি উপলক্ষে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির সাফল্য কামনা করেছেন। দিবসটি উপলক্ষে এবার বেশ কয়েকটি সচেতনতামূলক ভিডিও ডকুমেন্টারি নির্মাণ করা হয়েছে। তথ্যবহুল ও সচেতনতামূলক এসব ভিডিও সারা দেশের বিভিন্ন ডায়াবেটিস কেন্দ্র ছাড়াও ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হবে। সারা দেশে অবস্থিত অধিভুক্ত সমিতিগুলোও এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে।